|
|
বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানের কোন চেষ্টা নেই \ দ্রুত ট্রানজিট বাস্তবায়নের চেষ্টা
0সড়ক ও নৌপথে ভারতের ট্রানজিট পাওয়ার নতুন কৌশল 0বাংলাদেশের রাস্তায় তৈরি হবে মহাজট যার সক্ষমতা নেই0
শহীদুল ইসলাম : উপকূলীয় অঞ্চলে ভারত ও বাংলাদেশের অবাধ নৌ চলাচলের প্রস্তাব এসেছে। একইভাবে নতুন প্রস্তাব এসেছে দু'দেশের পণ্যবাহী যানবাহন সড়কপথে চলাচলের ক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স পুরো ট্রানজিটের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে বলে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতীয় একটি টেলিভিশনের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, তিস্তা চুক্তির সাথে ট্রানজিটের কোন সম্পর্ক নেই। দুটো ভিন্ন ইস্যু। তবে তিস্তা চুক্তি যত দ্রুত হয় বাংলাদেশের জনগণ তত খুশি হবে। এসব ঘটনা ঘটছে খুব দ্রুততার সাথে। বাংলাদেশের কোন সমস্যাই সমাধানের চেষ্টা নেই। ভারত যা চায় তা দেবার কাজই শুধু চলছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে বর্তমান সরকারের মেয়াদ থাকতে থাকতেই ভারত তাদের তল্পীবাহক সরকারের কাছ থেকে ট্রানজিট আদায় করে নিতে চায়। অভিজ্ঞ মহল বলছেন, দু'দেশের পণ্যবাহী গাড়ি দু'দেশের মধ্যে অবাধ প্রবেশের প্রস্তাব এবং উপকূলে জাহাজ চলাচলের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে দেশের সার্বভৌমত্ব বলে কিছু থাকবে না। পরিবহন ব্যবস্থা ধ্বংস হবে। রাস্তাঘাটে ভারতীয় যানবাহনে বেহাল দশার সৃষ্টি হবে এবং সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। ভারত বিনা মাশুলেই পেয়ে যাবে বহুমুখী ট্রানজিট।
তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি গত বছর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর সফরের সময়েই হওয়ার কথা ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপধ্যায়ের কারণে তখন তা হয়নি। ঐ দিন প্রধানমন্ত্রী বললেন, ২ মাসের মধ্যে তিস্তা চুক্তি হবে। পরে আর তিনি কিছু বলেননি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই তিস্তার পানি চুক্তি হবে। কিন্তু যার কারণে চুক্তি হয়নি সেই মমতা এখনো তার অবস্থানেই আছেন। দিল্লীর সরকার মমতার কাছে কয়েক দফা দূত পাঠিয়েছেন। তাতে কাজ হয়নি। বরং তিনিও ছেলে ভোলানো গল্পের মতো দুই দফা ২টি কমিটি করেছেন। প্রথম কমিটি বলেছে, তিস্তার পানি চুক্তির প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে গঠিত কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন খতিয়ে দেখে যে, বাংলাদেশের সাথে আদৌ তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে কোন চুক্তির প্রয়োজন আছে কি না। উদ্ভট দেশ ভারত। কান্ট্রি টু কান্ট্রি চুক্তি হবে সেখানে রাজ্য সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায় এমন নজির পৃথিবীতে নেই। যেখানে যাকে দিয়ে স্বার্থ হাসিল করা যায় সেখানে সেরূপই করে থাকে ভারত সরকার। এটা তাদের স্বভাব। তারা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিতে জানে কিন্তু কাউকে কিছু দিতে জানে না।
এভাবে কোনক্রমেই যখন ভারতকে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে বসাতে রাজি করাতে পারছে না তখনই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন যে, তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তির সাথে ট্রানজিটের কোন সম্পর্ক নেই। এর অর্থ স্পষ্ট যে, মনমোহন সিং-এর সফরের সময় যে কথা সরকার বলেছিল যে- নো তিস্তা নো ট্রানজিট, সেই অবস্থান থেকে সরে আসছে। তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারত যা চায় তা দিয়ে ঐ দেশের আশীর্বাদ অব্যাহত রেখে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে চায়।
