|
|
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সরকারের তাড়াহুড়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন
0বিচার চলাকালীন আইন সংশোধন সংবিধান সম্মত নয় - খন্দকার মাহবুব হোসেন
0 সরকার ইচ্ছামতো বিচার পরিচালনা করতে চায় বলেই আপিলের মেয়াদ কমিয়েছে -জয়নুল আবেদীন
সামছুল আরেফীন, নাজমুল আহসান রাজু : মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সরকারের তাড়াহুড়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার শেষে রায়ের ব্যাপারে আপিলের সময়সূচি ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিন করার ফলে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কী রায় আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে? রায় সরকারের পক্ষে যাবে বলেই কী তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের আয়োজন করছে তারা? সরকারপক্ষের সাক্ষী বা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করার সময়ও নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে। এমনকি ডিফেন্সপক্ষের সাক্ষীর সংখ্যাও তাদের চাহিদা অনুযায়ী করতে দেয়া হয়নি, সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বিচার চলাকালে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হচ্ছে না বলে বার বার বলে আসছেন ডিফেন্সপক্ষ। সরকারি দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে বিচার তাড়াতাড়ি করে দেয়ার জন্য সময়ক্ষণও নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ডিফেন্সপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, হাত পা বেঁধে আসামীকে জবাই করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের পথ কবরস্থ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রায় সরকারের পক্ষে যাবে বলেই তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আপিলের সময় কমানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময় বেঁধে দেয়া হচ্ছে। আইনজ্ঞগণ বলেছেন, বিচার চলাকালীন যে আইনে বিচার হচ্ছে সে আইন সংশোধন বা পরিবর্তন করা সংবিধান সম্মত নয়।
আপিলের সময় অর্ধেক কমলো :
গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিসভা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের আইনের দুটি সংশোধনীতে অনুমোদন দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে রায়ের পর আপিলের সময়সীমা বর্তমান ৬০ দিনের পরিবর্তে ৩০ দিনে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে যা চলতি সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) দ্বিতীয় সংশোধনী আইন-২০১২-এর খসড়ায় অনুমোদন দেয়া হয়।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, আইন মন্ত্রণালয়ের বিচার ও সংসদ বিষয়ক শাখা উত্থাপিত এই খসড়ায় মূলত দুটি সংশোধনী আনা হয়েছে। এতে বিচারের আপিলের সময়সীমা বর্তমান ৬০ দিনের পরিবর্তে ৩০ দিনে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী আসামীপক্ষের আইনজীবী রায় ঘোষণার দিনই বিনামূল্যে মামলার রায়ের কপি পাবেন এবং নতুন করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মামলায় আপিল করতে পারেন।
ডিফেন্সপক্ষের সাক্ষী নির্ধারণ করে দেয়া :
সরকারপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিপক্ষে ৪৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য রেকর্ড করালেও আসামীপক্ষের সাক্ষ্য প্রদানের জন্য মাত্র ২০ জন নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। গত ১৪ আগস্ট সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছেন, এই আদেশের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের সমস্ত পথ তিরোহিত করা হলো। তিনি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলেন, এই আদেশ হাত-পা বেঁধে গরু জবাই করে দেয়ার মতো। জোর করে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হলো। তিনি এই আদেশ পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ২০ জন সাক্ষী আনতে বলার অর্থ এখানে আমাদের আসার দরকার নেই। সাক্ষীর সংখ্যা লিমিট করে দেয়ার অধিকার ট্রাইব্যুনালের নেই। আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ২০টি। তা প্রমাণ করার জন্য তারা ২৮ জন সাক্ষী হাজির করেছে। আরও ১৬ জনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তার লিখিত জবানবন্দী আদালত গ্রহণ করেছে। সব মিলিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য তাদের সাক্ষী ৪৪ জন। আর আমার অভিযোগ খন্ডনের জন্য ২০ জন সাক্ষী আনতে পারব। এটা কোন ধরনের বিচার। ২০টি অভিযোগের একেকটির মধ্যেই অনেকগুলো অভিযোগ রয়েছে যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মত অভিযোগ রয়েছে। এতে আসামীর ফাঁসি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ২০ জন সাক্ষী হাজির করার আদেশ দেয়া খারাপ নজির স্থাপিত হবে বলে উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম। তিনি এই আদেশ না দেয়ার অনুরোধ করে বলেন, আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামীপক্ষ যতজন সাক্ষী প্রয়োজন ততজন হাজির করতে পারবে এটাই আইনে আছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সাক্ষী কমিয়ে তাড়াহুড়া করে ন্যায়বিচারকে কবরস্থ করবেন না।
