|
|
মক্কায় ওআইসির বিশেষ সম্মেলন সমাপ্ত
সংগ্রাম রিপোর্ট : ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সিরিয়ার বিদ্রোহ সহিংসতার সাথে দমনের দায়ে সিরিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করেছে। মক্কা শরিফে মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক শীর্ষ বৈঠকে গতকাল বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া ওআইসি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমস্যাটি জাতিসংঘে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় বলে এক সমাপনী বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিষয় মোকাবিলায় মিয়ানমার সরকারের পদক্ষেপকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে। তারা ফিলিস্তিনীদের প্রতি তাদের সমর্থন পুর্নব্যক্ত করে।
রোহিঙ্গা ইস্যু জাতিসংঘে তুলবে ওআইসি
ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) বৃহস্পতিবার মিয়ানমারে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলিমদের ইস্যুটি জাতিসংঘে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের অব্যাহতভাবে সহিংসতা অবলম্বন এবং তাদের নাগরিকত্বের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতির নিন্দা জানানো হয়। শীর্ষ সম্মেলনের এক চূড়ান্ত বিবৃতিতে বলা হয়, এই সম্মেলন ও বিষয়টি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সামনে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শীর্ষ সম্মেলনে আগে শনিবার ওআইসি ঘোষণা দেয় যে সংস্থা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সহায়তার ব্যাপারে মিয়ানমারের সবুজ সংকেত পেয়েছে। সংস্থা জানায়, রাখাইন প্রদেশে শোচনীয় মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে শুক্রবার রাজধানী ইয়াঙ্গুনে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সঙ্গে সংস্থার একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠকের পর মিয়ানমার এ সম্মতি দেয়। প্রতিনিধি দল থেইন সেইনকে আশ্বস্ত করে যে সংস্থা দাঙ্গাকবলিত রাখাইন প্রদেশের সকল বাসিন্দাকে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। সৌদী বার্তা সংস্থা এসপিএ জানায়, শনিবার সৌদী বাদশাহ আব্দুল্লাহ রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূল অভিযান, হত্যা, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক বাড়িঘর থেকে বিতারিত করাসহ নানাবিধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার বর্ণনা করে তাদের জন্য পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৫৭ জাতি গ্রুপের বিবৃতিতে বলা হয়, সম্মেলন ওআইসি এবং তার সকল সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে সিরীয় আরব প্রজাতন্ত্রের সদস্যপদ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবার ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রাথমিক বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং ইরানের বিরোধিতা সত্ত্বেও শীর্ষ সম্মেলনের দ্বিতীয় রাতে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। মক্কায় মঙ্গলবার ও বুধবার দু'দিন ব্যাপী জরুরি সংহতি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ আব্দুল্লাহ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বৈঠকে যোগদান করলেও তার দেশ সিরিয়ার সদস্যপদ স্থগিত রাখার ব্যাপারে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সিরিয়ার সহিংসতা আশু বন্ধের প্রয়োজনীয়তা এবং ওআইসি থেকে সে দেশের সদস্যপদ স্থগিত করার ব্যাপারে একমত হয়। চূড়ান্ত বিবৃতিতে বলা হয়, সম্মেলনে সিরীয় জনগণের ওপর পরিচালিত গণহত্যা এবং অমানবিক নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ওআইসি মহাসচিব একমেলুদ্দিন এহসানেগলু এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে সিরীয় সরকারের প্রতি এক কঠোর বার্তা। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব এমন কোন সরকারকে মেনে নেবে না যারা জঙ্গি বিমান, ট্যাংক এবং ভারী সাজোয়া যান দিয়ে তাদের জনগণকে হত্যা করে। এই সদস্যপদ স্থগিত হচ্ছে ১৭ মাস ধরে সিরীয়ায় চলমান গণঅভ্যুত্থান দমনে দামেস্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। বিশ্বব্যাপী দেড়'শ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্বকারী ওআইসির এ উদ্যোগ আসাদ প্রশাসনকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। গত বছর আরব লীগ গণঅভ্যুত্থান দমনে নৃশংসতার জন্য সিরিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করে। বৈঠকে অন্তর্বর্তী শান্তি পরিকল্পনা আশু বাস্তবায়ন এবং একটি শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের আহবন জানানো হয়। যাতে বহুমত গণতন্ত্র এবং বেসামরিক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে নতুন সিরিয়া গড়ে তোলার আহবান জানানো হয়। সম্মেলনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে সিরিয়ার বর্তমান সহিংসতা ও রক্তপাত বন্ধে এবং সিরীয় সংকটের শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে পুরোপুরি দায়িত্ব পালনের আহবান জানানো হয়। সম্মেলনের সূত্র জানায়, সিরীয় সংকটের নিত্তির লক্ষ্যে মিসর, ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে নিয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর সালেহী গত সোমবার সিরিয়ার সদস্যপদ স্থগিতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এর ফলে এই সংকটের নিরসন হবে না।
ওআইসি সম্মেলন সমাপ্ত
মক্কায় ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসির দুই রাতব্যাপী জরুরি শীর্ষ সম্মেলন গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে শেষ হয়েছে। সম্মেলনের শুরুতেই সৌদি বাদশাহ আব্দুল্লাহ, ওআইসির বর্তমান সভাপতি সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং মহাসচিব একমালউদ্দিন এহসান ওগ্লু বক্তব্য রাখেন। তারা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিয়ানমার ও মালির সমস্যা সমাধানে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহবান জানান।
ওআইসির মহাসচিব মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য জোরদারের আহবান জানিয়ে বলেছেন, ফিলিস্তিন হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের মৌলিক সমস্যা। মিয়ানমার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সেখানে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ চলছে। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ওআইসির জরুরি বৈঠকে ভাষণ দেন। তিনি মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিত্তির জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশে তিনি তুরস্ক, তিউনিসিয়া ও সুদানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেন। মুসলিম বিশ্বের চলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য সৌদি বাদশাহ আব্দুল্লাহর আমন্ত্রণে মক্কায় জরুরি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওআইসিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিনন্দন
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, সিরিয়ার ওআইসির (ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা) সদস্যপদ স্থগিত করায় যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর প্রশংসা করে বলেছে, এটি প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের প্রতি একটি ‘কঠোর বার্তা'। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, ‘আসাদ সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং সিরিয়ার জনগণকে ব্যাপক সহযোগিতা ও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের সংগ্রামের ক্ষেত্রে আজকের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নুল্যান্ড বলেন, ‘সিরিয়ার ওআইসির সদস্যপদ স্থগিত করার মাধ্যমে সংস্থাটি আসাদ সরকারকে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে।' যুক্তরাষ্ট্র এ পদক্ষেপের জন্য ওআইসিকে অভিনন্দন জানায়।

