|
|
অর্থনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া
স্টাফ রিপোর্টার : হলমার্কের চার হাজার কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় এ টাকা কিছুই না অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন দেশের বিশিষ্টজন ও সাধারণ নাগরিকরা। তারা বলেছেন, অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্যে ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করবে। এদিকে অর্থমন্ত্রী এখনো তার বক্তব্যের পক্ষে অনড় রয়েছেন। তবে তিনি হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের দুষ্টুলোক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের বড় একটি স্ক্যান্ডালের পক্ষে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোকেরা কথা বলায় অপরাধীরা উৎসাহিত হবে। তার এ বক্তব্য ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, এভাবে দুর্নীতিবাজদের রক্ষা না করে কিভাবে দুর্নীতি বন্ধ করা যায় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের ৬৩ বছরের ইতিহাসে এত বড় অর্থ কেলেঙ্কারি আর হয়নি।
এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু অংশ সমর্থন করলেও তিনি নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ ঘটনাকে খাটো করে দেখা উচিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ঘটনা দেশের অকল্যাণ ডেকে আনবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জড়িতদের অবশ্যই বিচার করতে হবে।
এ ব্যাপারে সাধারণ জনগণের মধ্যেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেছেন, এটা অর্থমন্ত্রীর বলা উচিত হয়নি। আরেকজন বলেন, এটা দেশের ক্ষতি করবে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গতকাল বুধবার আবারো বলেছেন যারা এ ঘটনায় জড়িত, তারা দুষ্টুলোক। তাদের শাস্তি দিতে হবে। চার হাজার কোটি টাকা কিছুই না আগের দিন এ কথা বলার পর অর্থমন্ত্রী ফের বলেছেন ‘আমি আবারো বলছি চার হাজার টাকা কিছুই নয়'। আমি গত বছর ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। চার হাজার কোটি টাকা কতো? মাত্র ওয়ান পারসেন্ট। এ সময় সাংবাদিকরা ভুল ধরিয়ে দিলে অর্থমন্ত্রী তখন বলেন, টেন পারসেন্ট। অনিয়মের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে সরিয়ে ফেলা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা শিগগিরই আদায় হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ের সামনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, টাকাটা কী করে আদায় করা যায়, সেটাই আমাদের আসল লক্ষ্য। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকায় বাকি টাকা আদায়ের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না বলেও অর্থমন্ত্রী বলেন, তোমাদের পাবলিসিটি একটু কম হলে বোধহয় টাকাটা আদায় হয়ে যেত পুরোটাই। কিন্তু এখন জানি না। বাকিটা নিয়ে তোমাদের চিৎকারে অসুবিধা হচ্ছে। চিৎকার না করলে ভালো করে ডান্ডা দেয়া যেত। চিৎকার হলে তারা বলে, আমরা কোর্টে যাব। কোর্টে গেলে কবে আদায় হবে আল্লাহই জানে।
হলমার্কের জিএমকে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ
ঋণের অর্থ ফেরত দেয়ার চিঠি পেয়েছেন স্বীকার করে হলমার্ক গ্রুপের মহা ব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমেদ জানিয়েছেন ঋণের অর্থ ফেরত নিজেরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে । গতকাল বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তুষার বলেন, সোনালী ব্যাংক থেকে আমরা গতকাল চিঠি পেয়েছি। এ বিষয়ে মিটিংয়ে আলোচনা হবে। তারপর আমরা পদক্ষেপ নেব। আগেরদিন ১৫ দিনের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধের তাগিদ দিয়ে মঙ্গলবার হলমার্ক গ্রুপকে চিঠি দিয়েছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গত ২ সেপ্টেম্বর তুষার আহমেদ হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামের সঙ্গে দুদকে আসেন। ওইদিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
এক প্রশ্নের উত্তরে তুষার দাবি করেন, সম্পূর্ণ ‘নিয়মতান্ত্রিকভাবে' তারা সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। আমরা কোনো অনিয়মের সাথে যুক্ত নই। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কোনো প্রভাব কাজ করেনি।
সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার সময় নিজেদের যে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা হলমার্ক গ্রুপ দিয়েছিল, দুদকের তদন্তে তার অধিকাংশই ‘অস্তিত্বহীন' প্রমাণিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে হলমার্ক গ্রুপের জিএম বলেন, আমাদের কোনো ‘অস্তিত্বহীন' প্রতিষ্ঠান নেই। আমাদের মোট ৩৪টি প্রতিষ্ঠান রানিং অবস্থায় রয়েছে এবং এগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। বাকিগুলো নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে। ২০১৩ সালের মধ্যেই সবগুলো চালু হবে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সরেজমিনে আসুন, দেখুন এগুলো ভুয়া কী না।
হলমার্ক গ্রুপের নামে ১০ একর সরকারি জমি দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তুষার বলেন, আমরা কোনো জমি দখল করিনি। যে জমির কথা বলা হচ্ছে, তা আমাদের কোম্পানির সীমানার ভেতরেই রয়েছে।
হলমার্ক গ্রুপের এই অর্থ কারসাজির ঘটনায় দুদকের তদন্ত দল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩২ জনের যে তালিকা করেছে তার মধ্যে বুধবার পর্যন্ত ৩১ জনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব ভট্টাচার্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, দেশের ৬৩ বছরের ইতিহাসে এত বড় অর্থ কেলেঙ্কারি আর ব্যাংকিং খাতে হয়নি। অথচ অর্থমন্ত্রী এটিকে তেমন বড় দুর্নীতি মনে করছেন না। এটি জাতির জন্য দুঃখজনক। তিনি দেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য জাতিকে হতাশ করেছে। দেশের সম্পদ যত টাকাই হউক না কেন তাকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। সরকারের এ ধরনের বক্তব্যে ঋণ খেলাপিদের আরো উস্কে দিবে। তাছাড়া দেশের সম্পদের সুরক্ষা থাকে না। সরকারকে আরো দায়িত্বশীল বক্তব্য দিতে হবে।

