|
|
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার জামিনে মুক্তি পেলে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসলে কারাগেটের সামনে নেতা-কর্মীরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান -সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘ ১১ মাস ২৭ দিন পর কারাগার থেকে মুক্ত হলেন জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন এ টি এম আজহার। জামিনের সকল কাগজপত্র কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছার ৪৬ ঘণ্টা পর তিনি মুক্তি লাভ করলেন। কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করলেও পুলিশী বেস্টনীর বাইরে যেতে পারেননি তিনি। নিরাপত্তা দেয়ার নামে এ টি এম আজহারের গাড়ির সামনে পিছনে ছিল ডিবি পুলিশ। মগবাজারস্থ বাসার আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ছিল।
এ টি এম আজহারুল ইসলামকে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মগবাজারস্থ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন শেষে বাসায় যাওয়ার পর গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর একের পর এক ১২টি মামলায় তাকে হয়রানিমূলকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়। তার পর একে একে তাকে ৫টি মামলায় জড়ানো হয়। এর মধ্যে পল্টন থানায় ৩টি মামলা। যার নং হচ্ছে ১৮(৯)১১, ১৯(৯)১১ ও ২০(৯)১১। এছাড়া রমনা থানায় ২টি মামলা, যার নং ৩৪(৯)১১ ও ৩৫(৯)১১। এসব মামলায় তাকে ২৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে যায়।
তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এ টি এম আজহারুল ইসলামকে নানাভাবে মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছে। তার ওপর এমন নির্যাতন করা হয়ে যা কোনো জাতীয় নেতাকে এখন পর্যন্ত করা হয়নি।
এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক তাসনীম আলমকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে, হয়রানি করার জন্য ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়েছিল। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি দাগী আসামীদের মতো ডান্ডাবেড়ি পরানোতে দেশে-বিদেশে তীব্র সমালোচনা হয়। পরে তাকে আর ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়নি।
৫টি মামলার মধ্যে ৪টিতেই তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। ১টি তিনি নিম্ন আদালত থেকে জামিনপ্রাপ্ত হন। উচ্চ আদালত থেকে জামিন দেয়ার পাশাপাশি তাকে হয়রানিমূলকভাবে গ্রেফতার না করার জন্য নিদের্শনা দেয়। ৫টি মামলায় জামিন লাভ করার পর গত ২০ মার্চ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে জেল গেট থেকে সাদা মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া তাকে গ্রেফতার করা যাবে না উচ্চ আদালতের এমন নিদের্শের পরও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক থেকে পুলিশী নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় পুলিশ পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিক ও আইনজীবীদের ওপর চড়াও হয়। পরে তাকে আরো ৬টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এ সময় রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তিনি স্টোক করেন। ৬টির মধ্যে ৫টি মামলায়ই তিনি নিম্ন আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। সর্বশেষ পল্টন থানায় ২০১০ সালে দায়ের করা ৮(৭)১০ নং মামলায় গত ১২ মার্চ উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। এছাড়া হাইকোর্টের বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের যৌথ বেঞ্চে, গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া জেল গেট থেকে গ্রেফতার বা হয়রানী না করার নিদের্শ দেয়।
জেল গেটে সাংবাদিক সম্মেলন :
গতকাল দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর হামিদুর রহমান আযাদ এমপি। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাকে ৫টি মিথ্যা মামলায় জড়িত করে রিমান্ডের নামে অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে হাত-পা চিরতরে পঙ্গু করার অপচেষ্টা চালানো হয়। তিনি বলেন, রিমান্ড শেষে তাকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে উপস্থিত করা হয়। ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি সকল মামলায় জামিন লাভ করে গত ২০ মার্চ এই কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া মাত্রই আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে চিলের মতো ছো মেরে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে যায়।
হামিদ আযাদ এমপি বলেন, ঐদিন এ টি এম আজহারকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পরে বহু কষ্টে ডিবিতে তার অবস্থান জানতে পাই এবং পরদিন তাকে আরো পুরাতন ৬টি মিথ্যা মামলা দিয়ে রিমান্ড চাওয়া হয়। ঐ সময় রিমান্ডে থাকাকালীন তিনি পুলিশী নিযার্তনের শিকার হয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এই দফায় ৬টি মামলার সর্বশেষ মামলায় জামিননামা গত ১৪ আগস্ট জেল গেটে পৌঁছায়। জামিননামা জেল গেটে পৌঁছার পরে কারা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে, তাকে গত বুধবার সকালে মুক্তি দেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, বিগত ১৩ জুন হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং ১৬৩৮/১২ এর মাধ্যমে আজহার সাহেবকে আদালতের সুস্পষ্ট নিদের্শ ছাড়া গ্রেফতার বা হয়রানী না করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, এই মর্মে রুল জারি করা হয়েছে এবং ঐ রুলের কপি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি যথাযথভাবে জারি হয়েছে।
