|
|
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালসের একটা টেস্ট ভারত সম্পন্ন করল
ভারত সফরকালে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ। এরশাদ স্রেফ একজন এমপি। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন। কোনো দায়িত্বশীল পদেও নেই। তিনি সরকারের ঘোষিত কোনো দূত বা প্রতিনিধিও নন। তথাপি তাঁকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানোয় প্রশ্ন উঠেছে বৈ কি -ছবি : ইন্টারনেট
সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপে দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। অন্য একটি দেশের সুবিধা করে দিতে মহাজোটের অন্যতম শরীক জাপার চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের দূতিয়ালী নিয়েও জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গত মধ্য আগস্টে আকস্মিকভাবে এরশাদকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয় সে দেশের সরকারের শীর্ষ মহল থেকে। সে মোতাবেক তিনি একটি হাইপ্রোফাইল ভিজিট-এর সুযোগ পান। ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেনন এবং পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই প্রমুখ এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ওঠে। আর এরশাদের দলের মধ্যে একটি অংশে অতি উৎসাহ ও চাঙ্গা ভাবের সৃষ্টি হয়। আরেকটি অংশ চুপচাপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। এরশাদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে আমরা ব্যাপক আলোচনা করেছি। এর মধ্যে আগামী নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি'র অংশগ্রহণের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।' এরশাদ জানান, ভারতের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন দেখতে চায় ভারত। অন্যদিকে ১৮ আগস্ট পাঁচ দিনের সফর শেষে দেশে ফিরে এরশাদ সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘তার এই সফর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসময় এরশাদ দাবি করেন, ‘জোট নয়, একক নির্বাচনের পক্ষেই ভারতের সমর্থন পাওয়া গেছে।' ভারত আপনাকে মহাজোটে থাকার ব্যাপারে কী বলেছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে এরশাদ বলেন, ‘ভারত বললেই মহাজোটে থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এটি আমার দলীয় বিষয়। আমি তাদের বলেছি, একক নির্বাচন করবো এবং সেই সিদ্ধান্তেই অনড় এখনো।' আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই সফরের বড় অর্জন হচ্ছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এককভাবে নির্বাচনের সমর্থন পাওয়া।'
কতিপয় প্রশ্ন
এরশাদের এই সফরসূচি ও আলোচ্য বিষয় এবং এ পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন জনমনে নাড়া দিয়েছে। এক. এরশাদ স্রেফ একজন এমপি। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন। কোন দায়িত্বশীল পদেও নেই। তাকে বাংলাদেশ সরকার তাদের কোন দূত বা প্রতিনিধি হিসেবেও ঘোষণা দেয়নি। তথাপি তাকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলো কেন? দুই. ভারতের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস সভানেত্রীর সঙ্গে এরশাদের সাক্ষাৎ একটা সৌজন্য প্রদর্শন পর্যন্ত মেনে নেয়া গেলো, কিন্তু ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেনন এবং পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই প্রমুখের সঙ্গে এরশাদের বৈঠক কেন? তিনি ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস উইং (র)-এর প্রধানের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বলে ভারতীয় পত্রিকার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। তিন. এরশাদ নাকি ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে তিস্তা ও টিপাইমুখসহ অন্যান্য নদীগুলোর অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সমীক্ষা চালানোর আশ্বাস দিয়েছেন তারা। ভালো কথা। কিন্তু তার এই সফর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে কেন? তিনি তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলেন কেন? আর ‘জোট নয়, একক নির্বাচনের পক্ষেই ভারতের সমর্থন পাওয়া গেছে'- বলে তিনি যে ভাষ্য দিলেন তাই বা কেন? তিনি জোট করবেন কি বিচ্ছিন্ন থাকবেন তাতে ভারতের মাথাব্যথা হবে কেন? পর্যবেক্ষকদের অভিমত, আসলে এরশাদকে এই ‘রাজনীতি' নিয়ে আলোচনা করার জন্য এবং এই ‘রাজনীতির ছক' তাদের মতো করে সাজানোর জন্যই আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই ঘটনাকে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপ' বলেই মনে করছেন। সেই সাথে ‘র'-এর প্রধানের সঙ্গে এরশাদের যদি আলোচনা হয়ে থাকে তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ‘র' আবার কোন সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠতে যাচ্ছে- সে প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সম্ভাব্য কারণ
