|
|
ভারতীয় পোশাকে বাজার সয়লাব
মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ভারতের নিম্নমানের কাপড়ে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশের ঈদ বাজার। বাহারী নাম দিয়ে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এ সব পোশাক। শুধু চাকচিক্যের মোহে পড়ে তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকে পড়ছে এসব কাপড়ের দিকে। পবিত্র ঈদকে সামনে রেখে ব্যাপক হারে আমদানি করা হয়েছে ভারতের নিম্নমানের পোশাক। গুণে কিংবা মানে নয় শুধু ভারতীয় তারকাদের নামে এসব পোশাকের নামকরণ করায় বিক্রি হচ্ছে ব্যাপক। এর ফলে দেশীয় পোশাক শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। গুণে ও মানে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশী পোশাক বিক্রির পরিমাণ খুব কম। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দেশী শিল্পকে ধ্বংস করতেই ভারত থেকে ঈদ মওসুমে পোশাক আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। ভারতীয় নিম্নমানের পোশাক আমদানিতে সরকারের হাত আছে উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিতে টাকার বিনিময়ে ভারতীয় পোশাক আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। চাকচিক্যের মোহে নিজ দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হবে সবচেয়ে বেশি আত্মঘাতী। ব্যবসায়ীরা ভারতের নিম্নমানের কাপড় আমদানিতে সরকারের অদূরদর্শিতাকে দায়ী করেছেন। ব্যবসায়ীরা ভারতীয় এ সব নিম্নমানের পোশাক আমদানি বন্ধে কার্যকর দেশী শিল্পকে ধ্বংস করতেই ভারত থেকে ঈদ মওসুমে পোশাক আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহবান জানিয়েছেন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শুরু হয়ে গেছে মুসলমানদেন ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের আমেজ। নতুন পোশাক ছাড়া যেন ঈদের আনন্দ জমে না। তাইতো ঈদকে সামনে রেখে নতুন পোশাক কিনতে মার্কেটগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে ক্রেতারা। গতকাল মঙ্গলবার সরকারি ছুটির দিন না হলেও অফিস শেষে চাকুরীজীবীসহ সকল পেশার ক্রেতারা ঈদের পোশাক কিনতে ছুটে আসে রাজধানীর মার্কেটগুলোতে। নিজের পছন্দের পোশাক কিনতে এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে বিরামহীনভাবে ছুটছে এসব ক্রেতারা। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায় পোশাকের দোকানগুলোতে পুরুষ ক্রেতাদের তুলনায় মহিলা ক্রেতা ছিল বেশি। উদ্দেশ্য ঈদ উপলক্ষে পছন্দের বিশেষ পোশাকটি ক্রয় করা। ঈদ সামনে রেখে ডিজাইনাররা বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক তৈরী করে। ব্যবসায়ীরাও তালাশ করতে থাকে আনকমন ডিজাইনের পোশাক সংগ্রহ করতে। তাদের লক্ষ্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে বেশি মুনাফা করা। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটগুলোতে কিছু সংখ্যক দেশী কাপড়ের দোকান ছাড়া প্রাধান্য পাচ্ছে বিদেশী পোশাক। রাজধানীর মার্কেটগুলো দখল করে নিয়েছে ভারতীয় পোশাকে। ভারতের নিম্নমানের থ্রি-পিস বাহারী নাম দিয়ে বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। দোকানীরা জানান ভারতীয় নায়িকাদের নামে বিভিন্ন পোশাকের চাহিদা বেশি ক্রেতাদের কাছে। বিশেষ করে তরুণীরা এ পোশাক কিনতে ঝুঁকছে বেশি। বাংলাদেশের উন্নত মানের কাপড় বিক্রি কম হচ্ছে শুধু নামের কারণে। দেশী কাপড়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতি ব্যাপক হারে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় একদিকে যেমন দেশী সংস্কৃতির কদর হারাতে বসেছে। তেমনি ভারতের নায়িকারা যেসব পোশাক পরছে তাদের দেখে তরুণ প্রজন্ম অনুকরণ করছে ফলে ভারতের কাপড় নিম্নমানের হলেও বেড়ে গেছে চাহিদা। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা চলে যাচ্ছে ভারতে। সরকার এ বিষয়গুলো বিবেচনা না করলে খুব দ্রুত বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতের হাতে চলে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা। গতকালের কেনা-কাটাতে রাজধানীর মার্কেটগুলো ছিল ক্রেতাদের পদভারে মুখরিত। ক্রেতা ভরপুর মার্কেটগুলোতে কেনা-বেচার কমতি ছিল না। তবে দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি কম হচ্ছে বলে জানান বিক্রেতারা। রাজধানীর বিলাসবহুল শপিংমল এবং স্থানীয় দোকানগুলোতে ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল ক্রেতারা যেন এ দিনটি আগে থেকে কেনা-কাটা করার জন্য বরাদ্দ রেখেছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার মেট্রো শপিং মল, সান রাইজ প্লাজা, প্লাজা এ আর, অর্কিড প্লাজা, রাপা প্লাজায় ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন দোকানিরা তাদের সেরা কালেকশনগুলো দেখিয়ে চলেছে ক্রেতাদের। ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের পোশাক নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাজধানীর সেরা শপিং মলগুলো। এসব শপিংমলের কয়েকজন বিক্রেতা জানান, এবারের ঈদে ভারতীয় বিভিন্ন তারকাদের নামে পোশাকগুলোর দিকে বেশি ঝুকছে তরুণীরা। এ তালিকায় রয়েছে শিলা, দাবাং, শাকিরা, কারিনা, অক্টপাসসহ বিভিন্ন নামের থ্রি-পিস। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি, শান্তি নগরের টুইন টাওয়ার, রাপা প্লাজা, নাভানা টাওয়ার, মেট্রো শপিংমলে রং বেরংয়ের থ্রি-পিস ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। শান্তি নগরের টুইন টাওয়ারের তৃতীয় তলায় আইভি বুটিক, বাপ্পী ব্লক ফেয়ারসহ-এর আশপাশের বেশ কয়েকটি দোকানে দেশীয় কাপড়ের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে। নিপুন হাতের কারুকার্য ফোটানো এ সব পোশাকও সকল প্রকার ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। এসব দোকানে প্রতিটি থ্রি-পিসের দাম রাখা হচ্ছে নিম্নে ৫শ' টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা দরে। অন্যদিকে ভারতীয় থ্রি-পিস ১৫শ' টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। এ মার্কেটের রমনীয় ফ্যাশন, তাইওবা ফ্যাশন, ছোয়াসহ অনেক দোকানে রং বেরংয়ের ভারতীয় থ্রি-পিস শোভা পাচ্ছে। প্রতিটি সেটের দাম সর্বনিম্ন ১৫শ' থেকে ১০ হাজার টাকা হাঁকানো হয়েছে। বিক্রেতারা জানান প্রত্যেক প্রকার পোশাকেরই দাম বেড়েছে। গতবারের তুলনায় কোন কোন পোশাক দিগুণ দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিও গত বছরের চেয়ে কমে গেছে। দুপুর সাড়ে ১২টা বেজে গেলেও কিছু কিছু দোকানের বিক্রেতারা জানান, তাদের এখনো বিক্রির খাতা খোলার সুযোগ হয়নি। তবে আশাবাদি বেলা ২টার পর থেকে বিক্রি বেড়ে যাবে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এ সব শপিংমলগুলো বিভিন্ন রকমের কুপন সিস্টেম চালু করেছে। পুরস্কার হিসেবে ফ্রিজ, মোটরসাইকেল রিফ্রেজারেটর, ওয়াসিং মেসিনসহ বিভিন্ন আইটেমের পণ্যসামগ্রীর ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। প্রতি ৪শ' টাকার জিনিস ক্রয়ে দেয়া হচ্ছে একটি করে কুপন। এভাবে যে যত বেশি টাকার পোশাক বা অন্যান্য মালামাল ক্রয় করবে সে তত বেশি কুপন পাবে।
পবিত্র রমযানের রহমতের ১০ দিন পার হয়ে গেছে আগেই। মাগফিরাতের দশক শুরু হতে না হতেই শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। আর একদিন পর শুরু হয়ে যাবে নাজাতের দশক। তারপর চলে আসবে সেই আকাঙ্ক্ষিত দিনটি ঈদুল ফিতর। আনন্দ বাড়িয়ে দিতে নতুন পোশাক কেনার যে হিড়িক পড়েছে তাতে করে বিক্রেতাদের দম ফেলবার ফুসরত হচ্ছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি সমিৃদ্ধশালী হলে সবচেয়ে উপকৃত হবে বাংলাদেশের মানুষ। চাকচিক্যের মোহে নিজ দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হবে সবচেয়ে বেশি আত্মঘাতী। গুণে কিংবা মানে নয় শুধু ভারতীয় তারকাদের নামে এ সব পোশাকের নামকরণ করায় বিক্রি হচ্ছে ব্যাপক। এর ফলে দেশীয় পোশাক শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। গুণে ও মানে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশী পোশাক বিক্রির পরিমাণ খুব কম। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশী শিল্পকে ধ্বংস করতেই ভারত থেকে ঈদ মওসুমে পোশাক আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। তাই দেশের টাকা বিদেশীদের হাতে তুলে না দিয়ে দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে দেশী পোশাকেই ঈদ উদ্যাপন করতে দেশী পোশাক বিক্রেতারা ক্রেতাদের আহবান জানিয়েছেন। একই সাথে সরকারের অদূরদর্শিতার পরিণাম দেশীয় শিল্পের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। তাই অবিলম্বে ভারতীয় পোশাক আমদানি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

