|
|
বাংলাদেশের গার্মেন্টেস-এর ওপর নিউইয়র্ক টাইমসের আরেকটি রিপোর্ট
নিউইয়র্ক থেকে এনা : যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাশালী এবং বিশ্বনন্দিত নিউইয়র্ক টাইমসে আরেকটি সংবাদ এসেছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের স্বল্প মজুরির ওপর। এটি হচ্ছে টানা তৃতীয় দিনের সংবাদ- যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে টানা দু'দিন বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২৪ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে শীর্ষ সংবাদ হিসেবে ‘এক্সপোর্ট পাওয়ারহাউজ ফিল্্স প্যাঙ্গস অব লেবার স্ট্রাইফ' শিরোনামে এবং ২৩ আগস্ট প্রকাশিত এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ড. ইউনূসকে অপসারনের পর এমডি নিয়োগে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে ‘বেহায়াপনা' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। উভয় প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নারীদের স্বনির্ভর হবার প্রসঙ্গ রয়েছে এবং বর্তমান সরকারের নানা কর্মকান্ডে তা ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করা হয়েছে। আর ২৫ আগস্টে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে ‘ওয়েজ ইন বাংলাদেশ ফার বিলো ইন্ডিয়া' (Wages in Bangladesh Far Below India)-এ সংবাদে বলা হয়েছে, বর্তমানে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে তৈরি পোশাকের বাজারে দ্বিতীয়, কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের অস্থিরতা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জোরালো হওয়ায়। মাত্র ক'বছর আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালেও তৈরি পোশাক রফতানির বাজারে ভারতের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন একেবারেই কম হওয়ায় (ভারতের তুলনায়) রফতানি বাজারে ভারতের স্থান দখল করেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন অবশ্য বাংলাদেশের নারী শ্রমিকের পারদর্শিতা। স্বল্প বেতন সত্ত্বেও তারা জীবিকার প্রয়োজনে যতটা সম্ভব চমৎকার সার্ভিস দিচ্ছেন সেলাই কাজে। বিলাসী মানুষের প্রথম পছন্দের পোশাক হচ্ছে টমি হিলফিগার, গ্যাপ, ক্যালভিন ক্লাইনের মতো সেরা ব্র্যান্ডের কাপড় তারা তৈরি করছেন নিপুণ কারিগরের মতো। যদিও তাদের মাসিক বেতন হচ্ছে মাত্র ৩৭ ডলার প্রতি মাসে এবং এটি হচ্ছে জাতীয় ন্যূনতম মাসিক মজুরি। অপরদিকে, নিকট প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন একই পরিমাণের না হলেও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি বলে নিউইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছে। খবরে বলা হয়েছে, গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন সম্প্রতি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধেও সবচেয়ে কম বেতন হচ্ছে হরিয়ানা রাজ্যে এবং তা মাসিক ৫০০০ ইন্ডিয়ান রুপি অর্থাৎ ৯০ মার্কিন ডলার এবং নয়াদিল্লীতে হচ্ছে সর্বনিম্ন ১১৭ ডলার করে। টাইমস লিখেছে, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত জুলাই মাসে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হয়। সে আন্দোলনে মারুটি সুজুকি ফ্যাক্টরিতে তালা লাগানোর পর একজন ম্যানেজারও খুন হয়েছেন। সে ফ্যাক্টরির মাসিক ন্যূনতম মজুরি হচ্ছে ১২৬ ডলার করে। এর আগের দিনের সংবাদে ঈশ্বর্দীর এক্সপোর্ট প্রমোশন জোনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মজুরি বৃদ্ধি না করার প্রদিবাদ জানাতে গিয়ে র্যাব কর্তৃক নিগৃহীত হবার ঘটনা বিবৃত হয়েছে ২৪ আগস্টের প্রতিবেদনে।
এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে এবং একইসাথে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে যে, প্রতিযোগিতার বাজারে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে এহেন আচরণের জের পড়তে পারে গোটা শিল্পে। উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপীয় বাজারে একটি স্যুয়েটারের দামের চেয়েও কম মজুরি পাচ্ছেন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এ অংক হচ্ছে মাসিক ৫০ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশী পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার নিয়ে যে আলোচনা চলছে তা আর এগুবে না বলে মন্তব্য করা হয়েছে। শিল্প কারখানার পরিবেশ উন্নত এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এএফএল-সিআইও তাদের আপত্তি উঠিয়ে নেবে কিভাবে-এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতোপূর্বে নিহত শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের প্রসঙ্গও রয়েছে। হিলারি ক্লিন্টনের সর্বশেষ ঢাকা সফরের রেফারেন্সও দেয়া হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের হালহকিকত সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্যে এএফএল-সিআইও একজন ইন্সপেক্টর নিয়োগ করেছে বলেও টাইমসের খবরে উল্লেখ রয়েছে।
২৩ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসের অনলাইন মতামত কলামে প্রকাশিত হয়েছে আরেকটি সংবাদ ‘এ্যান এটাক অন গ্রামীণ ব্যাংক, এন্ড দ্য ক্যজ অব উইমেন' শিরোনামে। এটি লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-লেখক ডেভিড ব্রন্সটাইন। এর আগেও তিনি গ্রামীণ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ইস্যুতে কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছেন নিউইয়র্ক টাইমসে। তবে এবারের মন্তব্য প্রতিবেদনে তিনি ড. ইউনূসের সাথে সরকারের আচরণে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ মহলেও লাগামহীন দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন এবং বাংলাদেশের গরিবের চেয়েও গরিব ৮৪ লাখ মানুষের ভাগ্য নিয়ে সরকার ছিনিমিনি খেলছে বলেও উল্লেখ করেছেন। আর এসবই করা হচ্ছে ড. ইউনূসের সাথে প্রানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তি আক্রোশ থেকে-এমন মন্তব্য করতেও পিছপা হননি সাংবাদিক ডেভিড ব্রন্সটাইন। তিনি লিখেছেন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং ইউএস সিনেটরদের উদ্বেগ, আবেদন-নিবেদনের প্রতি কোন তোয়াক্কা না করে শেখ হাসিনা ও তার সরকার সারাবিশ্বে দারিদ্র্য বিমোচনের অনুকরণীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের মতো একটি পত্রিকায় টানা তিনদিন বাংলাদেশের হট ইস্যু প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ইমেজ আরেকবার প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন এবং এ প্রচারণা বিশেষ মহলের মদদে হতে পারে বলেও কানাঘোষা রয়েছে কম্যুনিটিতে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসব সংবাদের কোন ব্যাখ্যা অথবা প্রতিবাদ পাঠানো হচ্ছে বলে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত জানা যায়নি।

