|
|
অসুস্থতার কথা বলা হলেও নেপথ্য কারণ মতানৈক্য
এ কে এম জহির আহমদ
শহীদুল ইসলাম : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক এ কে এম জহির আহমদ পদত্যাগ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের এজলাসে বসে বিচারিক কাজ করার পর আইন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার কথা জানিয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ বলেছেন, ২/১ দিনের মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারকের শূন্যপদ পূরণ করা হবে। তার পদত্যাগ সম্পর্কে আইনমন্ত্রী শারিরীক অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন।
তার পায়ে ব্যথা হওয়ায় ওঠা-নামা করতে ডাক্তার নিষেধ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তবে এই শারীরিক অসুস্থতাই তার পদত্যাগের কারণ নয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছেন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনিত ১৯৭১ সালের কথিত মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ হওয়ার পর পরই আসামী পক্ষকে কোন প্রকার প্রস্তুতিমূলক সময় না দিয়েই সাফাই সাক্ষীর দিন ধার্য্য করা, সাফাই সাক্ষীর সংখ্যা ৪৮ থেকে কাটছাট করে ২০ জনে নামিয়ে এনে আদেশ প্রদান, হরতালের মধ্যেও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরিচালনাসহ নানা বিষয়ে তিনি একমত পোষণ করতে পারেননি। তবে তা প্রকাশ্য আদালতে বিভক্তি না দেখিয়ে পদত্যাগের মাধ্যমেই তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।
সাবেক জেলা জজ একেএম জহির আহমেদ ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার দিনই ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ঐসময় বিচারপতি নিজামুল হককে চেয়ারম্যান এবং বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরকেও সদস্য করে গেজেট প্রকাশিত হয়। চলতি বছরের ২২ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে বিচারপতি ফজলে কবিরকে তার চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। আর ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্যপদে তার স্থলে হাইকোর্টের বিচারপতি আনোয়ারুল হককে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাবেক আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম, বর্তমান আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার বিচার চলমান রয়েছে। জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম ট্রাইব্যুনাল-১ এর নির্দেশেই আটক আছেন। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
বিচারক একেএম জহির আহমেদ অন্যান্য দিনের মত গতকাল মঙ্গলবার সকালে অফিসে আসেন এবং সকাল সাড়ে ১০টায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর এজলাসে বসে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে তিনি গতকালই পদত্যাগ করছেন এমন গুজব ছিল সকাল থেকেই। মধ্যাহ্ন বিরতির পর দুপুর ২টায় পূনরায় কোর্ট বসলেও জহির আহমেদ এজলাসে বসেননি। তখনই গুজবের সত্যতা মেলে। বিচারপতি নিজামুল হক ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক বিকেলের সেশনে বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যান।
বেলা ২টার দিকে প্রথম দফা এবং বেলা সাড়ে ৩টায় দ্বিতীয় দফায় সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার একেএম নাসির উদ্দিন আহমদকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের কোন বিচারক পদত্যাগ করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। এটা আমি আপনাদের কাছ থেকেই শুনলাম। ট্রাইব্যুনালের কোন বিচারককে পদত্যাগ করতে হলে তা রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দিতো হয় কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার বলেন, বিচারক পদত্যাগ করলে সরকারের কাছে পদত্যাগ করবেন, আইন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিবেন। এটাই নিয়ম। রেজিস্ট্রারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার কোন নিয়ম নেই। আমার কাছে কেউ কোন পদত্যাগপত্র জমা দেনও নাই।