হামিদ আযাদ এমপি বলেন, গত মঙ্গলবার এ টি এম আজহারের মুক্তির আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের নিকট পৌঁছার পরে ৪৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত তাকে মুক্তি না দিয়ে বে-আইনীভাবে (Illegal Detention) আটক রাখা হয়েছে। যা আমাদের সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন এবং হাইকোর্টে বিচারাধীন রিটের আদেশ থাকার পরও তাকে মুক্তি না দিয়ে যেভাবে হয়রানী করা হচ্ছে তা আদালত অবমাননার শামিল। তিনি বলেন, আমরা গত বুধবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এবং কারা কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করার পরও তারা সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য না দিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে, সকাল না বিকাল, আজ না কাল বলে সময় ক্ষেপণ করছে এবং আজহার সাহেবকে মুক্তি না দেয়ার জন্য কোনো গোপন চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এ টি এম আজহারকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
অপেক্ষা যেন শেষ হয় না :
সাংবাদিক সম্মেলনের পরপরই জেল গেট এলাকায় পুলিশী নিরাপত্তা বাড়তে থাকে। জেল গেটের সামনে থেকে অপেক্ষমাণ জনতাকে সরিয়ে দিতে থাকে পুলিশ। হাজার হাজার দলীয় নেতা-কর্মীর পাশাপাশি কারামুক্তিপ্রাপ্তদের স্বজনদের সরাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। সবারই একটাই চাওয়া কখন বেরিয়ে আসবেন এ টি এম আজহার। প্রতীক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না।
শেষ মুহূর্তের বাগড়া :
এ টি এম আজহারুল ইসলামের মুক্তির সকল প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাগড়া বাধায় পুলিশ। জামায়াত নেতৃবৃন্দকে জানিয়ে দেয় জেল গেটে কেউ থাকতে পারবে না। এ টি এম আজহারকে তার গাড়িতে সরাসরি তার বাসায় পুলিশই পৌঁছে দিবে। এমনকি তার গাড়িতেও কেউ থাকতে পারবে না। এ সময় হামিদ আযাদ এমপি বলেন, কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করলে তাকে কেন পুলিশী বেস্টনীর মধ্যে থাকতে হবে? তিনি মুক্তি লাভ করলে নিজ দায়িত্বেই বাসায় যেতে পারবেন। এ নিয়ে ক্ষণিকক্ষণ বিতর্ক করে পুলিশ কর্মকতারা। অবশেষে এ টি এম আজহারের গাড়িতে একজনকে উঠানোর ব্যাপারে রাজী হয় পুলিশ। কথিত নিরাপত্তার নামে জেল গেটে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে নিষেধ করে দেয় তারা।
অবশেষে মুক্তি :
অবশেষে বিকাল ৪টা ১৭ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটক থেকে বেরিয়ে আসেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম। তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান হামিদুর রহমান আযাদ এমপি, এডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, ডাঃ সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতৃবৃন্দ। এ সময় নারায়ে তাকবির শ্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে উঠে।
পুলিশী বাগড়ার কারণে গাড়িতে এ টি এম আজহারের ডানে, বামে ও পিছনে ডিবি পুলিশ সদস্যরা উঠেন। শুধুমাত্র সামনের সিটে বসেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ডাঃ সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। সামনে ও পিছনে দুই গাড়ি ছিল ডিবি পুলিশ।
নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন :
কারাগারে গেইটে আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি সেলিম উদ্দিন, মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, এডভোকেট মশিউল আলম, এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, এডভোকেট আবদুর রাজ্জাক, এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, এডভোকেট হেলাল উদ্দিন, শিবির নেতা শাহিন আহমদ খান, এনামুল হক, সাজ্জাদ হোসাইন প্রমুখ।
মুক্তির পর বাসায় পুলিশী বেস্টনী :
বিকাল ৫টায় মগবাজারস্থ এফ টাওয়ারস্থ বাসায় পৌঁছেন এ টি এম আজহার। তার পূর্ব থেকেই বাসার আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান নেয়। পুলিশ বাসার বাসিন্দা ছাড়া অন্য কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। যারা বাসার বাসিন্দা তাদেরও খাতায় নাম ঠিকানা এন্ট্রি করে প্রবেশ করতে হচ্ছে। পুলিশ সবাইকে তল্লাশি করে ঢুকতে দিচ্ছে। তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে এমন খবরের সত্যতা জানতে মিডিয়ার কর্মীরা আসলেও পুলিশ সাংবাদিকদের ভেতরে যেতে দিচ্ছে না। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ওপরের নির্দেশেই কাউকে ভেতরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। মিডিয়ার লোকজনদের ডিসি রমনার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।
এ টি এম আজহারুল ইসলামকে গৃহবন্দি বা নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রমনা থানার পেট্রাল অফিসার শহীদ গতকাল রাত সোয়া ৮টার দিকে দৈনিক সংগ্রামকে জানান, আপনারা এটাকে গৃহবন্দি অথবা নজরবন্দি দুইটাই বলতে পারেন আবার কোনটাই না বলতে পারেন। আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ওপর থেকে বলা হয়েছে, আপাতত কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। তাই আমরা কাউকে যেতে দিচ্ছি না। এ টি এম আজহারকে আবার গ্রেফতার করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি গ্রেফতার করা হতো তাহলে জেল গেইট থেকেই গ্রেফতার করা যেত। যেহেতু তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে তাই আপাতত গ্রেফতারের কোনো আশংকা নেই বলেই মনে হচ্ছে। কর্তব্যরত অফিসার জানান, তারপরও কখন কি ঘটে সেটি তো আমাদের জানার কথা নয়। আমরা ওপরের নির্দেশ মতই কাজ করি। আজহারুল ইসলামের বাসার সামনে পুলিশের ডিউটি স্থায়ী হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেই আমি জানি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের থাকতে বলে আমরা ততক্ষণই থাকবো।

