|
|
পরিবহন সমস্যা সমাধান এবং যানজট নিরসনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ
শাহেদ মতিউর রহমান : পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে গত তিন দিনের ছুটির সুযোগে গ্রামের বাড়িতে পাড়ি জমিয়েছে কয়েক লাখ নগরবাসী। যারা এখনো বাড়ি যাননি তারাও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। ঈদের ছুটিতে নিজের বাড়িতে কয়েকটা দিন কাটাতে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। শেষ সময়ের ভিড় ও ঝক্কি-ঝামেলা থেকে বাঁচতে লোকজনকে এখন থেকেই ঘরমুখো হতে দেখা গেছে। বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর দূরপাল্লার বাস-লঞ্চ স্টেশনগুলোও গত তিনদিনে অনেক বেশি ব্যস্ত দেখা গেছে।
এদিকে ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে রাজধানী থেকে লঞ্চ, বাস এবং ট্রেনে বাড়ি যেতে নগরীর প্রতিটি টার্মিনালেই এখন যাত্রীদের ভিড় বাড়ছে। তবে ঈদে বাড়ি ফিরতে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে ঘরমুখো যাত্রীদের। একে'তো টিকিট সংকট তারপর আবার টার্মিনালে যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে নানা ঝামেলায়। তবে পথের ঝক্কি-ঝামেলা থাকলেও ঘরমুখো যাত্রীদের মধ্যে আনন্দের যেন কমতি নেই। নানা ভিড়ম্বনার মধ্যেই যেন আলাদা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে যাত্রীরা। রাজধানীর অব্যাহত যানজট নিরসনে বিআরটিসি, বিআরটিএসহ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও পরিবহন মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে রাজধানীতে পরিবহন সমস্যা সমাধান এবং যানজট নিরসনের দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার তাগিদও দিয়েছেন অনেকেই।
নগরীর বিভিন্ন টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে রাজধানী থেকে বাইরের দিকে যেসব পরিবহন যাচ্ছে সেগুলোতে ভিড় অনেক বেশি। লাখো মানুষের মিছিল এখন ছুটে চলছে নাড়ির টানে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য পেতে। একে'তো টিকিট বিড়ম্বনা তার উপর টার্মিনালে টানাহেচড়া। এর পরেও ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে ঘরমুখো যাত্রীদের উৎসবমুখর জনস্রোত।
বাস টার্মিনালগুলোতে দেখা গেছে বাসে যারা সিট পাচ্ছেন না তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছেন ছাদে করে কিংবা ইঞ্জিন কভারে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে এদিকে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি'র উদ্যোগে শুরু ঈদ স্পেশাল সার্ভিসে। দেশের বিভিন্ন রুটে বিআরটিসি'র অধিকসংখ্যক একতলা বাস চলাচল করছে। চাহিদা অনুযায়ী বাস সংখা বৃদ্ধি করা হবে বলে জানিয়েছেন বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ। এবার তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন না বলেও জানিয়েছেন তাদের এক কর্মকর্তা। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট না থাকায় বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। তবে রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের স্ট্যান্ডিং টিকিট দিয়ে যাত্রার সুযোগ দেবেন। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে শেষ সময়ে তাদের কোন কিছু করার থাকে না।
নগরীর বাস মালিক সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই পর্যায়ক্রমে কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি শুরু করা হয়েছে। ঈদের বাড়ি যাবার আগাম টিকিট সংগ্রহ করতে ভোর থেকেই নগরী বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে ভিড় জমাচ্ছে ঘরে ফিরতে উন্মুখ যাত্রীরা। তবে অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়েও টিকেট না পেয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। শ্যামলীতে হানিফ কাউন্টারের বিক্রেতা জানান, নির্ধারিত মূল্যে টিকিট বিক্রির পাশাপাশি যাত্রীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন সেদিকেও লক্ষ্য রাখা হচ্ছে।
এদিকে বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সদস্য জানান, টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণে একটি মনিটরিং টিম কাজ করছে। বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। যাত্রী হয়রানি কমাতে টার্মিনালগুলোতে মোতায়েন রাখা হচ্ছে আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর সদস্যদেরও। আগাম টিকিট সংগ্রহ করতে আসা যাত্রীরা জানান, দুই ঘণ্টা শ্যামলী ও হানিফ পরিবহন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পাওয়া যায়নি। ঈদের সময় বাস কাউন্টারগুলোতে মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করতে আসা অনেক মহিলা যাত্রী।
ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বাস, লঞ্চ ও ট্রেন টার্মিনালগুলোতে ঢাকামুখী যাত্রীদের এখন থেকেই ঘরমুখো মানুষের চেয়ে ঢাকায় আসার ভিড় বাড়ছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগের চেয়ে কয়েক গুণ মানুষ প্রতিদিন ঢাকামুখী আসছে। এদের মধ্যে ভাসমান মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ট্রাফিক বিভাগ ও নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি উন্নতির কোন সম্ভবনা নেই। সেইসঙ্গে পরিবহন সঙ্কট দ্রুত সমাধান হবে তা আশা করা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে মালিক, শ্রমিক ও সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় জরুরি। নইলে রোজার পরেও রাজধানীতে পরিবহন সঙ্কট থাকতে পারে। তারা বলেন, সঙ্কট সমাধানে সরকারি উদ্যোগ বেশি জরুরি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও সদরঘাট লঞ্চঘাট পরিদর্শন করে ও যাত্রীবাহী যানবাহনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। এবারের ঈদে সপ্তাহব্যাপী টানা ছুটির ফাঁদে পড়েছে দেশ। এ দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে অন্য যেকোনো বারের ঈদের চেয়ে এবার বেশি পরিমাণে মানুষ রাজধানী ছাড়বে বলে যাত্রী পরিবহনকর্মীরা আশা করছেন। আগামী ১৫ তারিখ বুধবার থেকে এ ছুটি শুরু হয়ে শেষ হবে ২১ তারিখ মঙ্গলবার। এর মধ্যে জাতীয় শোকদিবস, পবিত্র শবেকদর ও ঈদের ছুটি রয়েছে। আগস্টের ২০ তারিখে ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও আগামী ১৪ তারিখ থেকে রাজধানীবাসী পুরোদমে ঢাকা ছাড়তে শুরু করবে।
সায়েদাবাদের সোহাগ পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা খোরশেদ আলম বলেন, দূরপাল্লার গাড়িগুলোতে পুরোদমে ভিড় শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে এ ভিড় শুরু হয়েছে। গতকাল থেকে এ মাত্রা আরো বেড়েছে। মঙ্গলবার থেকে সবচেয়ে বেশি ভিড় হবে। ব্যবসায়ী ছাড়া ছাত্র, বেসরকারি চাকরিজীবী, গৃহিণী ও শিশুরা শেষ সময়ের ভিড় এড়াতে এখন থেকেই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে তবে এখন থেকেই যাত্রীবাহী পরিবহনগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত হারে ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পরিবহনকর্মীরা বলছে সামগ্রিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের কাছ থেকে ঈদ উপলক্ষে সামান্য কিছু বাড়তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। তবে তা মাত্রাতিরক্ত নয়। এদিকে ঈদকে সামনে রেখে সারা দেশের নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে।

