|
|
স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি নেতা সংসদ সদস্য সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার ২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হলেন- কাজী মোহাম্মদ নূরুল আবসার ও এসএম মাহবুবুল আলম। তারা রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে ১০ম ও ১১তম সাক্ষী হিসেবে গতকাল ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাদের জেরার জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এডভোকেট আহসানুল হক হেনা তাদের দুইজনকেই মাত্র একটি করে জেরা করেছেন গতকাল। পূর্ণাঙ্গ জেরা হবে আগামীকাল। কাজী নূরুল আবসার গতকাল সকালে ২ ঘণ্টা এবং এসএম মাহবুবুল আলম গতকাল বিকেলে পৌনে ২ ঘণ্টায় জবানবন্দি শেষ করেন। এই দুই সাক্ষীর বক্তব্যের মধ্যে একটি ঘটনার মিল পাওয়া যায়। আর সেটা হলো মুক্তিযোদ্ধারা জনৈক ছমির উদ্দিন ডাক্তারের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে ফেরার সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গাড়ি লক্ষ্য করে তারা প্রথমে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ার, পরে গ্রেনেড হামলা এবং শেষে রিভলবার দিয়ে গুলী করেন। এতে ঐ গাড়ির ড্রাইভার স্পটে মারা যান এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গুরুতর আহত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকের ঐ ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে গতকাল এই ২ জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি দেন। তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মালুম ও সুলতান আহমেদ সীমন। তাদের উভয়েরই জবানবন্দি শেষে একটি করে জেরা করেন এডভোকেট আহসানুল হক হেনা। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম ও এডভোকেট রেজাউল করিম।
নূরুল আবসারের জবানবন্দি নিম্নরূপ:-
আমার নাম কাজী মোহাম্মদ নূরুল আবসার। পিতা মৃত কাজী মোহাম্মদ জাবের। আমার মায়ের নাম মৃত কাজী জায়েদা বেগম। আমার জন্ম ১/১/১৯৫২। আমার বয়স ৬১ বছর। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল অনুমান ২০/২১ বছর। আমি ১৯৭০ সালে রাঙ্গুনিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করি। বর্তমানে আমি একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি।
১৯৭১ সালে আমি ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। এলএলবিতে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সারাদেশে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত হয়। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাকে ক্ষমতা না দেয়ায় যে আন্দোলন শুরু হয় আমি তাতে অংশগ্রহণ করি। পরে মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করি। চট্টগ্রাম শহর অঞ্চলেই আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মূলত আমি সংগঠক হিসেবেই কাজ করি। মুক্তিযুদ্ধে আমি ৮নং গ্রুপে কাজ করি। আমাদের গ্রুপ নেতা ছিলেন এসএম মাহবুবুল আলম।
২৫ মার্চের যে ক্র্যাক ডাউন হয় সেখানে সিপাহী-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আমি এই প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করি। যখন পাকিস্তানীরা চট্টগ্রাম শহর দখল করে নেয় তখন আমি পরিবারসহ আমাদের গ্রাম রাঙ্গুনিয়াতে চলে যাই। অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলে রাঙ্গুনিয়া থেকে আমি আমার চট্টগ্রাম শহরের পৈতৃক বাসায় ফিরে আসি। এসে দেখি যে অবাঙ্গালি জনগণ ও পাকিস্তানের সমর্থকরা এ দেশের সাধারণ জনগণের উপর অত্যাচার করছে। আরো শুনতে পারলাম যদিও সামনে যাওয়া সম্ভব ছিল না রাউজানের বিভিন্ন স্থানে যেমন নূতন সিংহ হত্যা এবং উনসত্তরপাড়া, রাঙ্গুনিয়া, গহিরাসহ বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা হচ্ছে। অনেকে দেশান্তরিত হচ্ছে। আমিও দেশান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব মিলে সিদ্ধান্ত নেই যেহেতু শহরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা আছে সুতরাং প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আগের দেশান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত বদল করি। আমি ছাত্র ইউনিয়নের রাঙ্গুনিয়া থানা ও কলেজ শাখার সভাপতি ছিলাম। আমার পরে মাহবুবুল আলম সভাপতি ছিলেন। তিনিও আমার সাথে একমত হন। তিনি সে সময় হাটহাজারীতে তার বাড়িতে না থেকে শহরের খাতুনগঞ্জে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল সাহেব মিয়া এন্ড সন্স সেখানে উনি থাকার বন্দোবস্ত করেন। তখনকার পরিস্থিতিতে ঘন ঘন যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না। এ সময় এসএম মাহবুবুল আলমের সাথে আমার যোগাযোগ হয় এবং তার দলের মধ্যে আমাকে ঢোকানো হয়। আমি তার দলে রিক্রুট হই এবং খাওয়া, দাওয়া ও আশ্রয়ের দায়িত্ব আমি পালন করি। জুন-জুলাইয়ে খাতুনগঞ্জে অবস্থানকারী মাহবুবের কোন খোঁজ-খবর না পাওয়ায় আমরা খুব চিন্তিত হই এবং বিভিন্ন ভাবে খোঁজ নেই। আমাদের পাড়া চন্দনপুরায় আমাদের বন্ধু-বান্ধবের একটা আড্ডা ছিল। সেখানেও মাহবুবকে পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি আলাপ-আলোচনা হয়। এর মধ্যে একদিন ঐ আড্ডার একজন জানায়, তুমি যে মাহবুবের দৈহিক গড়নের বর্ণনা দিয়েছো সেই রকম গড়নের একটি ছেলেকে আহত অবস্থায় আমাদের বাসায় আনা হয়েছে। আমাদের ঐ আড্ডার বন্ধুর নাম আজিজ উদ্দিন তার পিতার নাম ডাঃ ছমির উদ্দিন। তার কাছে জানতে পারি যে চট্টগ্রামে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর যে বাসভবন আছে গুডস হিলের সেই বাসায় স্বাধীনতাকামীদের ধরে এনে অত্যাচার করতো। তাদের মধ্যে যারা বেশি অত্যাচারিত হতো ও জীবনের আশঙ্কা দেখা দিত তাদেরকে গভীর রাতে ডাক্তার ছমির উদ্দিনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হতো। ডাঃ ছমির উদ্দিনের দেখার পরে যাদের বাঁচার সম্ভাবনা ছিল তাদেরকে হয় জেলে না হয় তাদের পছন্দমত কারো কাছে হস্তান্তর করা হতো। যাদের বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না তাদেরকে ডেস্ট্রয় করে ফেলতো এবং তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যেত না। একইভাবে মাহবুবুল আলমের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। মাহবুব আলমের পার্শ্ববর্তী গ্রামের সমবয়সী একটি ছেলে ছিল তার নাম ইউসুফ খান। সেই ইউসুফ খান মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ফিরে আসার পর তার বাবা তাকে গুডস হিলে নিয়ে আত্মসমর্থন করায় এবং এই ইউসুফ খান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমস্ত কাজের সহযোগী হয়ে যায়। ইউসুফ খানসহ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, হামিদুল কবির খোকা, মাকসুদ জিয়া উদ্দিন এরা খাতুনগঞ্জ থেকে মাহবুবকে উঠিয়ে গুডস হিলে নিয়ে যায়। সেখানে তার উপর শারীরিক নির্যাতন করে। আমরা আজিজ উদ্দিনের কাছে জানতে পারি যে নির্যাতনের ফলে তার গায়ে কোন চামড়া ছিল না। টেবিলের উপর পেরেক মেরে বস্তা চাপা দিয়ে তাকে নির্যাতন করা হতো। ফলে তার বাঁচার কোন সম্ভাবনা ছিল না। আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি। এর পরিপেক্ষিতে আমাদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করা হয় যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী যেহেতু নেপথ্যে থেকে ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে সেহেতু তাকে খতম করতে হবে। তবে তিনি যথেষ্ট গার্ডেড থাকতেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে কোন কিছু করা খুব সহজ ছিল না। আগস্ট মাসের শেষের দিকে আমার পাশের বাসায় ছাত্রলীগ নেতা এসএম জামাল উদ্দিন ও হারুন খান ভারত থেকে ফিরে আসে। তখন আমি তাদের দেখ-ভাল করছিলাম। এই অবস্থায় আমার ব্যস্ততা দেখে আজিজ উদ্দিন আমার ব্যস্ততার কারণ জিজ্ঞেস করেন। আমি বলি যে, উনারা মুক্তিযোদ্ধা। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন এবং একটি হিট লিস্ট নিয়ে এসেছেন। এটা শুনে আজিজ উদ্দিনের মুখ কালো হয়ে যায়। মনে হয় তাতে বুড়োটার (ডাঃ ছমির উদ্দিন) নামও আছে। এতে সে ভয় পেয়ে যায়। তাদের পরিবারের রক্ষার বিষয় আমাকে বলে। কি করতে পারি তা জানতে চায়। তখন আমি ভোগাজ কথা বলি যে, যদি তোমাদের ওখানে পারিবারিক প্রোগ্রামে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীরা আসেন তবে আমাদেরকে সেই খবর জানালে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। তখনই প্রমাণিত হবে তোমরা আমাদেরকে সহযোগিতা করছো। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে আমাদেরকে জানানো হয়। তারিখটি ছিল সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে। আমি আমার গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহবুবুল আলমের সাথে কথা বললাম। মাহবুবুল আলম তখন ঐ দুইজনের সাথে আলাপ করে আমাকে রেকি করার দায়িত্ব দেন। রেকি করার পরে আমরা ৪ জন একত্রে মিটিং করি। দিন-তারিখ অনুসারে আমরা প্রোগ্রাম সেট করে দায়িত্ব বণ্টন করি। আমি রাস্তা ঠিক রাখার দায়িত্ব নিই। আজিজ উদ্দিনের সাথে আলাপ করে ঠিক করি যে সে একটি টর্চের মাধ্যমে আমাদেরকে সিগন্যাল দেবে। ঐদিন আমি ছাড়া বাকি ৩ জন পরিকল্পনা অনুযায়ী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যার যার অবস্থান গ্রহণ করে মাগরিবের নামাজের পরে। উনারা সাড়ে ৭টা/৮টার দিকে ডাঃ ছমির উদ্দিনের বাসায় যান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন সদস্যসহ সালাহউদ্দিন ও অন্যরা ঐ বাড়িতে যায়। আমি রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঐ সময় আমার সঙ্গের ৩ জন একটি ড্রেনের স্লাবের নিকট অবস্থান করছিল। আমি তাদেরকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও অন্যান্যদের ডাঃ ছমির উদ্দিনের বাড়িতে আসার বিষয়টি জানাই। তারপর আমি আবার রাস্তায় চলে আসি। রাত সাড়ে ৮টা/পৌনে ৯টার সময় আমি আক্রমণের শব্দ শুনি। প্রথমে স্টেনগান, পরে গ্রেনেড এবং শেষে রিভলবারের গুলীর শব্দ শুনি। আমি বুঝতে পারি যে আক্রমণ হয়ে গেছে। আমি তখন নিরাপদ স্থানে চলে যাই। পরে জানতে পারি যে আক্রমণ হয়েছে এবং মানুষের মাঝে উল্লাস লক্ষ্য করি। আজিজ উদ্দিন আমাদের খবর দেয় যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন না। ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল। ড্রাইভিং সিট লক্ষ্য করে গুলী করা হয়েছিল। পরবর্তী দিন আমরা পত্রিকায় দেখি যে গাড়ির ড্রাইভার মারা গেছে এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পায়ে গ্রেনেডের আঘাতে আহত হয়েছে। পরে তিনি বিদেশে চলে যান। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তার কাছে জবানবন্দি দিয়েছি। আমি যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিলাম তিনি আজ এই ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আছেন। আমি তাকে চিনি।
পরে তাকে একটি জেরা করা হয় যা নিম্নরূপ:
প্রশ্ন : সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া থেকেও এমপি হয়েছিলেন একাধিকবার।
উত্তর : জি।
১১ নং সাক্ষী মাহবুবুল আলমের জবানবন্দী নিম্নরূপ :