ওদিকে গতকাল বিকেলে একটি চেয়ার শূন্য অবস্থায় দুই বিচারকের সমন্বয়ে বিচার কার্যক্রম চলে। এ সময় সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের ১১তম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য প্রদান করেন মাহবুবুল আলম। তার সাক্ষ্য প্রদান শেষে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এডভোকেট আহসানুল হক হেনা ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের কাছে জানতে চান যে জহির সাহেবকে সকালে দেখলাম এখন নেই কেন। জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, উনি অসুস্থ। বসতে চাননি। হেনা বলেন, সকালে তো তাকে সুস্থই দেখলাম। অন্য কোন কিছু ঘটেছে কি না। জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সেটা আপনারা জানতে পারেন। আমরা কিছু জানি না। এডভোকেট হেনা বলেন, তাহলে বোধ হয় কিছু ঘটেছে। এ সময় চেয়ারম্যান বলেন, আরো কত কিছু দেখবেন।
অনলাইন পত্রিকা বার্তা-২৪ ডটনেট জানিয়েছে, বিচারক একেএম জহির আহমেদ আইন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে তিনি ফোনে জানিয়েছেন। তবে পদত্যাগের কারণ তিনি জানাননি। ওদিকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক একেএম জহির আহমেদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে কয়েকদিনের মধ্যে নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ।
তার পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘‘তিনি শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে পদত্যাগ করেছেন। তার পায়ে সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকরা তাকে ওঠানামা না করাসহ বিশ্রামে থাকতে বলেছেন।’’
জহির আহমেদের শূন্যস্থানের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘দুই এক দিনের মধ্যেই ওই ট্রাইব্যুনালে নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া হবে।’’
বিচারক একেএম জহির আহমেদ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারক হিসেবে সব সময়ই ছিলেন সক্রিয়। জেলা জজ হিসেবে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই আইন সঙ্গত পদ্ধতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সব সময়ই সচেষ্ট। বিগত দুই বছরের কার্যক্রম চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের অনেক পদক্ষেপের ব্যাপারেই তার ছিল ভিন্নমত। তবে তা একবারই প্রকাশ করেছেন ভিন্ন আদেশ দিয়ে। চেয়ারম্যানের আদেশের সাথে ভিন্নমত প্রকাশ করে তিনি একবার একটি আদেশ প্রদানকালে বলেছিলেন, আমি মাইনরিটি হতে পারি। কিন্তু আমার মতামত দেয়ার অধিকার আছে। তবে তার ভিন্নমত কার্যকর হয়নি। কারণ অপর দুই বিচারক ছিলেন তার বিপরীতে। ঐ একটি আদেশ ছাড়া তিনি দ্বিমত প্রকাশ করে কোন আদেশ না দিলেও চেয়ারম্যানের সাথে তার মতানৈক্য স্পষ্টই ধরা পড়ে। বিশেষ করে হরতালের মধ্যেও ট্রাইব্যুনাল বসিয়ে বিচার কার্যক্রম চালানোর পক্ষপাতি তিনি ছিলেন না। হরতালের মত বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির দিন হাইকোর্ট, জজকোর্ট কোথায়ও বিচার কার্যক্রম চলে না। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম চালিয়েছে। বিচারক জহির আহমেদ এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না। তিনি কোন হরতালের দিনই এজলাসে বসেননি। পবিত্র মাহে রমযানে সব অফিস-আদালতের কার্যক্রমে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা হলেও ট্রাইব্যুনাল-১ সময় বাড়িয়ে দেন। সকাল সাড়ে ১০টার পরিবর্তে ১০টায় কোর্ট বসানো হয় এবং দুপুরে বিরতির সময় ১ ঘণ্টার পরিবর্তে আধা ঘণ্টা করা হয়। বিচারক জহির আহমেদ এটার সাথে একমত ছিলেন না। তিনি পুরো রমযানেই ১ বা দেড় ঘণ্টা পরে এজলাসে বসেছেন। সবচেয়ে বড় মতবিরোধ সৃষ্টি হয় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী শেষ হওয়ার পর আসামী পক্ষকে প্রস্তুতিমূলক সময় না দিয়েই সাফাই সাক্ষীর তারিখ নির্ধারণ করা এবং সাক্ষীর সংখ্যা কাটছাট করে ৪৮ থেকে কমিয়ে ২০ জনে নামিয়ে আনা। গতকালও সকালে এ সংক্রান্ত আবেদনের উপর শুনানি করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এ সময় তিনি এজলাসে ছিলেন। তবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন তার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তে অটল।

