|
|
মিল থাকাটা অশনি সংকেত -খন্দকার মাহবুব হোসেন
নাজমুল আহসান রাজু : তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ের সঙ্গে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ক্ষমতাসীন দলের ভাবনার ব্যাপক মিল রয়েছে। রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ রায়ে। সেখানে একরকম দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনকে আইনগত বৈধতা দিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, বর্তমান প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনসহ তত্ত্বাধায়ক বাতিলকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ চার বিচারপতি। তিনমাস আগে প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যাকে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার বলেছেন। এছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যুক্তি দেখাতে গিয়ে বরাবরই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকবে না। এজন্য বরাবরই তারা নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলেছেন। সরকারের এ যুক্তির পক্ষেও পূর্ণাঙ্গ রায়ে মিল রয়েছে। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা অন্তর্বর্তী সরকারকে দলীয় সরকার হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেড় বছর আগে গত বছরের ৩০ জুন করা পঞ্চদশ সংশোধনীতে দলীয় সরকারের তথা ক্ষমতাসীনদের অধীনেই নির্বাচনের ব্যবস্থা যুক্ত করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সারা দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের পরপর দুবার নির্বাচিত সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার মিল পাওয়া যাচ্ছে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। বিরোধী দল ইচ্ছা করলে এই মন্ত্রিসভায় আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার সঙ্গে রায়ের মিল থাকাটা অশনি সংকেত। আমরা অতীতে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দল যা চায় আদালতের রায়ে তার প্রতিফলন ঘটে। এখন তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে আদালতের দেয়া রায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মিল থাকায় জাতি হিসেবে আমরা কি ইঙ্গিত পাচ্ছি সেটাও ভাবনার বিষয়।
গত রোববার প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের ১৬টি সারমর্মের মধ্যে ১২ নম্বরে দলীয় সরকারের প্রতি আদালতের স্পষ্ট সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার ক্ষেত্রে, জাতীয় সংসদের বিবেচনা (Discretion) অনুসারে, যুক্তিসংগত কাল (reasonable period) পূর্বে, যথার্থ ৪২ দিন পূর্বে, সংসদ ভাঙ্গিয়া দেয়া বাঞ্ছনীয় হইবে তবে, নির্বাচন-পরবর্তী নতুন মন্ত্রিসভা কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভা সংক্ষিপ্ত আকার গ্রহণ করত উক্ত সময়ের জন্য রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ও সাধারণ কার্যক্রম পরিচালনা করিবে। অপরদিকে নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে রায়ের ১৪ নম্বর সারমর্মে বলা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ হতে নির্বাচনের ফল ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত নির্বাচনের সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং নির্বাচন কমিশনের বিবেচনা অনুসারে এমনকি পরোক্ষভাবে জড়িত, রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকিবে অন্যদিকে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদ প্রতিষ্ঠার বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের (৩ক) দফায় বলা হয়েছে ‘সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদে এই অনুচ্ছেদের ২ দফায় বর্ণিত প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত তিনশত সদস্য এবং (৩) দফায় বর্ণিত পঞ্চাশ মহিলা-সদস্য লইয়া সংসদ গঠিত হইবে। অর্থাৎ বর্তমান যে সংসদ রয়েছে, সেই সংসদেরই অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে বর্তমান সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের (৫৮ক) অনুচ্ছেদ ও (২ক) পরিচ্ছেদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকে আর নেই। আর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান বাতিল করে বিদ্যমান সংসদের অধীনে সংসদ নির্বাচনের বিধান করা হয়েছে।
গত ৩০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে। নির্বাচনের সময় যে অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা হবে তাতে বিএনপিও যোগ দিতে পারে। ওইদিন বিবিসির হার্ডটক অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিরোধী দল যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা আমরা দিতে পারি। সবাই মিলে আমরা (নির্বাচন) করতে পারি। তখন একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব প্রসঙ্গে গত আগস্ট মাসে দৈনিক সংগ্রাম দেশের আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছিল।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ওই সময় দৈনিক সংগ্রামকে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যে অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলেছিলেন সেটা দলীয় সরকারই। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতায় থাকবেন, তার নেতৃত্বে পরিচালিত সংসদ বাতিল না করে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন করা প্রহসনের সমতুল্য। কেননা প্রধানমন্ত্রী যদি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন এবং সংসদ যদি বাতিল না হয় সেক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকেন তাদের সঙ্গে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের প্রতিদ্বনিদ্বতা সুষ্ঠু হবে না। কারণ নিজ পদে বহাল থেকে সংসদ সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করবেন। এ ধরনের বিধান পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নেই। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে কীভাবে নির্বাচন হবে তা বোধগম্য নয়।
সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছিলেন, দলীয় সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন এতে কার্যত আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তী সরকারে থাকবে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো অবস্থাতেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না।

