|
|
সীমান্তে শক্তি বাড়াচ্ছে ভারত
শহীদুল ইসলাম : ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং ভারতীয় নাগরিকদের হাতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা বেড়েই চলেছে। কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। ক্ষমতাসীন সরকার সীমান্তে বেসামরিক লোকদের নির্বিচারে হত্যাকান্ডের কোন শক্ত প্রতিবাদ না করায় হত্যাকান্ডের সংখ্যাও যেমন বাড়ছে তেমনি নৃশংসতাও বাড়ছে। এর পাশাপাশি সর্বশেষ উদ্বেগজনক খবর হলো এতো হত্যাকান্ডের পরও সীমান্তে ক্যাম্প বাড়ানোর জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে জমি চেয়েছে। ক্যাম্প বৃদ্ধির এই উদ্যোগে স্পষ্ট যে ভারত সীমান্ত হত্যাকান্ড বন্ধ তো করবেই না বরং আরো বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের টার্গেট করেই এই ক্যাম্প বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারের এ ব্যাপারে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে সরকারি মহলে কোন উদ্বেগও আছে বলে সরকারের কার্যকলাপে মনে হয় না। সীমান্তের জনগণ যেমন নিরাপত্তাহীন তেমনি যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে ক্রমেই। বাংলাদেশী পরিচয় বলেই হয়তো তাদের রক্তের কোন মূল্য নেই। নিরাপত্তা নেই সীমান্তবাসীদের।
গত বাজেট অধিবেশনে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নোত্তরে জানিয়েছিলেন যে বিগত সাড়ে ৩ বছরে ১৭৬ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফের হাতে জীবন দিতে হয়েছে। সরকারি হিসেবে মন্ত্রী এই সংখ্যা জানালেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আড়াই শ'রও বেশি। সম্প্রতি আইন ও শালিস কেন্দ্র জানিয়েছে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৮ মাসে ২৬ জন বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছে। চলতি মাসেও এই হত্যাকান্ড ও নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শনিবারের পত্রিকাতেও রয়েছে বেনাপোল সীমান্তে নৃশংসভাবে বিএসএফ পিটিয়ে এক বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে। বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তে বৃহস্পতিবার রাতে আলমগীর নামে ঐ গরু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করে বিএসএফ। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর পুটখালী ক্যাম্পের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ঐ খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতে আলমগীরসহ ১৫/২০ জন গরু ব্যবসায়ীর একটি দল ভারত থেকে গরু নিয়ে ফেরার পথে বিএসএফ তাদের ধাওয়া করে। অন্য সবাই পালিয়ে আসতে পারলেও আলমগীরকে ধরে ফেলে বিএসএফ, পরে রাত ৩টার দিকে ডুমোর বাওড়ে আলমগীরের লাশ পাওয়া যায়। তার ২ দিন আগে লালমনিরহাট সীমান্তে আরো একজন বাংলাদেশী নাগরিককে বিএসএফ গুলী করে হত্যা করেছে। এভাবে হত্যাকান্ড চলতে থাকলেও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কোন প্রতিবাদ নেই। বিগত সাড়ে ৩ বছরে শুধুমাত্র ফেলানী হত্যার পর জনমতের চাপে পড়ে ভারতীয় হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। বিগত সাড়ে ৩ বছরে সরকারের পক্ষ থেকে এই একটি বাদে আর কোন প্রতিবাদ হয়নি। ফলে বিএসএফ এবং ভারতীয় নাগরিকরা অবাধে হত্যাকান্ড চালিয়েই যাচ্ছে। তাদের হত্যাকান্ড ও নৃশংসতার কৌশল প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন নতুন কৌশলে হত্যা করা হচ্ছে বাংলাদেশী নাগরিকদের।
সীমান্তে যখন অহরহ বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই অবস্থার মধ্যে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের আউট পোস্ট বা সীমান্ত ক্যাম্প বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সাথে বৈঠক করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ। বৈঠক শেষে জিতেন্দ্র সিংহ সাংবাদিকদের বলেছেন, নতুন সীমান্ত চৌকির জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জমি চেয়েছি, রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের একজন মুখপাত্র বলেন, উত্তর চবিবশ পরগনা, মালদ, দুই দিনাজপুর ও মুর্শিদাবাদে জমির সমস্যা রয়েছে। তবে পুরো সীমান্তের ৪১টি থানার পতিত জমি খুঁজে সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের দফতরে রিপোর্ট করে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এ ব্যাপারে ৪১টি সীমান্তবর্তী থানাকে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাও দেবে বলে জানিয়েছেন জিতেন্দ্র সিংহ।