সাফাই সাক্ষীর জন্য প্রস্তুতিমূলক সময় দেয়া হয়নি :
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষী দেয়ার প্রস্তুতিমূলক সময়ের আবেদনসহ দু'টি আবেদনই সরাসরি খারিজ হয়ে যায়। গত ২৩ আগস্ট সাফাই সাক্ষীর প্রস্তুতির জন্য ৬ সপ্তাহের সময় প্রার্থনাসহ ২টি করে আবেদন করা হয়েছিল।
তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার সময় নির্ধারণ :
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের জেরা ৮ আগস্টের মধ্যে শেষ করার জন্য ২ আগস্ট নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ইতিপূর্বে ২ আগস্ট বৃহস্পতিবারের মধ্যে তার জেরা শেষ করার জন্য যে কথা ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, সেই অনুযায়ী অতি দ্রুততার সাথে জেরা করার পরও দিন শেষে দেখা যায় যে, উল্লেখযোগ্য অংশই বাকি রয়েছে। এডভোকেট মিজানুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কোনো খারাপ নজীর স্থাপন করবেন না।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকও সময় বেঁধে না দেয়ার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করলে আদালত তাও গ্রহণ করেননি। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ করার বিষয়টি মিজানুল ইসলামের ওপর ছেড়ে দিলে দায়িত্বটা তারই বেড়ে যাবে। কিন্তু কোনো যুক্তিই না মেনে ৮ আগস্টের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, এতে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। আমরা অবিচারের শিকার হতে পারি। তবে আদালত তার আদেশের বাইরে মৌখিকভাবে বলেছেন, আমরা যদি দেখি যে, এই সময়ের পরেও জরুরি কোনো বিষয় বাদ আছে তখন দেখা যাবে।
আপিলের সুযোগ বাদ দিতে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের দাবি :
গত ২৮ জুলাই সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে আসামীপক্ষের সাক্ষী কমানো ও আপিলের সুযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। রাজধানীর শাহীন স্কুল ও কলেজের শাহীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলে পরিকল্পনা মন্ত্রী ও ফোরামের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) এ কে খন্দকার বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে রাজাকাররা কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। বিচার বিলম্বিত করার লক্ষ্যে এখন হাজার হাজার সাক্ষী হাজির করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব সাক্ষীর সাক্ষী নিতে হলে বিচার বিলম্বিত হবে। সে কারণে সাক্ষীর সংখ্যা সীমিত করতে হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পার্লামেন্টে যেমন সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেয়ার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়। ঠিক যুদ্ধাপরাধ বিচারের সাক্ষীদের সংখ্যার ক্ষেত্রেও সীমিত সংখ্যা বেঁধে দিতে হবে। আদালত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি আরো বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিশ্বের কোথাও আপিল করার সুযোগ দেয়া হয়নি। আপিল হলে, বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে অনেক সময় প্রয়োজন হবে। তাই আপিলের সুযোগ প্রত্যাহার করতে হবে। ইফতার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শামসুল হক টুকু, ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু প্রমুখ।
বিচার চলাকালীন আইন সংশোধন সংবিধান সম্মত নয় :
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে বলেছেন, মামলার বিচার চলাকালীন যে আইনে বিচার হচ্ছে সে আইন সংশোধন বা পরিবর্তন করা সংবিধান সম্মত নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এমনিতে অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার সমর্থন করে না। সেখানে নতুন করে আপিলের সময় ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিন করা হলে অভিযুক্তদের আরেকটি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা দুঃখজনক। ফলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিবে যে, সরকার তাড়াহুড়ো করে বিচার শেষ করতে চাইছে। আমরা চাই না জনমনে এ ধরনের প্রশ্ন দেখা দিক।
সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, আপিলের সময়সীমা কমিয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এতে প্রমাণ হয়, সরকার বিচার বিভাগকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করছে। সংসদে স্যংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহী হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে জনগণ এমন কাজ আশা করে না। তিনি বলেন, আগে আপিলের মেয়াদ ছিলো ৬০ দিন। মনে হচ্ছে, সরকার তাদের ইচ্ছামতো বিচার পরিচালনা করতে চায় বলেই আপিলের মেয়াদ ৩০ দিন করেছে। দেশের মানুষও প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। কিন্তু বিচার আইনের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে জনমনে প্রশ্ন ওঠতো না।

