|
|
পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কুইকরেন্টাল কেন্দ্র স্থাপনের অভিযোগ
শাহেদ মতিউর রহমান : আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে গত প্রায় পৌনে চার বছরে স্থাপিত ২৪টি রেন্টাল ও ১৮টি কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুরনো যন্ত্রপাতি বসানোর অভিযোগ উঠেছে। আর এটাকে কেন্দ্র করেই বিদ্যুৎ খাতের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এদিকে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ এবং গ্যাস প্রাপ্তির নিশ্চয়তা না পেয়ে বিদ্যুৎখাতে বিনিয়োগে আগ্রহী দাতারা পিছিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে সরকারের দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে যেতে বসেছে। বর্তমান এই মহাজোট সরকারের আমলে নতুন কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
পিডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, কোয়ান্টাম পাওয়ারের ভেড়ামারা ১১০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট ও নোয়াপাড়া ১০৫ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্টে পুরনো মেশিন আনা হয়েছে। একইসাথে ভোলা ৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্র ও আমনুরা ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্র দুটির জন্য হুন্দাই কোম্পানির পুরাতন মেশিন (প্লান্ট) আনা হয়েছে। তবে এসব প্লান্ট এর মালিকদের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। নরসিংদী ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি অনেক পুরাতন বলে পিডিবির সূত্র দাবি করেছে।
পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমতউল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাত ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পুরাতন মেশিন নতুন হিসেবে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সরকার এ পর্যন্ত ৫৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেছে। এর মধ্যে বড় বা স্থায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার। এর মধ্যে ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপন এখন অর্থায়নের অভাবে অনিশ্চিত। বেসরকারি খাতের বিবিয়ানার দুটি কেন্দ্রে অর্থায়ন করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে সরকারি খাতের ভেড়ামারা ৩৬০ কেন্দ্রের জন্য ঋণ দিতে অপারগতা জানিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন এজেন্সি (জাইকা)। তারা বলেছে, বাংলাদেশ সরকার গ্যাসের নিশ্চয়তা দিতে না পারায় এ প্রকল্পে অর্থ দেয়া সম্ভব নয়। এসব অনিশ্চয়তার কারণেই মূলত এই সরকারের বাকি মেয়াধে আর কোন নতুন বিদুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অনেক কম দরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়ে কাজ পায় দুইটি কোম্পানি। সর্বনিম্ন দর হওয়ায় তারা কাজ পায় কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এত কম মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। কিন্তু এই দর সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় ঋণদাতারা এখন আর এই প্রকল্পে ঋণ দিতে সম্মত হচ্ছে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কার্যাদেশ দেয়া ৫৪টি বিদুৎ কেন্দ্রের মধ্যে অরিয়ন এবং সামিট গ্রুপের সঙ্গে করা ৩টি কয়লা এবং দুইটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সবচেয়ে কমদামে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়।
সরকার ভাড়াভিত্তিক রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হলেও বিশেষ সময় ছাড়া তেলভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবগুলো চালানো হয় না। ফলে কাগজে কলমে এসব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও কার্যত বর্ধিত বিদ্যুতের সুবিধা প্রাপ্তি থেকে শিল্পখাত বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ এসব ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কারণে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভর্তুকির জন্য বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে সরকারকে। কিন্তু দীর্ঘকালীন সুবিধার জন্য মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে।
এদিকে উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলের কথা বিবেচনা করে সরকার ২০২১ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু দেশীয় কয়লা নাকি আমদানি করা কয়লা দিয়ে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে সে বিষয়টি এখনো ঠিক না হওয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনার অগ্রগতি নেই।
সূত্র মতে, ২০২১ সালের মধ্যে সরকার যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে তার মধ্যে রয়েছে বড়পুকুরিয়া কৈলাশ দীঘিপাড়া-৩ এ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানায় ৬০০ মেগাওয়াট, বড়পুকুরিয়া কৈলাশ দীঘিরপাড়-২ এ ৬০০ মেগাওয়াট, বড়পুকুরিয়া কৈলাশ দীঘিরপাড়-১ এ ৬০০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাটে ৬০০ মেগাওয়াট, কেরানীগঞ্জে ৭৫০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রাম দক্ষিণে ৬০০ মেগাওয়াট, বেসরকারি খাতে আইপিপি খাতে চট্টগ্রামে ১৩০০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ৩০০-৬৫০ মেগাওয়াট, মাওয়া মুন্সীগঞ্জে ৩০০-৬৫০ মেগাওয়াট, বাগেরহাটে দক্ষিণ পিপিপি ১৩০০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ১৫০-৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ; কিন্তু কয়লা নিয়ে সরকারের ধীরে চলো নীতির কারণে এসব পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া বাগেরহাটে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ১৩০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি হয়েছে। তবে সে প্রকল্পও নানা জটিলতায় এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