আনন্দবাজার পত্রিকার এই খবর স্পষ্ট করেছে যে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে আউট পোস্ট বা বিএসএফের ক্যাম্প ব্যাপক হারে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ৪১টি থানাকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার একমত হয়েই এই পদক্ষেপ নিয়েছে সেটাও স্পষ্ট। তবে কতটি ক্যাম্প বাড়ানো হবে তা রিপোর্টে বলা হয়নি। হয়তো এটা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় বিষয় তাই সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়নি। এই রিপোর্টে আরও স্পষ্ট যে বাংলাদেশী নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করেও ভারতীয় সরকারের তৃপ্তি মিটছে না। এখন ক্যাম্প সংখ্যা বাড়ানোর টার্গেট তাও স্পষ্ট। বাংলাদেশীরাই তাদের টার্গেট। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হওয়ার পর তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে সীমান্তে। এমনিতেই সীমান্তে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ডের একটি বিওপি'র (বর্ডার আউট পোস্ট) বিপরীতে বিএসএফের রয়েছে কমপক্ষে ৩টি এবং ক্ষেত্র বিশেষে ৫টি। আবার প্রতিটি বিওপিতে বিজিবির সংখ্যা যা তার থেকে আড়াই থেকে ৩ গুণ সংখ্যা বিএসএফের। সব মিলিয়ে দেখা যায় বর্তমানে ১ জন বিজিপি সদস্যকে ৭ থেকে ১০ জন বিএসএফের বিপরীতে কাজ করতে হচ্ছে। ভারতের আউট পোস্টের সংখ্যা বাড়ানো হলে এই সমীকরণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখন পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। ভারত যেন সীমান্তে বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। সে জন্যই তাদের সংখ্যা ও অবস্থান বিজিবির থেকে ৭-১০ গুণ বেশি থাকা সত্ত্বেও আরও বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থান কি সে সম্পর্কে কোন উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে যেন কোন মাথা ব্যথাই নেই। বিজিপির দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে তেমন কোন ভাষ্য নেই। ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের পর পুরো সীমান্তের অবস্থাই নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বিজিবি রাখা হয়েছে। বিজিবি পুনর্গঠনের একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তবে তা ভারতের বিএসএফের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নয় বরং সেটা হলো শুধুই সীমান্ত রক্ষার এই বাহিনীকে পুনর্গঠনের জন্য। ঐ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বিজিবিকে হেড কোয়ার্টারের অধীনে ৪টি রিজিওনে বিভক্ত করা। বর্তমানে বিডিআরের হেড কোয়ার্টারের সরাসরি কমান্ডে রয়েছে কয়েকটি সেক্টর। নয়া পরিকল্পনার অধীনে সেক্টরগুলো চলে যাবে রিজিওনের অধীনে। প্রতিটি রিজিওনের দায়িত্বে থাকবেন একজন করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। বিএসএফের ফ্রন্টিয়ার আইজির সমপদমর্যায় উন্নীত করা এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে বিজিবির নির্ভরযোগ্য সূত্র। সেক্টরগুলো তখন রিজিওনের অধীন চলে যাবে। আর ব্যাটালিয়নগুলো যথারীতি সেক্টরের অধীনে থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবচেয়ে অরক্ষিত পার্বত্য অঞ্চলে ৫০ থেকে ৬০টি বিওপি বৃদ্ধি করার কাজ বর্তমানে চলছে। এছাড়াও সমতল এলাকার বিশাল সীমান্তে আরও ৯০ থেকে ১০০টি বিওপি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সীমান্তে জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে বলে ঐ সূত্র নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে বিজিপির ৪৬টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় আরো ১২/১৩টি ব্যাটালিয়ন বৃদ্ধি করা হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে অত্যন্ত ঢিমে তালে। এটা কবে শেষ হবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ঐ সূত্র।

