|
|
নাড়ীর টানে শেষ মুহূর্তের বাড়ী ফেরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে চেপে বাড়ী ফিরছে লোকজন। ছবিটি গতকাল শুক্রবার তোলা -সংগ্রাম
খালিদ সাইফুল্লাহ : নানা ভোগান্তি সত্ত্বেও প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করতে শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটছে মানুষ। বাস, ট্রেন, লঞ্চ সব বাহনেই ধারণ ক্ষমতার অধিক। পথে পথে নানা দুর্ঘটনায় যানজট, ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়, ফেরিঘাটে দীর্ঘ সারি। এত দুর্ভোগের পরও স্বজনদের সাথে ঈদ করার প্রশান্তি মানুষের মুখে।
এবারের ঈদে ১১ দিনের ছুটি ভোগের সুযোগ পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কম বেশি অনেক দিন ছুটি পেয়েছেন। এজন্য এবার সড়কে হঠাৎ বাড়তি চাপ কমেছে। বেশিদিন ছুটি থাকায় মানুষ ধীরে ধীরে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। গত ১৪ আগস্ট থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ছাড়তে শুরু করে মানুষ। এরপর গত চারদিনে সোয়া কোটি মানুষের রাজধানী থেকে লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়েছে। বেশি দিন ছুটি পাওয়ায় এবার যানবাহনের ওপর অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা চাপ কমেছে। কিন্তু ভোগান্তি কমেনি মানুষের। বাস, ট্রেন, লঞ্চ সব পরিবহনেই জনগণের প্রচন্ড ভিড়। ঠাসাঠাসি করে যেতে হচ্ছে তাদের। অনেককে ট্রেনে ঝুলে ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত করতেও দেখা গেছে। রাজধানীর চিরচেনা যানজট এখন ভর করেছে মহাসড়কগুলোতে। ঘন্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটছে ঘরমুখো মানুষের। আর যারা ট্রেনে যাচ্ছেন তাদের ভোগান্তি এবার চরমে পৌঁছেছে। দুর্ঘটনার কারণে সিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে ভয়াবহ আকারে। স্টেশনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হচ্ছে মানুষকে। গত বুধবার রাজশাহীতে ঢাকাগামী পদ্মা এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ায় ২০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।
গতকাল শুক্রবার ছিলো আটাশ রোজা। আর একটি অথবা দুটি রোজার পরই ঈদ। এজন্য এতদিন যারা বাড়ি ফেরার সময় করে উঠতে পারেননি তারা এদিন বাড়ির পথ ধরেন। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে পোশাক শ্রমিকেরা গত বৃহস্পতিবার ৮ দিনের ছুটি পেয়েছেন। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ট্রেনের অপেক্ষারত যাত্রীদের ভিড়। যে ট্রেন সকাল ৬টার আসার কথা তা স্টেশনে এসে পৌঁছেছে দুপুর একটার পর। এরপর আরো দু'ঘণ্টার বিশ্রাম শেষে নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে ট্রেন ছেড়ে যায়। ফলে দীর্ঘ ৯/১০ ঘণ্টার ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। বিশ্রামের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চরম কষ্টে পড়েন মানুষ।
ভোর ৬টা থেকে সুন্দরবন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। ৬টা ২০ মিনিটে আসার কথা ছিল। এখন দুপুর ১১টা বাজে। কখন এসে যে পৌঁছায়, তার কোনো সঠিক সময়ও স্টেশন থেকে জানাচ্ছে না। সন্তান ও পরিবার নিয়ে স্টেশনে সীমাহীন দুর্ভোগে আছি। এভাবেই ভোগান্তির কথা জানান খুলনার যাত্রী আফিয়া নাজরিন। একই অভিযোগ অন্য যাত্রীদেরও।
বগুড়ার সান্তাহারের যাত্রী আব্দুর রহিম বলেন, এমন দেশে আছি, যে দেশের কোনো অভিভাবক নেই বলেই মনে হচ্ছে। কখন ট্রেন আসবে, কখন ছাড়বে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এখন স্টেশনে অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী আব্দুর রহমান অনেকটা ব্যঙ্গ করেই বলেন, ভাই, আর বইলেন না। বেশ আরামে আছি! সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ট্রেন আসার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, পৌনে ১২টায় আসবে। তাও আবার সেটাকেও আনুমানিক সময় বলা হচ্ছে। আসলে যাত্রার শুরুটাই ঠিক না রাখতে পারলে বাকিটা ঠিক কেমন করে রাখবে, সেটাই প্রশ্ন। কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ে ভুক্তভোগী যাত্রীদের ক্ষোভের শেষ নেই। কেউ কেউ এজন্য মন্ত্রীর ওপর দোষ চাপিয়েছেন। শরিফুল ইসলাম নামে এক রংপুরের এক যাত্রী বলেন, মন্ত্রী বড় বড় কথা বলেন। কাজের বেলায় তো কোনো বাস্তবায়ন দেখি না।
