|
|
সুজনের গোলটেবিল আলোচনা
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য পেশ করেন টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান মো. হাফিজউদ্দিন আহমদ খান -সংগ্রাম
0দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কোনভাবে সম্ভব নয়0
স্টাফ রিপোর্টার : আগামী জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া করতে গেলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে। সরকার যদি তার অবস্থান থেকে সরে না আসে, তাহলে রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। এজন্য সরকারকেই দায় নিতে হবে। হঠাৎ করে কেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এই পদ্ধতি বাতিল করা হলো তা নিয়ে সর্বমহলে প্রশ্ন উঠছে। ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যদের স্বপদে বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আর যদি করা হয় তা বিতর্কিত হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সামাজিক আন্দোলন আরো জোরদার করতে হবে। তা না হলে দেশে আবারো ওয়ান ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
গতকাল শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন বনাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার : সরকার কোন পথে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন?' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সুজনের সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা, বিশিষ্ট গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বিচারপতি ইমাদুল হক, সাবেক সচিব বদিউল আলম প্রমুখ। গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে বেসরকারি সাত লাখ জনবল প্রয়োজন হয়। দলীয় সরকারেরর অধীনে নির্বাচন হলে তা কতটুকু নিরপেক্ষ রাখা যাবে তা আজ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, আইনশৃক্মখলা বাহিনীসহ আরো ছয় লাখ জনবল প্রয়োজন। সবমিলিয়ে ১৩ লাখ মানুষকে নির্বাচনের সময় কতটুকু নিরপেক্ষ রাখা যাবে? সংসদ সদস্যদের স্বপদে বহাল রেখে নির্বাচন করা কোনোভাবে সম্ভব না। আর যদি করা হয় তা বিতর্কিত হবে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, দলীয় সরকারের চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা সহজ।
এবিএম মূসা বলেন, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অতীতে যে কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো তা-ও মেনে নেয়নি। বর্তমান সরকার বলছে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে তা কীভাবে সম্ভব? বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে হাত-পা ধরে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছিল, অথচ যারা নির্বাচনে হেরে গেল, তারা তাকে নিয়ে নানা সমালোচনা করে। একইভাবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও তাই করেছে। এই অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি এ বিষয়ে শক্তিশালী জনমত তৈরি করার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহবান জানান।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল যে ভাষায় কথা বলছে তা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। বিশেষ করে, সরকার যে ভাষায় কথা বলছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, আগামীতে সম্পূর্ণ পাতানো নির্বাচনের পাঁয়তারা চলছে। তিনি বলেন, আগামীতে কার অধীনে নির্বাচন হলো, কে প্রধান উপদেষ্টা হলেন তা মুখ্য বিষয় নয়। বরং যাকে দিয়ে দেশের স্বার্থ হাসিল হবে জনগণ তাকে ভোট দিতে চায়। সেই ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া সরকারকেই করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়া বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখানো হয়েছে, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সম্ভব না। পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার মতো পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ করে কেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এই পদ্ধতি বাতিল করা হলো তা নিয়ে সর্বমহলে প্রশ্ন উঠছে।
সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি প্রবন্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প একটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত সব বিচারপতি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা, যার সভাপতি হবেন সবার আগে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। এই কমিটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন প্রধান উপদেষ্টা ও ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য ১৫ সদস্যের একটি প্যানেল তৈরি করবেন। যে প্যানেল থেকে প্রধান উপদেষ্টা ও বাকি উপদেষ্টাদের নিয়োগ করা হবে। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো একটি চুক্তি স্বাক্ষর করবেন যাতে আগামী দু'মেয়াদের পর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার লক্ষ্যে ক্ষমতায় গিয়ে কী কী সংস্কার করবে তা লিপিবদ্ধ থাকবে। সুজনের এই প্রস্তাবের আরেকটি প্রস্তাব যোগ করেন মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, বিচারপতিদের প্যানেলের সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন রাজনৈতিক দলগুলো প্যানেলে থাকতে পারেন।

