|
|
মেডিকেলে ভর্তি বাণিজ্য ও দলীয়করণ প্রবণতা বাড়বে
খালিদ সাইফুল্লাহ : এসএসসি-এইচএসসির ফলের ভিত্তিতে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির বিষয়ে সরকারের ‘তড়িঘড়ি' করে নেয়া সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন দেশের শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনরা। পরীক্ষা ছাড়াই ২০১২-১৩ সেশনে মেডিকেলে ভর্তির সরকারি সিদ্ধান্ত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন বিপর্যস্ত করবে বলে আশংকা ব্যক্ত করেছেন তারা। হঠাৎ করে পরীক্ষার মাত্র এক মাস আগে এ সিদ্ধান্ত নেয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য নয় মন্তব্য করে তারা বলেছেন, সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধের কথা বললেও এর ফলে ভর্তি বাণিজ্য ও দলীয়করণ করার প্রবণতা বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অনৈতিক। অবিলম্বে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আইন করে সরকার কোচিং বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী যাবে কোথায়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, পরীক্ষা নিলে অসুবিধা কোথায়। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, ভর্তি বাণিজ্য করার জন্য কি পরীক্ষা উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, জিপিএর ভিত্তিতে ভর্তি হলে ভিকারুন নেছা স্কুলের মতোই মেডিকেল ভর্তিতে দুর্নীতি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর সাবেক ভিসি অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ বলেন, সরকার হঠাৎ করেই সিদ্ধান্তটা নেয়ায় বিপদে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। কারণ তারা এতদিন ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। এখন এই সিদ্ধান্তে তারা বিরাট হোঁচট খেয়েছে। তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটা ছিল ‘অনাকাঙ্ক্ষিত'। অনেক আগে থেকেই বিষয়টা জানানো উচিত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ভিসি মনে করেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হয় সব বিষয় নিয়ে। আর ভর্তি পরীক্ষাটা হয় সাধারণত নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর। অর্থাৎ এটা আরো ‘ফোকাসড'। এছাড়া সরকার মনে করলেও আসলে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ওপর জনগণের পুরোপুরি বিশ্বাস নেই। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে সেই সমস্যাটা নেই। এর ওপর সবার আস্থা রয়েছে। এটা একেবারে নিখুঁত এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবী নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে সবাই।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির আগে যোগ্যতা বিচারের জন্য বাড়তি কিছু ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অনেক দেশেই এটা দেখবেন আপনি। তাছাড়া ‘কোচিং সেন্টার বাণিজ্য' বন্ধের জন্য মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষাই বাতিল করতে হবে- এমন যুক্তির সঙ্গেও একমত নন হোসেন জিল্লুর। তার মতে, ভর্তি পদ্ধতি বদলের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে সরকারের আরো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা থাকা উচিত। নতুন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া জিপিএর ভিত্তিতে ভর্তির মাপকাঠি কি হবে তা ঠিক করার পরই সরকার ভর্তি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারত। মেডিকেলে সরাসরি ছাত্র ভর্তির যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলই যথেষ্ট। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন দাবির সঙ্গেও একমত নন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এটা (এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মান) নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতিকে হঠাৎ করে কোনোরূপ জনমত যাচাই ছাড়াই পরিবর্তন করে সরকার অদূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ করা, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বন্ধ করা ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ করা জন্য সরকার ভর্তি পরীক্ষা না নেয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয়। তিনি অবিলম্বে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা নিয়ে এবং এসএসসি ও এইচএসসির নম্বরের সমন্বয়ের ভিত্তিতে মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এন এ কামরুল আহসান ও জেনারেল সেক্রেটারি ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার হঠাৎ করে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে ভর্তির ঘোষণা দিয়ে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জিপিএ'র ভিত্তির কথা বলা হলেও বাছাই প্রক্রিয়ার কোন স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা না করায় পুরো বিষয়টি অবিবেচনাপ্রসূত, হঠকারী ও অস্বচ্ছ। আমরা আরো লক্ষ্য করছি যে, দেশের অন্যান্য সেক্টরের বিশৃক্মখলা ও নৈরাজ্যের মত রাজনৈতিক সুনাম অর্জনের জন্য, পাবলিক পরীক্ষার পাসের হার বৃদ্ধির ও জাতীয় শিক্ষার হার উন্নয়নের অপচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতির মান বজায় না রেখে, গণহারে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই তছনছ করে দেয়া হয়েছে। ফলে পাবলিক পরীক্ষাসমূহের মান নিয়েও জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এরকম পরিস্থিতেই দেশে বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষাগুলো চালু হয়েছিল। অথচ অতীতে স্বীকৃত মানসম্মত পাবলিক পরীক্ষাসমূহের ফল দিয়ে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা ছিল এবং এটাই বাঞ্ছনীয়। তাহলেই ভর্তি নিয়ে বাণিজ্য ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয় না। বুয়েট এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তির পদ্ধতি একই ধরনের থাকা বাঞ্ছনীয় এবং এজন্য এসএসসি ও এইচএসসিসহ মৌলিক সকল পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতির মান উন্নয়নের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে আমরা মনে করি। অপরদিকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি ব্যবস্থা স্বপ্ন দর্শনের মত হঠাৎ করে জনমতের কথা বিবেচনায় না এনে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার সরকারের এ আচরণ স্বৈরাচারী মানসিকতাই প্রকাশ করে। এটা না গণতান্ত্রিক না ব্যবস্থাপনা নীতিসম্মত এবং এর ফলে সকল মহল ও জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রচলিত নিয়ম বহাল রেখে পাবলিক পরীক্ষাসমূহের ফল সকল মহল ও উচ্চতর শিক্ষায় প্রবেশের জন্য গ্রহণযোগ্য করে সমন্বিত শিক্ষা ও ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি আমাদের দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশ চিকিৎসক সংসদের সাধারণ সম্পাদক মোশতাক হোসেন মনে করেন, বাস্তবতা বিচার করে সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অন্তত এক বছর আগে নেয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করার আগে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনাও করা দরকার। তিনি বলেন, জিপিএ'র ভিত্তিতে স্কুল থেকে কলেজে ভর্তি করা চলে, উচ্চ শিক্ষায় নয়।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মন্তাজুল হক, যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে তিনি হতবাক। তারা অন্তত এক বছর সময় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত জানাতে পারত।