সম্প্রতি প্রস্তাব এসেছে উপকূলে দু'দেশের পণ্যবাহী জাহাজের অবাধ চলাচলের এই প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রথম দিকে হয়তো ২/১টি জাহাজ ভারতীয় উপকূলে যাবে। পরে আর যাবে না। যা যাবে তার আড়ালে আমাদের ইলিশ মাছসহ মূল্যবান সম্পদ পাচার হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনো আমদানি নির্ভর দেশ। ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। তাদের দেশ থেকে বাংলাদেশে পণ্য আসবে আমাদের দেশের জাহাজে এটা বাস্তবসম্মত নয়। তারা বলবে আমাদের কি জাহাজ নেই। পণ্য নিতে হলে ভারতীয় জাহাজেই নিতে হবে। আর বাংলাদেশের জাহাজই বা ক'টা আছে। সব মিলিয়ে দেখা যাবে বাংলাদেশের লাভের খাতায় শূন্যই থেকে যাবে। আর ভারত বিনা শুল্কে তাদের পণ্য বাংলাদেশেই শুধু নয় বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর হয়ে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় ৭ অঙ্গরাজ্যে পণ্য পাঠাতে সক্ষম হবে যা তারা বিগত ৬৫ বছর ধরে কোনভাবেই পারছিল না।
দু'দেশের পণ্যবাহী যানবাহন দু'দেশে প্রবেশের প্রস্তাব ও ছেলে ভোলানো গল্পের মতো। ভারতের ওপারে বাংলাদেশের কোন অংশ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের পূর্বাংশে ভারতের ৭টি রাজ্য রয়েছে। ফলে এই প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে ভারত তার মূল ভূখন্ড পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্যে অবাধে পণ্য পাঠানোর সুযোগ পাবে বিনা মাশুলে। বাংলাদেশের রাস্তাঘাট ব্যবহার করবে ভারত। তাতে বাংলাদেশের লাভের কিছুই নেই। ভারত এই সুবিধা পেলে তাদের পণ্যবাহী ট্রাক ঢুকবে বেনাপোল, দর্শনা, সোনামসজিদ, হিলি, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে আর এসব ট্রাক তারা নিয়ে যাবে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম, অরুনাচল ও নাগাল্যান্ডে। আবার ত্রিপুরা থেকেও বাংলাদেশ হয়ে ট্রাক যাবে আসামে, যাবে মেঘালয়ে। আসাম থেকে বাংলাদেশ হয়ে ট্রাক যাবে মিজোরামে। এভাবে অবাধ ভারতীয় পণ্যবাহী যানবাহনের আসা-যাওয়ার ফলে বাংলাদেশে তৈরি হবে ট্রাক জংশনে। এত বিপুলসংখ্যক ট্রাক আসবে যার ভার বহনের মতো ক্ষমতা আমাদের দেশের রাস্তাঘাটের নেই। সর্বোপরি দেশীয় যানবাহনের ভারেই আমাদের দেশের রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা সবার জানা। তার ওপর এই প্রস্তাব পাস হলে আরো দ্বিগুণ গাড়ি বের হবে রাস্তায়। তখন অবস্থা হবে যানজট নয় মহাযানজটের। সেই অবস্থা শামাল দেয়ার মতো সামর্থ বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশের রোড ক্যাপাসিটি সেরূপ নেই। আবার সড়ক ও নৌপথ একচেত্ত ব্যবহার করবে ভারত। মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রাক পাঠাবে ভারত। সব মিলিয়ে উপকূলে অবাধ নৌ চলাচল এবং পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থা হবে আরো করুণ। দ্বিতীয়ত দেশীয় পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যার ফলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে আমাদের অর্থনীতি। সর্বোপরি ভারতের পূর্বাঞ্চলের ঐ সাতবোন রাজ্যমালায় পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রাকের মধ্যে পণ্যের নামে অস্ত্র গোলাবারুদ যদি যায় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে কে। আর এটা যাওয়া স্বাভাবিক। কারণ, ঐ ৭ রাজ্যেই চলছে স্বাধীনতার আন্দোলন। এরূপ অবাধ যাতায়াতের সুযোগে যদি অস্ত্র গোলাবারুদ যায় আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য তখন ঐ সব স্বাধীনতাকামীদের তোপের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু তখন হবে বাংলাদেশ। ফলে দেশের সার্বভৌমত্বই হবে বিপন্ন। নামেই থাকবে বাংলাদেশ স্বাধীন কিন্তু কর্তৃত্ব চলে যাবে সন্ত্রাসী চক্রের হাতে। আর তাতে ধুয়ো দেবে ভারত। বাংলাদেশের লাভের খাতায় শূন্যই থাকবে।

