|
|
বেহাল সড়ক ও ট্রেন স্বল্পতায় ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়বে নদীপথে
কামাল উদ্দিন সুমন : একদিকে সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা, অন্যদিকে যাত্রীর তুলনায় ট্রেনের স্বল্পতায় ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে লঞ্চের ওপর। তাই এবারের ঈদে লঞ্চ চলাচল হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সদর ঘাট থেকে ৩৮টি রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীবাহী লঞ্চের প্রায় ৩০ লাখ যাত্রী এবার নাড়ির টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ঈদে ঘরে ফিরবে। অনেক লঞ্চ চলাচলের প্রায় অনুপযোগী, এমনকি অযোগ্য হওয়ায় এবং অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ঈদে লঞ্চ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
নদীপথে যাতায়াতকারী একাধিক লোকজনের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের যেখানে নদীপথে যাওয়া সম্ভব, সেখানে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা নৌযানের দিকেই ছুটবে। আর কর্তৃপক্ষ যেতই লঞ্চের ছাদে বা ডেকে অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করুক, তার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
সদরঘাট টার্মিনালে বিআইডব্লিউটি-এর পর্যবেক্ষণ সেল সূত্রে জানা যায়, সাধারণ সময়ে বৃহস্পতি ও শুক্রবার সদরঘাট থেকে ১১০টি লঞ্চে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার যাত্রী চলাচল করে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন লঞ্চের চলাচল (ট্রিপ) বাড়ানো হয়। ঈদের আগের কয়েক দিনে সদরঘাট থেকে প্রতিদিন আড়াই থেকে ৩ লাখ যাত্রী লঞ্চে চলাচল করে। এবার সড়ক এবং ট্রেনের সমস্যার জন্য যাত্রী আরও বেশি হতে পারে। ফলে ঝুঁকি বাড়বে।
লঞ্চ মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র ঈদে দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চযাত্রী প্রায় ৩০ লাখ। সঠিক নিয়মে যাত্রী বহন করার কথা থাকলেও যে পরিমাণ লঞ্চ রয়েছে তাতে এর অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে লঞ্চ মালিক সমিতি অসাধু পন্থায় সিন্ডিকেট করে ঢাকা ঘাটে অর্ধেক সংখ্যক লঞ্চ বসিয়ে রেখে বরিশাল থেকে ৩টি এবং ঢাকা থেকে তিনটি করে লঞ্চ চালায়। রোটেশন প্রথার আওতায় বরিশাল-ঢাকা রুটের লঞ্চগুলোতে যে পরিমাণ কেবিন রয়েছে যাত্রীর সংখ্যা তার থেকে অনেকগুণ বেশি।
বিআইডব্লিউটিএ-এর হিসাব মতে দক্ষিণাঞ্চলে নৌরুট রয়েছে ৮৮টি। এরমধ্যে ঢাকার সাথে সরাসরি নৌযান চলাচল করে ৩৮টি রুটে। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে ফিটনেস সনদ নিয়ে চলাচলকারী লঞ্চের সংখ্যা মাত্র ২শ'। অথচ প্রতিদিন শুধু ঢাকা সদরঘাট ও দক্ষিণাঞ্চলের ৩৮টি নৌ বন্দর থেকে যে পরিমাণ লঞ্চযাত্রী পরিবহন করে তার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।
সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের জরিপ শাখার তথ্য অনুযায়ী- দেশে যাত্রীবাহী লঞ্চের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৭৫টি। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে যাতায়াতকারী লঞ্চের শতকরা ৭৫ ভাগেরই ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। ৮০ ভাগ লঞ্চের তৈরি অবকাঠামোর সঙ্গে মূল নকশার মিল নেই। ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট তদারকি নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একশ্রেণীর অসাধু লঞ্চ ব্যবসায়ী ঈদের বাড়তি যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কর ও ঝুঁকিপূর্ণ শত শত লঞ্চ ঘষেমেজে রং করে নদীতে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এসব লঞ্চের অধিকাংশ মালিকই সরকারি দলের ছত্রছায়ায় প্রতিবছর ঈদে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ দিয়ে যাত্রী পরিবহন করে। যাত্রী পরিবহনে সম্পূর্ণ অক্ষম এসব লঞ্চ আবার পরিচালিত হয় অদক্ষ মাস্টার, সুপারভাইজার ও ড্রাইভার দিয়ে। ফলে যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি প্রায়ই নৌ দুর্ঘটনায় দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের প্রাণহানি ঘটে থাকে। মাত্র দুই বছর আগেও কুরবানীর ঈদের আগের দিন অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই কোকো-৪ ভোলার লালমোহনে নিমজ্জিত হয়ে কয়েকশ প্রাণহানি ঘটে। এছাড়াও নাসরিন, সামিয়া, দ্বীপকন্যা, উপদ্বীপ, ফজলে খোদাসহ বেশ কয়েকটি লঞ্চ দুর্ঘটনায় কয়েক হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর বন্দর পরিচালক শফিকুল হক জানান, ঈদে শুধুমাত্র দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চযাত্রী থাকে প্রায় ত্রিশ লাখ। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে লঞ্চ মালিকদের সহনশীল হওয়া উচিত। যাত্রী দুর্ভোগ কমাতে আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব আমরা পদক্ষেপ নেই। প্রত্যেক বছরের মত এবারও স্পেশাল ঈদ সার্ভিস থাকছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন জানান, যাত্রী বহনতো দূরের কথা, ফিটনেসবিহীন কোনো লঞ্চ ঘাটেই ভিড়তে নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে যাত্রীরা। ঈদে কতটা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ নৌ পরিবহন সংস্থার চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদল দৈনিক সংগ্রামকে জানান, যাত্রী নেয়ার জন্য এবার পর্যাপ্ত লঞ্চ থাকবে। আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা রেখেছি। তিনি দাবি করেন, ফিটনেসবিহীন কোন লঞ্চ কোন টার্মিনালে থাকতে পারবে না ।
নৌমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌযানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে । আর নৌপথে কারা চাঁদাবাজি করছে, সে বিষয়ে নৌ-শ্রমিকদের কাছে জানতে চাওয়া হবে। সে অনুযায়ী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

