Quantcast
ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 August 2012, ২৫ শ্রাবণ ১৪১৯, ২০ রমযান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১৬৩৭ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

আজ সকাল ১১টায় জাতীয় ঈদগাহে নামাজে জানাযা

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক-এর ইন্তিকাল

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক

স্টাফ রিপোর্টার : উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ, দেশের শীর্ষ আলেম, ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক আর নেই। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর আজিমপুরে নিজ বাসায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শায়খুল হাদিস দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তিনি পাঁচ ছেলে, আট মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। দেশ-বিদেশে তার হাজার হাজার ছাত্র রয়েছে। তার পরিবারের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ প্রায় ৭০ জন সদস্য কুরআনে হাফেজ।

শায়খুল হাদিসের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তার নামাজে জানাযা আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে। শায়খুল হাদিস দেশ-বিদেশে হাদিস বিশারদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় তিনি হাদিসের চর্চা ও পাঠদানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব। চারদলীয় জোট প্রতিষ্ঠাকালীন তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নেতা। ১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে যে লংমার্চ হয়েছিল তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শায়খুল হাদিস। মোহাম্মদপুর সাত মসজিদ জামেয়া রাহমানিয়া মাদরাসাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছেন। দেশ-বিদেশে তার হাতেগড়া হাজার হাজার ছাত্র হাদিসের চর্চা ও গবেষণায় রত আছেন।

জন্ম

তৎকালীন ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ মহকুমার বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং থানার ভিরিচ খাঁ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে ১৩২৬ বাংলা সনের পৌষ মাস মোতাবেক ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন শায়খুল হাদিস। তার বাবার নাম আলহাজ্জ এরশাদ আলী। তিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার মাকে হারান। ফলে নানা বাড়িতে নানী ও খালার কাছে লালিত-পালিত হন।

শিক্ষাজীবন

গ্রামের মক্তবে কিছুদিন পড়ার পর সাত বছর বয়সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামেয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে চার বছর লেখাপড়া করেন। ১৯৩১ সালে ঢাকা বড় কাটারা মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১২ বছর লেখাপড়া করে কৃতিত্বের সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ দাওরায়ে হাদিস পাস করেন। এ সময়ে আল্লামা জফর আহমদ উছমানি, আল্লামা রফিক কাশ্মিরী, মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) প্রমুখ বিজ্ঞ হাদিস বিশারদদের কাছে কুরআন হাদিসের জ্ঞান লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভারতের বোম্বের সুরত জেলার ডাভেল জামেয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হন। সেখানে মাওলানা শাবিবর আহমাদ উসমানি (রহ.), মাওলানা বদরে আলম মিরাঠী (রহ.) প্রমুখের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। শাবিবর আহমাদ উসমানি (রহ.) বুখারী শরিফের যে আলোচনা করেন তা তিনি নোট করে রাখেন। পরবর্তী জীবনে এ ব্যাখ্যাই তার জীবনের বিশেষ সম্বল হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে মাওলানা ইদরিস কান্ধলবি (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে তাফসির বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। পরে তার উস্তাদ মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর নির্দেশে ঢাকায় চলে আসেন।

কর্মজীবন

ভারতের ডাভেলে জামেয়া ইসলামিয়ায় উচ্চ শিক্ষা শেষে সেখানে অধ্যাপনার দায়িত্ব নেয়ার আহবান জানানো হলেও তার মুরুবিবদের নির্দেশে ঢাকার বড় কাটারা মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এ মাদরাসায় দক্ষতার সঙ্গে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। ১৯৫২ সালে লালবাগ মাদরাসার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বুখারী শরিফসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের পাঠদান করেন। সেখানে কৃতিত্বের সঙ্গে বুখারী শরিফের অধ্যাপনায় ব্যাপিত থাকায় তাকে ‘শায়খুল হাদিস' খেতাব দেয়া হয়। এ সময়েই বুখারী শরিফের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়। লালবাগে অধ্যাপনার ফাঁকে ১৯৭১ সাল থেকে দুই বছর বরিশাল জামিয়া মাহমুদিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে বুখারী শরিফের অধ্যাপনা করেন। তিন বছর সেখানে এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া নামে মোহাম্মাদপুরে মোহাম্মাদী হাউজিং এ একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যা ১৯৮৮ সালে মোহাম্মাদপুরের সাত মসজিদের পার্শ্বে নিজস্ব জমির ব্যবস্থা হওয়ায় জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া নামে স্থানান্তরিত হয়। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুরুবিব ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মালিবাগ জামিয়া শারইয়্যায়ও প্রিন্সিপাল হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার ‘শায়খুল জামিয়া' ও ‘শায়খুল হাদীস' হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ মাদরাসায় ‘শায়খুল হাদিস' হিসেবে হাদিসের খেদমত করেন। তিনি হাদিসের একজন গবেষক হিসেবে অধ্যাপনার পাশাপাশি সারা দেশেই ইসলামের দাওয়াত নিয়ে হাজির হন। তার বয়ান শুনতে হাজার হাজার লোক জমায়েত হতো। তিনি লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ, মালিবাগ শাহী মসজিদ ও আজিমপুর স্টেট জামে মসজিদে খতিব হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় ঈদগাহেও ইমামতি করেছেন বেশ কয়েক বছর। তিনি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন মাদরাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাজনৈতিক জীবন

