|
|
বেগম খালেদা জিয়া
স্টাফ রিপোর্টার : আজ ১৫ আগস্ট বুধবার বিএনপি চেয়ারপার্সন, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেত্রী, আপোষহীন নেত্রীখ্যাত বেগম খালেদা জিয়ার ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৪৪ সালের এই দিনে ফেনী জেলার ফুলগাজী গ্রামের বিখ্যাত মজুমদার বাড়ির সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ন্যায়নীতি ও আদর্শের কারণে তিনি দেশে এবং বিদেশে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বেগম খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। স্কুলে পড়াকালীন সময়েই বেগম খালেদা জিয়া তৎকালীন পাকবাহিনীর চৌকস সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে ১৯৬০ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসাবে একটানা ২৭ বছর পূর্ণ করলেন স্বাধীনতা পরবর্তী দেশে সর্বোচ্চ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বর্তমান চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
বেগম খালেদা জিয়া শৈশব ও কৈশোর জীবন অতিবাহিত হয় দিনাজপুরের মুদিপাড়া গ্রামে। তার পিতা এস্কান্দার মজুমদার পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন দিনাজপুরের চন্দবাড়ির মেয়ে। বেগম খালেদা জিয়া পড়াশোনা করেন দিনাজপুর মিশন স্কুল এবং গার্লস স্কুল সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দুইপুত্র তারেক রহমান পিনো এবং আরাফাত রহমান কোকো। সেনা সমর্থিত ওয়ান ইলেভেনের গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে তার দুই পুত্রকে একাধিক মামলায় গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে আটক অবস্থায় তারা দু'জনই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদেরকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে তারেক রহমান সবকটি মামলায় জামিন নিয়ে লন্ডনে এবং আরাফাত রহমান সরকারের নির্বাহী আদেশে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। যদিও এরই মধ্যে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর নামে নতুন মামলা দেয়া হয়েছে। এবং দুই জনের বিরুদ্ধেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। গত প্রায় চার বছর বেগম খালেদা জিয়া তার দুই পুত্র, পুত্রবধূদ্বয় এবং নাতনীদের ছাড়াই একা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। মাঝে মাঝে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী দেশে আসেন। তবে গেল বছরের শুরুতে তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন তারেক রহমানকে দেখতে গিয়েছেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার গুলীতে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শাহাদাত বরণ করেন। জাতির সংকট মুহূর্তে একজন সার্থক গৃহবধূ ও মা থেকে বেগম জিয়া বিএনপিতে অপরিহার্য হয়ে পড়েন। বাস্তবতার নিরিখে তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের আহবানে তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির একজন প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তিনি আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সততা, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল তিনি দলের বর্ধিত সভায় প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের অসুস্থতায় তিনি ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন এবং একই বছরের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে বিনা প্রতিদ্বনিদ্বতায় প্রথমবার নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে ১ সেপ্টেম্বর দলের চতুর্থ কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার এবং সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৪ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তৃতীয়বারের মত বিনা প্রতিদ্বনিদ্বতায় বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
বিএনপির চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েন বেগম খালেদা জিয়া। সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে বেগম জিয়া তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শুধু আন্দোলনই নয়, তার সাথে কোন রকম সমঝোতা না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি আপোষহীন ভূমিকা পালন করেন। যে কারণে বেগম খালেদা জিয়া ন্যায় ও আদর্শের প্রশ্নে একজন আপোষহীন নেত্রী হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেন। বেগম জিয়া তার দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করেন। ১৯৮৩ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফায় আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আ'লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আরো তীব্র হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল ভেঙ্গে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল ও ৫ দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের নব সূচনা করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও' এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। একটানা নিরলস ও আপোষহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। তারই সুবাদে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে প্রথমবারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে জোটগতভাবে নির্বাচন করে তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তিনি একমাত্র নেতা যিনি এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩ বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া দুইবার বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেন।
বেগম জিয়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দুইবার চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার একটি অনন্য রেকর্ড হচ্ছে গত ৫টি সংসদ নির্বাচনে ২৩ আসনে প্রতিদ্বনিদ্বতা করে সব ক'টিতেই তিনিই জয়ী হয়েছেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম জিয়াই একমাত্র নেত্রী যিনি গণতন্ত্রের জন্য কোনো অন্যায় এবং দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে আপোষ করেননি। নানা ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী বেগম জিয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূরদর্শীতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।
সেনা সমর্থিত গত ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর তিনি আইনী লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে সবকটি মামলায় জামিন নিয়ে মুক্তি লাভ করেন। কারাগারে থাকাকালে তাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে রাজি না হওয়ায় ষড়যন্ত্রকারীদের চেষ্টা সফল হয়নি। তিনি বলেছেন, আমি দেশ ও জনগণকে ছাড়া কোথাও যাবো না। মরলে এ দেশেই মরবো। এখানেই আমার শেষ ঠিকানা। গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি নিশ্চিত পরাজয় জেনেও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। বর্তমান আ'লীগ সরকারের আমলে বেগম জিয়া আবারো দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জনগণের স্বার্থ ও ভোটের অধিকার নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে তিনি সারাদেশে লংমার্চ, সভা-সমাবেশ অব্যাহত রেখেছেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে বিএনপি আবারো শক্তিশালী হচ্ছে। দেশ ও জনগণের জন্য তিনি জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে নিয়ে রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে এ বছরই ৪ দলীয় জোট ১৮ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেছেন, বর্তমান আ'লীগ সরকারের দেশ বিরোধী কোন চুক্তি বাস্তবায়ন হতে দেয়া হবে না। দেশের জনগণের ভোটের অধিকার তথা নির্দলীয় সরকার ছাড়া এ দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারো খালেদা জিয়া সৌদি আরবে পবিত্র ওমরা পালনে গিয়েছেন। ২৯ রমযান তিনি দেশে ফিরবেন। তাই এবার তার অনুপস্থিতিতেই বিএনপি ও অঙ্গ দলগুলো খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করছে। তবে বেগম জিয়া দেশে থাকলেও তিনি তার দুই ছেলে, ছেলের বউ ও নাতনীদের কাউকেউ কাছে পাচ্ছেন না। গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চিকিৎসা নিতে দুই ছেলেই বিদেশে। কবে ফিরবেন তাও তিনি জানেন না। নীলনকশার নির্বাচনে তাকে হারানোর পর বর্তমান সরকার তাকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে করেছে। এমন অভিযোগ বিএনপির। তার নামে নতুন করে মামলা দেয়া হয়েছে। সরকার তাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের নামে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এমনকি আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের সাজা মওকুফ করে নিলেও বেগম খালেদা জিয়ার নামে দায়েরকৃত কোন মামলা এখন পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়নি। বরং মামলার চার্জশিট দেয়া হচ্ছে। দেয়া হয়েছে নতুন মামলা। জোটের অন্যতম শরীক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর, সেক্রেটারি জেনারেলসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করে জোট ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। দেশবাসী আশা করছে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে আ'লীগ সরকারের বাকশালী কায়দায় নির্যাতন বন্ধে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করবে। দেশের জনগণও ফিরে পাবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন। ইতোমধ্যে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন, দেশবিরোধী চুক্তিসহ বিভিন্ন জনবিচ্ছিন্ন কর্মকান্ডের প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বেগম জিয়া। তারই ধারবাহিকতায় ১৮ দলসহ সমমনা দলগুলোকে নিয়ে বৃহৎ ঐক্য গড়ারও কাজ চলছে। ঈদের পরই সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের ডাক দিবেন খালেদা জিয়া।
কর্মসূচি : বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ৬৮তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে দলের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সূত্র জানায়, বিএনপি ও অঙ্গ দলের পক্ষ থেকে কেক কাটা হবে। ছাত্রদল, মহিলা দল, যুবদল কেক কাটার কর্মসূচি পালন করবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংগঠন তার জন্মদিনে আলোচনা সভা, সেমিনার-সেম্পোজিয়ামের আয়োজন করেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বেগম জিয়াকে তার জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