আমার নাম এস এম মাহবুবুল আলম। আমার বয়স ৬৩ বছর। আমি ১৯৭০ সালে এইচএসসি-এর ছাত্র ছিলাম। আমি বর্তমানে ছোট খাটো ব্যবসা করি। মুক্তিযুদ্ধকালে আমার বয়স ছিল ২২/২৩ বছর। ১৯৬৯ সালে আমি গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনী কৃর্তক ম্যাসাকার শুরু হওয়ার পরে চট্টগ্রামে পাক বাহিনী কর্তৃক আংশিক দখল হওয়ার পরে আমি রামগড়ে চলে যাই। রামগড়ে আমি তৎকালিন ছাত্রলীগের প্রধান সম্পাদক স্বপন কুমার চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করি। মেজর জিয়া তখন রামগড়ে অবস্থান করছিলেন। স্বপন কুমার চৌধুরী তখন আমাকে মেজর জিয়ার নিকট নিয়ে যান। মেজর জিয়া আমাকে পরদিন সকালের ভেতরে ট্রেনিং সেন্টারে যেতে বলেন। পরদিন সকালে আমি ট্রেনিং সেন্টারে রওয়ানা করে বিকেলে ভারতে ত্রিপুরায় বেকাফা ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে আমাদের চট্টগ্রামের ডাঃ শাহ আলম বীর উত্তম এবং আরো অনেকের সাথে আমার দেখা হয়। ঐ দিন রেস্ট নেয়ার পরের দিন আমাদের ট্রেনিং শুরু হয়। ট্রেনিং ১০ দিন চলে। সেখান থেকে আমাদের চট্টগ্রামের ৪৫ জনের একটি গ্রুপ সিটি গ্রুপ নামে ত্রিপুরার উমপিনগরে ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ট্রেনিং শেষ করে আমাদেরকে হরিণা ক্যাম্পে পাঠানো হয় যা সাবরুমে অবস্থিত। ৭ দিন বিশ্রাম করি। মেজর জিয়া তখন সেক্টর কমান্ডার হয়েছেন। তিনি আমাদের ডেকে চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট চেনে এরূপ একটি গ্রুপ তৈরি করতে বলেন। আমরা ওখানে ১৬ জানের একটি লিস্ট তৈরি করি এবং তা জিয়াউর রহমান সাহেবকে দিই। তিনি সবাইকে ডেকে আনতে বলেন। সবার সাথে উনি কথা বলেন। ১৬ জনকে উনি একটি ফর্ম ফিল আপ করান। উনি আমাকে এই ১৬ জনের গ্রুপ কমান্ডার নিয়োগ করেন। আমাদের গ্রপ নম্বর ছিল ৮ এবং কোড নাম ছিল ব্রাভো কোম্পানি। উনি আমাদের সবাইকে ওজু-গোছল করে পরের দিন সকালে ১০টায় আসতে বলেন। আমরা আসার পরে পবিত্র কুরআনের ওপর হাত দিয়ে আমাদের শপথ করান। শপথের পরে উনি আমাদের সকালের সাথে একা একা কথা বলেন। উনি আমাদেরকে একটি ছোট লিস্ট দেন যাতে ২২টি নাম ছিল। এতে ১ নং নাম ছিল ফজলুল কাদের চৌধুরীর। ২ নম্বরে ছিল সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী। ৩ নম্বরে ছিল দেওয়ান বাজারের দিদার মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা। ৪ নম্বরে ছিল বহদ্দার হাটের চাঁদগাঁও থানার শরাফত উল্লাহ। এরপর বিভিন্ন স্থাপনার নাম উল্লেখ করে অপারেশন করতে বলা হয়। আমাকে অস্ত্রশস্ত্র এং কিছু টাকা পয়সা দেয়া হয়। আমরা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। আমার সাথে ছিল ফজলুল হক ভূঁইয়া, শৌরেন্দনাথ সেন ওরফে কামাল, মোহাম্মদ মহসিন, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, দেওয়ান মাহমুদ, কনক বড়ুয়া, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ কাসেরম, ইউসুফ চৌধুরী, আবেক নাসির উদ্দিন, আহমেদ কামরুল হাসান, জেমস রোজায়িওসহ ১০ জন। চট্টগ্রামে এসে আমরা প্রথমে পাথরঘাটার এক শেল্টারে থাকি। আমার সঙ্গীদের বিভিন্ন শেল্টারে পরে সেট করে দেয়া হয়। কিছু দিন বিশ্রাম নেয়ার পর চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে আমরা অপারেশন শুরু করি যেন জনগণ জানতে পারে যে আমরা এসেছি। আমাদের কাছে খবর আসে যে পাক আর্মি ও তাদের সহযোগীরা চট্টগ্রাম শহর ও তার আশপাশের এলাকায় অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও লুটপাট করছে। পাকিস্তান আর্মিদেরকে বাঙ্গালী যারা পাকিস্তানকে সমর্থন করে তারা তাদের সহায়তা করতো। সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী তাদের নেতৃত্বে ছিলেন। মোজাফফর সাহেবের পরিবার আমার সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ দেয়। উনি বলেন, আমার পিতা ও ভাইকে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহায়তায় পাক আর্মিরা সনাক্ত করে বাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যার। এখন পর্যন্ত তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। এরূপ অভিযোগগুলো শুনে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আলোচনা করি। আমরা বিভিন্ন সেল্টারে মাস্টার ও ইনফরমার নিয়োগ করি। যাহা আমাদের কাজের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। আমরা স্থানীয় ছেলেদের রিক্রুট করে গ্রেনেড, খোলা ও ছুড়ে মারার ট্রেনিং দিই। আমাদের কাছে আরো খবর আসে যে উনসত্তর পাড়া ও রাউজানে অনেক ম্যাসাকার হচ্ছে এবং সব জায়গা থেকেই খবর আসে যে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে আল বদর, আল শামস, রাজাকার বাহিনী বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ধরে এনে গুডস হিলে নিয়ে টর্চার করে হত্যা এবং গুম করা হয়। এগুলোর নেতৃত্বে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম আসে। এসব ঘটনা জানার পরে আমাদের সেক্টর হেড কোয়ার্টার থেকে চাপ দেয়া হয় কিছু করার জন্য। আমি তখন কিছু করার চিন্তা-ভাবনা করি। আমার সহযোদ্ধা কাজী নূরুল আবসারের সঙ্গে শেল্টার মাস্টারের সহায়তায় যোগাযোগ করি। সে তখন আমাকে তার এক বন্ধু মাহবুবুল আলমের অত্যাচারিত ও নিহত হওয়ার কথা জানায়। তখন আমি তাকে অপারেশনের প্লান ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কাজ করতে বলি। কিভাবে এ খবর পেয়েছে জিজ্ঞাসা করায় সে আমাকে জানায়, তার বন্ধু আজিজ উদ্দিনের মাধ্যমে মাহবুব আলমের গুডস হিলে অত্যাচারিত হওয়া ও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করার কথা জানায়। আজিজ উদ্দিন ছিল ডাঃ জমির উদ্দিনের ছেলে। সে আমাকে জানায়, যারা গুডস হিলে অত্যাচারিত হয়ে খুব মারাত্মক জখম হয় তাদেরকে এক ডাক্তার খানায় ডাঃ ছমির উদ্দিনের কাছে আনা হতো। যাদের অবস্থা খুব খারাপ হতো তাদেরকে নিয়ে গুম করা হতো। আমি তখন তাকে এ ব্যাপারে অপারেশন করার দায়িত্ব দেই। ৮/১০ দিন পরে সে একটি ভাল খবর নিয়ে এলো যে আজিজ উদ্দিন তাকে জানিয়েছে যে, তাদের বাড়িতে একটি পারিবারিক প্রোগ্রামে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী আসবে। আমি তাকে প্লান তৈরি করতে বলি এবং জায়গাটি রেডি করতে বলি। সবকিছু ঠিক করে আমরা ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ডাঃ জমির উদ্দিনের বাড়ির নিকটে একটি ড্রেনের স্লাবের নিচে আমি, আমার সহযোদ্ধা সৌরেন্দ্রনাথ সেন ও ফজলুল হক ভূঁইয়া সশস্ত্র অবস্থান গ্রহণ করি। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আজিজ উদ্দিন টর্চের সিগন্যাল দিলে আমরা দেখতে পাই সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব নিজে ড্রাইভ করে একটি গাড়ি নিয়ে ছমির উদ্দিনের বাড়িতে যাচ্ছেন। খাওয়া-দাওয়া করে এক/দেড় ঘণ্টা পরে ঐ বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমরা পূর্ব পরিকল্পনা শফিক আজিজ উদ্দিনের টর্চের সিগন্যাল পেয়ে গাড়ির সামনে দাড়ি। গ্রেনেড চার্জ করি। প্রথমে ফজলুল হক স্টেনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পরে সৌরেন্দ্র গ্রেনেড চার্জ করে। পরে আমি রিভলভার দিয়ে গুলী করি। এর পর আমরা সেখান থেকে চলে যাই। রাতে খবর পাই যে একজন ড্রাইভার স্পস্ট ডেড এবং সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী গুরুতর আহত হয়েছে।
আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট এই বিষয়ে জবানবন্দী দিয়েছি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বসে। সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেব আজ এই ট্রাইব্যুনালের ডকে উপস্থিত আছেন।
জবানবন্দীর পরে যে একটি জেরা করা হয় তা নিম্নরূপ :
প্রশ্ন : আপনি কক্সিকে চেনেন।
উত্তর : জি, সে আমার পাড়ার ছেলে।

