|
|
শেষ সময়ের প্রয়াস বুমেরাং হয়েছে
শাহেদ মতিউর রহমান : শুধু জনগণ নয়, নিজ দল আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটেরও আস্থা হারিয়ে সরকার ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নিজ দলের প্রভাবশালী নেতা সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং মহাজোটের অন্যতম শরীক দলের নেতা রাশেদ খান মেনন মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েও সাড়া না দেয়ায় সরকারের ভেতরের এই দুর্বলতা জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এর নানামুখী ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে চতুর্মুখী সংকটে সরকার দিশেহারা হয়ে পড়েছে। প্রকৃত অর্থেই যে মহাজোট সরকার এখন ভেতরে বাইরে দুর্বল এটা দেশবাসীর কাছে শতভাগ নিশ্চিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সম্প্রতি দেশের সবক'টি শিক্ষাঙ্গনে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের সৃষ্ট অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের অর্থ লুটপাটের সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকদের জড়িত থাকার অভিযোগ, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে সরকারের বক্তব্য এবং কর্মকান্ডে দেশে বিদেশে ভাবমর্যাদা হ্রাস পাওয়া এবং আরও অনেক ইস্যুতেই সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। সর্বশেষ হলমার্কের অর্থ লুটের সাথে সরকার শুধু নয়, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অনেকের নামও প্রকাশ পেতে শুরু করে। আর এসব বিষয় ধামাচাপা দিতেই মূলত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে একদিকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফেরানোর চেষ্টা করে অন্যদিকে সরকার নিজেও আরও শক্তিশালী হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ এবং রাশেদ খান মেনন সরকারের আহবানে সাড়া না দেয়ায় সরকারের সেই উদ্যোগের শুরুর কাজটিই বুমেরাং হয়েছে।
দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য শুরু থেকেই বলতেছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও তোফায়েল আহমেদ এবং রাশেদ খান মেনন সেখানে না যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সরকার ভেতরে ভেতরে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। একদিকে দলের এক প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ সরকারের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হচ্ছে তিনি সরকারের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে মহাজোটের অন্যতম শরীক রাশেদ খান মেনন সরকারে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হচ্ছে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এখন ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে।
এদিকে দেশের জনগণের মধ্যেও সরকারের নানা কর্মকান্ড নিয়ে শুরু থেকেই ক্ষোভ আর
অসন্তোষের দানা বাঁধছে। বিশেষ করে মহাজোট সরকারের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ছয়বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর রেকর্ড যেন সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। কোন বাড়িতে যেখানে আগে বিদ্যুৎ বিল আসতো ৬শ থেকে ৭শ' টাকা সেখানে এখন বিদ্যুৎ বিল আসছে ৪ হাজার টাকা বা তার অনেক বেশি। এভাবেই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী আর শিল্পপতি সবাই এখন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে একট্টা। কিন্তু প্রতিবাদের কোন উপায় নেই, ভাষা নেই। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন আর কোন কথাই বলছে না। তারা যেন প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন।
সরকারের অব্যাহত জনবিরোধী কর্মকান্ড আর দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আগামী নবেম্বর থেকেই জোর আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ১৮ দল। এরই অংশ হিসেবে জেলায় জেলায় সফর করে নেতা-কর্মী এবং জনগণকে চাঙ্গা করার কর্মসূচিও নেয়া হয়েছে ১৮ দলের পক্ষ থেকে। আর বিরোধীদলের এমন সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিতে দিশেহারা হয়েই সরকার অনেক সাইট ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসছে। জনগণের দৃষ্টিকে সরকার ভিন্ন দিকে ফেরানোর জন্য যারপর নাই অপচেষ্টা করে যাচ্ছে না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সব কিছুতেই সরকার একের পর এক ব্যর্থতার পাল্লা ভারি করে বিরোধীদলের প্রতি আরও জুলুম-নির্যাতন বাড়িয়ে দেয়ার পথেই পা বাড়াচ্ছে ।
মন্ত্রী হওয়ার সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরের দিন রাশেদ খান মেনন ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটিতে আয়োজিত মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে খোলামেলাভাবেই আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বলেছেন, সরকারের এই প্রস্তাব আমাদের সাথে কোন আলোচনা করে দেয়া হয়নি। এছাড়া মহাজোটের শরীক হিসেবে সরকারের পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের সাথে আমার (রাশেদ খান মেনন) অংশগ্রহণ থাকার কথা । কিন্তু আওয়ামী লীগ এগুলোর কোনটিই করছে না। এমনকি আমাকে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হবে একথাটি প্রধানমন্ত্রী নিজে আমাকে কখনো বলেননি।
এবিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যখন দলের কাউকে মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং সেই আমন্ত্রণ যখন প্রত্যাখ্যান হয় তখন ধরে নিতে হবে সরকারের ভেতরে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে জোটের মধ্যেও যদি পারস্পরিক অনাস্থা আর দূরত্ব তৈরি হয় তখনি মূলত জোটের কোন নেতা সরকারের প্রস্তাবে সাড়া দেয় না। তবে আমাদের কাছে সরকারের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। তারা (সরকার) শেষ সময়ে তাদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্যই মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এখানেও সরকার তাদের সেই সফলতা দেখাতে পারলো না। সরকারের সবশেষের কাজটির শুরুতেই বুমেরাং হয়েছে।