সকাল ৯টায় রেলপথমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্টেশন পরিদর্শনে আসেন। মন্ত্রী প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের খোঁজ-খবর নেন। মন্ত্রীকে পেয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক যাত্রী। রেলপথমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যাত্রীদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, আমরা চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখিনি। এতো বড় কর্মযজ্ঞে কিছুটা সমস্যা হতেই পারে। তবে এবারের সমস্যা অন্যবারের তুলনায় খুবই নগণ্য। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় সম্পর্কে তিনি বলেন, কেবল উত্তরবঙ্গের কয়েকটি ট্রেন ছাড়া অন্য সব ট্রেন ঠিক সময়ে ছেড়ে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের ট্রেনে শিডিউল কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। মন্ত্রী উপস্থিত যাত্রীদের ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন।
এদিকে, কাউন্টারে টিকিট না পাওয়া গেলেও দালালরা ঠিকই অবাধে বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রুটের টিকেট। স্টেশনের বিভিন্ন জায়গায় নীরবে কিছু দালাল চালিয়ে যাচ্ছেন বেশি দামে টিকিট বিক্রির কাজ। যাত্রীদের অভিযোগ, দালালচক্র এসব টিকিট বিক্রি করছে দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ বেশি দামে।
টিকিট না পেয়ে অনেক যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ট্রেনের ছাদে চড়তে দেখা গেছে। রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিয়েও ধরে রাখতে পারছেন না ঘরমুখো এসব যাত্রীদের। স্টেশনে কোনো ট্রেন এসে থামলেই স্টেশনের পূর্ব দিকের খোলা জায়গা দিয়ে দলবেঁধে ছুটে আসছেন টিকিটহীন যাত্রী। ছাদে চড়াই তাদের লক্ষ্য।
সড়ক দুর্ঘটনা ও গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিচ্ছিন্নভাবে যানজট সৃষ্টি হওয়ায় গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দুই রুটে যানবাহন চলেছে ধীর গতিতে। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের। টাঙ্গাইল হাইওয়ে পুলিশের গোড়াই থানার ওসি সানোয়ার হোসেন জানান, গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের তিন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। এসব এলাকায় দুর্ঘটনার কারণে বিচ্ছিন্নভাবে সাময়িক যানজট সৃষ্টি হওয়ায় পুরো মহাসড়কে যানবাহন চলে অত্যন্ত ধীরে। মহাসড়কের ৩০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট দেখা দেয়।
এদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শহীদনগর এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে একটি লরি বিকল হলে যানজটের সৃষ্টি হয়। চান্দিনার কুতুম্বপুর থেকে সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
ঘণ্টাখানেক পর রেকার এনে লরিটি সরানো হলে গতকাল শুক্রবার সকালের দিকে যানজট কমে আসে। কিন্তু বাড়তি গাড়ির চাপে মহাসড়কে যানবাহন চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে গত দুই দিনেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।
ঈদে নদীপথে গ্রামের বাড়ি যেতে গতকাল শুক্রবারও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ভোর থেকেই মানুষ এসে ভিড় করতে থাকে সদরঘাটে। একেকটি লঞ্চ এলেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাতে। কোনো সময়সূচি নেই। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই অধিক যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায় লঞ্চগুলো। তবে ভেতরে সিট ও জায়গা না পেয়ে লঞ্চের ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরছেন অসংখ্য যাত্রী। এমনকি চরম ঝুঁকি নিয়ে মাঝনদী থেকেও অনেককে লঞ্চে উঠতে দেখা গেছে। শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও বরগুনাগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
গাবতলী-মহাখালি বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে যাত্রীর তুলনায় কম গাড়ি। এ সুযোগে ইচ্ছেমতো ভাড়া নিচ্ছে বাসগুলো। আনফিট ও পুরনো বাস দিয়েও যাত্রি পরিবহন করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এতকিছুর পরেও ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে ছুটি শুরু হওয়ায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কম। সব কিছু ছাপিয়ে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আন্দ ভাগাভাগি করার স্বপ্নে বিভোর বাড়িমুখী মানুষগুলো।

