|
|
নাজমুল আহসান রাজু : সারাজীবন মানুষের আইনগত অধিকার আদায়ে কাজ করেছেন। পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু হলেও এখন তিনিই বিচার বঞ্চিত। এমন হতভাগ্য ব্যক্তি বিএনপি সমর্থক সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও সাবেক ডেপুটি এটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। সকলের কাছে এম ইউ আহমেদ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর একবছরে এম ইউ আহমেদ হত্যাকান্ডের কোনো তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, স্বরাষ্ট্র সচিব, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার ও শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন নিহতের স্ত্রী সেলিনা আহমেদ। কিন্তু সে মামলা গ্রহণ করা হয়নি।
হত্যাকান্ডের পর সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, সরকার কোনভাবে এ হত্যাকান্ডের দায় এড়াতে পারে না। আইনজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ, প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে লাশ রেখে সমাবেশ করেন। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম এম ইউ আহমেদের হত্যাকান্ডের ঘটনায় সরকারকে আল্টিমেটাম দিলেও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
গতকাল শনিবার জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, সুপ্রিমকোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী পুলিশের হেফাজতে নির্যাতনে মারা যাবেন এটা কোন সভ্য দেশে কাম্য নয়। এ ধরনের ঘটনা মর্মান্তিক, মানবতাবিরোধী ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। পুলিশি নির্যাতনে যে তিনি মারা গেছেন এটা নিশ্চিত কারণ, তার দেহে আঘাত ও নির্যাতনের চিহ্ন ছিলো। আমরা হত্যাকান্ডের তদন্তে বার বার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইলেও সরকার কর্ণপাত করেনি। ঘটনার তদন্ত বা বিচারের জন্য কোন পদক্ষেপও নেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হয় না। সরকার পরিবর্তন হলে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করা হবে। জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। নিহতের স্ত্রী যে মামলা করেছিলেন তা আমলে নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বছরের ২ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্রের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ইসলামী ঐক্যজোট আমির মুফতি ফজলুল হক আমিনীর মামলায় আদেশ দেয়ার সময় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করেন। এ সময় উপস্থিত আইনজীবীরা বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানান। তখন আওয়ামী আইনজীবী ও এটর্নি জেনারেলের দফতরের আইন কর্মকর্তারা প্রতিবাদী আইনজীবীদের বিরুদ্ধে তেড়ে আসেন। তারা আদালত কক্ষে আইনজীবীদের বসার টেবিলে উঠে প্রতিবাদী আইনজীবীদের বিরোধিতা করেন। তখন দুই দল আইনজীবীর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে সেই রাতেই ডিবি পুলিশ বাদী হয়ে বিএনপি সমর্থক ১৪ আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালতে পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। পরের দিন মামলার এফআইআর-এ নাম থাকা ১৪ আইনজীবীর সনদ কেন বাতিল হবে না এ মর্মে কারণ দর্শানোর রুল জারি করে একই বেঞ্চ। এছাড়া এ ১৪ আইনজীবীর সনদ ১১ আগস্ট পর্যন্ত সাময়িক স্থগিত করে তাদের আদালতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ মামলায় এফআইআরভুক্ত আসামি ছিলেন এম ইউ আহমেদ। সনদ বাতিলের রুল এবং সনদ স্থগিত করা হয় শুধু বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের। সরকার সমর্থক আইনজীবী যারা লাফিয়ে টেবিলের ওপর উঠে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের প্রতি তেড়ে এসেছিলেন তাদের কিছুই হয়নি। পুলিশের দায়ের করা মামলায় আইনজীবীরা জামিনের আবেদন জানায় হাইকোর্ট বিভাগে। হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ প্রথমে জামিন আবেদনের শুনানিতে বিব্রতবোধ করে। পরবর্তীতে একটি বেঞ্চ জামিনের আবেদনটি নাকচ করতে চাইলে উত্থাপিত হয়নি মর্মে প্রত্যাহার করা হয়। জামিনের আবেদনটি প্রত্যাহারের পর ওইরাতেই এম ইউ আহমেদের বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালায়। নির্যাতনে অজ্ঞান হন এম ইউ আহমেদ। আর বাসায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ২৬ আগস্ট পুলিশের হেফাজতেই মারা যান এম ইউ আহমেদ। তিনি ছাড়া অভিুযক্ত ১৩ আইনজীবী নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান। পরবর্তীতে তাদের জামিন হয়। কিন্তু এম ইউ আহমেদ পুলিশী হেফাজতে থাকায় জামিনের আবেদন করার কোনো সুযোগই পাননি।

