|
|
সরকার পক্ষের সাক্ষী ৪৪ জন হলেও আসামীর পক্ষের সাক্ষী কাটছাঁট করে আদেশ প্রদান
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
0মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারবেন মাত্র ২০ জন --২৮ আগস্ট থেকেই ডিফেন্স সাক্ষী
শহীদুল ইসলাম : সরকার পক্ষ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিপক্ষে ৪৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য রেকর্ড করালেও আসামী পক্ষের সাক্ষ্য প্রদানের জন্য মাত্র ২০ জন নির্ধারণ করে আদেশ দিয়েছেন। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আগামী ২৩ আগস্ট ২০ জন সাক্ষীর নাম ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীকে। এই আদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছেন, এই আদেশের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের সমস্ত পথ তিরোহিত করা হলো। তিনি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলেন, এই আদেশ হাত-পা বেঁধে গরু জবাই করে দেয়ার মত। জোর করে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হলো। তিনি এই আদেশ পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ২০ জন সাক্ষী আনতে বলার অর্থ এখানে আমাদের আসার দরকার নেই। সাক্ষীর সংখ্যা লিমিট করে দেয়ার অধিকার ট্রাইব্যুনালের নেই। আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ২০টি। তা প্রমাণ করার জন্য তারা ২৮ জন সাক্ষী হাজির করেছে। আরও ১৬ জনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তার লিখিত জবানবন্দী আদালত গ্রহণ করেছে। সব মিলিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য তাদের সাক্ষী ৪৪ জন। আর আমার অভিযোগ খন্ডনের জন্য ২০ জন সাক্ষী আনতে পারব। এটা কোন ধরনের বিচার। ২০টি অভিযোগের একেকটির মধ্যেই অনেকগুলো অভিযোগ রয়েছে যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মত অভিযোগ রয়েছে। এতে আসামীর ফাঁসি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ২০ জন সাক্ষী হাজির করার আদেশ দেয়া খারাপ নজির স্থাপিত হবে বলে উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম। তিনি এই আদেশ না দেয়ার অনুরোধ করে বলেন, আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামীপক্ষ যতজন সাক্ষী প্রয়োজন ততজন হাজির করতে পারবে এটাই আইনে আছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সাক্ষী কমিয়ে তাড়াহুড়া করে ন্যায়বিচারকে কবরস্থ করবেন না। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনারা ২৩ তারিখে ২০ জনের নাম দেন। তারপর আমরা যদি দেখি আরও সাক্ষী প্রয়োজন তখন আমরা দেখব। আশা করি আপনারা প্রিজুডিস হবেন না। তাজুল ইসলাম বলেন, তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে। আমরা ৪৮ জন সাক্ষীর নাম দিয়েছি। তারা তো ইতোমধ্যেই অনেকের নামে মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু করেছে। বাকিদের তো আসতেই দিবে না। এই আদেশ ভুল আদেশ। তিনি এই ধরনের আদেশ দিয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন না করার অনুরোধ জানালে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, অর্ডার হ্যাজ বিন পাসড। আমরা এর আগে জেরার সময় বেঁধে দিয়ে পরে তো কনসিডার করেছি। দেখেন কি হয়। ২৩ তারিখে নাম জমা দেন। তিনি সবার কাছে দোয়া চান যাতে ঈদের পরে ‘ন্যায়বিচার' করার বাকি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেন।
বিচারপতি নিজামুল হক ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশন তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষী হাজির করেছে যার মধ্যে ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। বাকিদের মধ্যে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিজে এবং ৭ জন জব্দ তালিকার সাক্ষী। আদেশে ডিফেন্সের ৪৮ জন সাক্ষীর নামের তালিকা জমা দেয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, আমরা আসামীর পক্ষের ২০ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার আবেদন মঞ্জুর করলাম। আগামী ২৩ তারিখে ২০ জনের নাম জমা দিতে হবে এবং ২৮ তারিখ থেকে তাদের সাক্ষ্য প্রদান শুরু হবে। অভিযুক্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বক্তব্য রাখার বিষয়টিও বাদ দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, সব সাক্ষী শেষে তিনি কথা বলতে পারবেন। আর অভিযোগ গঠনের আদেশ পড়ে শুনানোর পর তিনি দোষী না নির্দোষ এ ব্যাপারে তার কথা বলার সুযোগ ছিল যেটা তিনি বলেছেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তাজুল ইসলাম বলেন, আপনারা বলেছেন এটা দেশীয় ট্রাইব্যুনাল। আইনের প্রয়োগও হচ্ছে দেশী কায়দায়। তাহলে এ ক্ষেত্রে দেশীয় আদালতে যে প্রাকটিস হয়ে থাকে সেই অনুযায়ী মাওলানা সাঈদী প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্য সম্পর্কে নিজে কথা বলতে পারেন যেহেতু প্রসিকিউশনের সাক্ষী শেষ।
এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কে আরও অংশগ্রহণ করেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ব্যারিস্টার তানভীর আল আমিন। অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী।
এর আগে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দায়ের করা কয়েকটি আবেদনের নিত্তি করা হয়। এর মধ্যে গত ১৩-৮-১২, ২২-৭-১২, ৩০-৫-১২, ১৪-৫-১২, এবং ২৬-৪-১২ তারিখের জেরার যে বক্তব্য আদালত গ্রহণ করেনি তা গ্রহণ করার আবেদন জানানো হয়। আদালত এগুলো রেকর্ডে রাখার আদেশ দেন। অন্যদিকে মুকুন্দ চক্রবর্তীর পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য জবানবন্দী আকারে গ্রহণকরে ট্রাইব্যুনাল যে আদেশ ইতোপূর্বে দিয়েছেন তার পুনঃনিবেচনা করার আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেয়া হয়। আসামীর সাথে পুনরায় আইনী পরামর্শ করার আদেশ দিতে চেয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল ২২ আগস্ট। এটা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। এতে তানভীর আল আমিন বলেন, তাহলে তো ঈদের ছুটি বলতে কিছু থাকে না। তাজুল ইসলাম বলেন, ২ তারিখে কেউই আসতে পারবে না। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আপনাদের অনেক কাজ আছে। আপনারা ঈদের ছুটি কাটাতে পারবেন না। পরে ২৪ আগস্ট জেলখানায় ২ জন আইনজীবীর সাক্ষাতের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

