|
|
তত্তবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পুর্নাঙ্গ রায়
ফখরুদ্দিন ও মঈনউদ্দিনের সরকারের শাসনকে মার্জনা
নাজমুল আহসান রাজু : তত্তবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পুর্নাঙ্গ রায়ে এ ব্যবস্থাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষনা করা হয়েছে। রায়ে আগামী দশম ও একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে আপিল বিভাগ। অবৈধ ও অসাংবিধানিক হলেও জাতীয় সংসদ তার বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত অনুসারে এ দু’টি নির্বাচনে প্রয়োজনমতো নতুনভাবে ও আঙ্গিকে তত্বাবধায়ক সরকার গঠণের ব্যবস্থা করতে পারবে সংসদ। কোনোভাইে অনির্বাচিতদের হাতে শাসনভার দেয়া যাবেনা। রায়ের অন্যতম দিক হলো ২০০৭ সালে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসা জরুরি অবস্থার ফখরুদ্দিন ও মঈনউদ্দিনের তত্ত্বাধায়ক সরকারের ৯০ দিনের অতিরিক্ত দু’ বছরের শাসনকালকে মার্জনা করেছেন আপিল বিভাগ। মোট ২০টি সারমর্ম রয়েছে এতে। এ আপিলের শুনানিতে দেশের জ্যেষ্ঠ ১০ জন আইনজীবীকে আইনী ব্যাখ্য দিয়ে আদালতকে সহায়তার জন্য নিয়োগ দেন। এমিকাস কিউরিদের মধ্যে বিচারপতি টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। তবে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ড. এম জহির তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলেন, একমাত্র এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দেন।
এমিকাস কিউরিদের মতামত সর্ম্পকে রায়ে বলা হয়েছে এমিকাস কিউরিগণ তাঁদেও সুগভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও দেশের প্রতি প্রশ্নাতীত দায়িত্ববোধের কারণে তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এই আশঙ্কা আমরা (আদালত) একেবারে অবহেলা করতে পারিনা। যদিও তত্তবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পুর্নাঙ্গ রায়ে এ ব্যবস্থাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষনা করা হয়েছে তবুও আগামী দশম ও একাদশতম জাতীয় নির্বাচন এ ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্ত ও বিবেচনার ভার জাতীয় সংসদের। গতকাল রোববার রাত দশটায় রায় ঘোষনার ১৬ মাস পর পুর্নাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন সাত বিচারপতি।
রায়ের পর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সাংবাদিকদেও বলেন, এ মাত্র ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে রায়ে স্বাক্ষর করেছি। পরিবর্তনের কারণে দেরি হয়ে গেল। ঐতিহ্য হচ্ছে রায় নিয়ে কথা না বলা। সহকর্মীরা সুন্দও রায় দিয়েছেন। গোটা রায়টা সুন্দর হয়েছে। যারা একমত হয়েছে তাদের মতও গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুবই সুখী। আমরা চার বিচারপতি বাতিলের পক্ষে। দু’ জন তত্ত্বাধায়ক রাখার পক্ষে এবং একজন আলাদা মত দিয়েছে। রায় লিখতে ১৬ মাস কেন দেরী হলো এর জবাবে ষোল মাস আসলে লাগেনি। আমার হাতে থাকা ৩০ টা রায় লেখা শেষ করে অক্টোবরে এ মামলার রায় লেখা শুরু করেছি। এরপর শেষ করলাম মার্চে। তাই সময়টা বেশী নয়।
১৬ মাস পর স্বাÿর করেছেন সাত বিচারপতি। গতকাল রোববার দুপুরে সাত বিচারপতি বৈঠক করে রায়ে স্বাÿর করার সিদ্ধামত্ম নেন। এরপর রায়ে ঘষামাজা, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন শেষে রাত ১০ টায় সাত বিচারপতি পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাÿর করেন। সাক্ষর শেষে বিচারপতিরা আদালত প্রাঙ্গন ছেড়ে যান। বর্তমান প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রম্নল হক, বিচারপতি সুন্দ্রে কুমার সিনহা (এসকে সিনহা), বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মো. ইমান আলী রায়ে স্বাÿর করেন। বাংলা ও ইংরেজিতে মিলিয়ে এ রায় লেখা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রায় বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা হলো। এবিএম খায়রম্নল হক বাংলায় রায় লিখেছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি রায়ে স্বাক্ষর করেন। তাঁর লেখা রায়টি ৩৪২ পৃষ্ঠার। তার সঙ্গে একমত হয়েছেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এস কে সিনহা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।
রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পÿÿ মত দেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার লেখা মতের সঙ্গে একমত পোষন করে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা।
তবে বিচারপতি মো. ইমান আলী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পÿÿ বা বিপÿÿ মত না দিয়ে বিষয়টি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি একশ ৫০ পৃষ্ঠা রায় লিখেছেন।
অবসরের পর রায়ে স্বাক্ষর করা নিয়ে বিতর্ক
গত বৃহস্পতিবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। ওইদিন দুপুরে ৩৪২ পৃষ্ঠার রায়ে তিনি স্বাক্ষর করেন।
অবসরে চলে যাওয়ায় এবিএম খায়রুল হকের রায়ের স্বাক্ষর করা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেছেন, অবসরে যাওয়ায় তার রায়ের গ্রণযোগ্যতা থাকবে না। রায় ঘোষণার সাতদিন পর বিচারপতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অবসরে যান তিনি। বলা যায় অবসরের ১৬ মাস পর তিনি রায়ে সাক্ষর করেছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রবীণ আইনজীবী এ আপিলে সুপ্রিমকোর্ট নিযুক্ত এমিকাস কিউরি বিচারপতি টিএইচ খান বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ে এবিএম খায়রুল হকের স্বাক্ষর করার এখতিয়ার নেই। স্বাক্ষর করলে তা হবে অবৈধ। টিএইচ খান আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিদের এবিএম খায়রুল হকের সঙ্গে রায়ে স্বাক্ষর করা উচিত হবে না বলেও এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীনও টিএইচ খানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে দৈনিক সংগ্রামকে এরআগে বলেছেন, রায় ঘোষণার ১৬ মাস পর তাতে স্বাক্ষর করায় রায় গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার তথা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে রায় দেন ২০১১ সালের ১০ মে। রায়ে বলা হয় ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আগামী দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন হতে পারে। সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে আপিল মঞ্জুর করা হলো। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন, ১৯৯৬ (আইন-১ : ১৯৯৬) বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। আগামী দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে হতে পারে।
এ রায়ের একমাস ২০দিন পর ২০১১ সালের ৩০ জুন সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে মুছে ফেলে। সংবিধানে এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর নেই। সেখানে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সংবিধানে রয়েছে। সুশীল সমাজ বলেছেন দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট সারাদেশে তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে।
২০০০ সালে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোটেৃ রিট দায়ের করেন। ওইবছরের ২৫ জানুয়ারি হাইকোর্টেও ডিভিশন বেঞ্চ রুল নিশি জারি করেন।সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তথা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। এই রায়ের বিরুদ্ধে পরের বছরই আপিল করা হয়।
২০১১ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে এ আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। আপিল বিভাগ সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে আদালতকে সহায়তার জন্য দেশের জ্যেষ্ঠ ৯ জন আইনজীবীকে এমিকাস কিউরি নিয়োগ দেন। এমিকাস কিউরিদের মধ্যে বিচারপতি টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। তবে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ড. এম জহির তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলেন, একমাত্র এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দেন। ১০ দিন শুনানি শেষে ৬ এপ্রিল আদালত বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন। এরপর ১০ কয়েক মিনিটে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছয় এমিকাস কিউরির মতামতকে উপেক্ষা করে কার্যত একমাত্র এমিকাস কিউরির মতামত গৃহীত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