ছাত্র জীবনেই ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এ সময় ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের কারণে নির্যাতন সহ্য করেন। পাকিস্তান আমলে মাওলানা আতহার আলী, মুফতি শফী (রহ.) প্রমুখের সঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টির কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সে সময় উলামায়ে কেরামের একমাত্র দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে হাফেজী হুজুর (রহ.)-এর ডাকে খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। তখন তিনি সিনিয়র নায়েবে আমীর হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৮২ সালে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর সফরসঙ্গী ও মুখপাত্র হিসেবে ইরান, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। এ সফরে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধতার ব্যাপারে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনা করেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের জন্য আয়াতুল্লাহ খোমেনী ও প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

১৯৮৭ সালে তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এ সময় তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৯ সালে ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯১ সালে সমমনা ইসলামী কয়েকটি দল নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করেন। তিনি এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোট ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১টি আসন (সিলেট-৫) লাভ করে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গা হলে এর প্রতিবাদে শায়খুল হাদিস মিছিল, মিটিং ও আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯৯৩ সালের ২-৪ জানুয়ারি বাবরী মসজিদ পুনর্নির্মাণের উদ্দেশে ঢাকা থেকে যশোর বেনাপোল হয়ে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চের নেতৃত্ব দেন। এ লংমার্চে পাঁচ লক্ষাধিক লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমরাওকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং বিমানবন্দর ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দেন। ফলে তৎকালীন সরকার ৯ এপ্রিল ১৯৯৩ সালে তাকে গ্রেফতার করে। জনগণের বিক্ষোভের মুখে অবশেষে ৮ মে ১৯৯৩ সালে সরকার শায়খুল হাদিসকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

লেখালেখি

শায়খুল হাদিসের অনন্য অবদান হলো, বুখারী শরিফের বঙ্গানুবাদ। প্রথমে সাত খন্ডে ও বর্তমানে ১০ খন্ডে সমাপ্ত বুখারী শরীফের এ বিশদ ব্যাখ্যা। গ্রন্থটি আলেম ও সাধারণ শিক্ষিত সবার কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। বুখারী শরিফ অনুবাদ ১৯৫২ সালে হজের সফরে শুরু করেন। ১৬ বছরের কঠোর সাধনায় তা সমাপ্ত করেন। এর অনেক অংশই তিনি রওজা শরিফের পাশে বসে অনুবাদ করেন। ছাত্র জীবনে বুখারী শরিফের উর্দু ব্যাখ্যা (শরাহ) লিখেন। ১৮০০ পৃষ্ঠার এ বৃহৎ গ্রন্থটি ‘ফজলুল বারি শরহে বুখারি' নামে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ‘মুসলিম শরিফ ও অন্যান্য হাদীসের ছয় কিতাব' নামে অনবদ্য এক হাদিসগ্রন্থ সংকলন করেন। এতে বিষয়ভিত্তিক হাদিসসমূহ অনুবাদসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। এর দুই খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া মছনবীয়ে রূমীর বঙ্গানুবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলাম, কাদিয়ানী মতবাদের খন্ডন, মাসনূন দোয়া সংবলিত মুনাজাতে মাকবূল, সত্যের পথে সংগ্রাম এসব বইয়ের রচয়িতাও তিনি।