এদিকে, মহাজোটের অন্যতম প্রধান শরীক জাপা চেয়ারম্যানের এই হঠাৎ ভারত সফরের পেছনে সম্ভাব্য কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে চলছে কানাঘুষা। কারো কারো ধারণা, এরশাদ যাতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ছেড়ে না যান সেটা নিশ্চিত করতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাকে আকস্মিক এই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূত হিসেবে এরশাদ এই সফর করেন। যদিও এরশাদ একে ‘ডাহা মিথ্যা' বলে উড়িয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, ‘তাকে ব্যক্তিগতভাবে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।' তিনি বলেন, ‘তারা আমার সফরকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে।' অন্যদিকে এরশাদের সফরের শুরুতেই কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূত হিসেবে দফায় দফায় ভারতীয় নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করছেন এরশাদ। হাসিনার সাথে এরশাদের সাম্প্রতিক মতবিরোধের কথা নয়াদিল্লীর অজানা নয়। এরশাদ যাতে আগামীতেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সাথেই থাকেন সে ব্যাপারে তাকে রাজি করানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে আনন্দবাজারের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
এরশাদের ভারত সফর নিয়ে অন্য একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথাও বাজারে চাউর হচ্ছে। একদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জোর গলায় বলা হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আবার এরশাদ বলছেন, জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করবে। এরশাদ নিজেও ভারত সফর প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এই সফরের বড় অর্জন হচ্ছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এককভাবে নির্বাচনের সমর্থন পাওয়া।' এই দুই বক্তব্য একই সূত্রে গাঁথা থাকতে পারে। অর্থাৎ মহাজোট সরকার তার দলীয় নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচন আয়োজন করবে এবং ১৮ দলীয় জোট সেই নির্বাচন বয়কট করলে এরশাদ হবেন সেই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। অর্থাৎ আগামী সরকার ও বিরোধীদল উভয়ই হবে ভারতের পছন্দের। সে বিষয়টি পাকাপোক্ত করতেই এরশাদের ভারত সফরের সম্ভাব্য টার্গেট। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির ভারতপন্থী অংশ উৎফুল্ল থাকলেও এরশাদ ভারতের দাবার চালের বিকল্প ঘুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন বলে তার দলের বৃহদাংশের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে সূত্রে প্রকাশ।
এ প্রসঙ্গে আরও কিছু বিষয়কে সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করতে প্রয়াস পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভারতের আগ্রাসনমূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ। সে দিক থেকে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতেও এই পদক্ষেপ হতে পারে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের প্রবল ভারতপ্রীতির অপচ্ছায়ার একটা অংশ এরশাদের দিকে ঠেলে দিয়ে তার ভার খানিকটা লাঘব করতে চেয়েছে ভারত ও আওয়ামী লীগ। কার্যত এসবই ভারতের কংগ্রেস সরকার ও বাংলাদেশের মহাজোট সরকারের পরিকল্পিত নাট্য প্রযোজনার অংশ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। এর মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি উৎসাহ পেলেও বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়ে চলেছে।
সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপের পক্ষে অতীতে কোন সময়ই কেউ এভাবে কথা বলেননি। অনেকেই মনে করছেন, ভারতের সমর্থন পাওয়া নিয়ে এরশাদ যেভাবে গর্বের সাথে কথা বলেছেন, তা অনেকটাই নির্লজ্জতার পর্যায়ে পড়ে, স্বাধীন দেশের রাজনীতিকের জন্য তা মানায় না। তার কথায় বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের জন্য ভারতের সার্টিফিকেট পাওয়া যেন সৌভাগ্যের ব্যাপার, যে সৌভাগ্য লাভ করে তার দল মুহূর্তেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরাট শক্তিধর দলে পরিণত হয়েছে। এরশাদের এই সফর, তার বক্তব্য ও মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভারতের ইচ্ছা নির্ভর করার মত বিপজ্জনক প্রবণতার নগ্ন প্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। এদিক থেকে এরশাদের মিশন এরশাদের চেয়ে ভারতের জন্যই বেশি প্রয়োজনীয় ছিল। ভারত এরশাদকে দিয়ে বাংলাদেশ রাজনীতির পালসের একটা টেস্ট যেন সম্পন্ন করল।

