|
|
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সেমিনার
গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বক্তব্য পেশ করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান-সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। দুর্নীতির কারণে জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঢালাও দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সুফল জনগণ পাচ্ছে না। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাগজ-কলমে, মৌখিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত হয়নি।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর পাঁচতারা হোটেল সোনারগাঁওয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার' শীর্ষক সেমিনারে সূচনা বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সেমিনারটি কমিশনের ‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) প্রিপারেশন ফর দ্য সেকেন্ড সাইকেল রিভিউ ফেসিলেটেড বাই দ্য হিউম্যান রাইট কাউন্সিল' শীর্ষক দু'দিনব্যাপী জাতীয় সেমিনারের শেষ দিনে পঞ্চম অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। ড. মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক ছিলেন বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এডভোকেট সুলতানা কামাল, সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য অ্যারোমা দত্ত এবং থাইল্যান্ডভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফোরাম এশিয়ার কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাঈদ আহমেদ।
সূচনা বক্তব্যে ড. মিজান আরো বলেন, মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য যা কিছু সেগুলোই মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশে তার ঘাটতি রয়েছে। সংবিধানেও সেগুলোকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের মতোই রাজনৈতিক অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যেকোনো নাগরিকের মান-মর্যাদা, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না।
প্যানেল আলোচনায় এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দায়-দায়িত্ব নেবার প্রতি উদাসীনতার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কোনো ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। কে আইন বানাচ্ছে আর কে তৈরি করছে, বোঝা যাচ্ছে না। সরকার দায়-দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তিনি বলেন, মানবাধিকার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। মানবাধিকার হলো স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার ও শান্তি। সেখানে ভয় বা শঙ্কা থাকবে না। বাংলাদেশ স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার ও শান্তি সব দিক থেকে অসম দেশে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকারের প্রধান শর্ত আইনের শাসন। বর্তমানে আইনের শাসন না থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রীদের ব্যাপারে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে অনেকের বোধের অভাব রয়েছে। গাড়িতে পতাকা তুলে পুলিশ পাহারায় ঘুরে বেড়ালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মানুষের জন্য কাজ করার জন্যই তাদের মন্ত্রী করা হয়েছে। যার যার দায়িত্ব বুঝে কাজ করতে হবে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বলেন, এখন কোনো বিচারের ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনো কোনো মন্ত্রী বলেন, কালই বিচার হয়ে যাবে। যদিও সেটি তার জানার কথা না। আবার কোনো বিচারককে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, আইনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। এ ব্যাপারটি খুব অদ্ভুত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির ব্যাপারে এ মানবাধিকার কর্মী বলেন, মন্ত্রী বলেছেন, জিরো টলারেন্স সম্ভব না। সরকারের দায়িত্বশীল কারো কাছে থেকে এমন বক্তব্য কেউ আশা করে না। সরকার আত্মসমর্পণ করেছে, তার কথা এটাই প্রমাণ করে। সন্ত্রাস বেড়ে চলেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সরকার থেকে সন্ত্রাসকে সমর্থনের ধ্বনি পেলাম।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, র্যাবের ব্যাপারে অনেকেই অনেক কিছু বলেন। তবে বাস্তবতা হলো দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকলে র্যাবকে দরকার হবে। দেশের প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে থাকলে তাদের ওপর নির্ভর করতেই হবে। তিনি বলেন, যতদিন বিজিএমইএ হাঁচি দিলে সরকার কাঁপবে ততদিন র্যাব লাগবে। গত তিন বছরে দেশে ১৫৩টি আইন পাস হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫টি সংশোধনী আইন। এদের মধ্যে ছয়টি আইন জনগণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বর্তমান সরকারের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় দৃষ্টি নেই বললেই চলে। তিনি আরো বলেন, আমেরিকায় ৯৬ ভাগ হত্যার বিচার হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে ৯০ ভাগ আসামী জামিনে মুক্তি পায়। এমন হলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য এরোমা দত্ত বলেন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন আইন থাকতে পারে না। এমন হলে নারীরাই ভিকটিম হয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে সংসদকে কার্যকর করতে হবে। নির্বাচনে হেরে কোনো দল সংসদে না গেলে জনগণের আশার প্রতিফলন ঘটে না। সংসদ অনেক সময় এক দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। গণতন্ত্রের জন্য দায়িত্বপূর্ণ সংসদ দরকার বলে তিনি মনে করেন।
অপর আলোচক সাঈদ আহমেদ বলেন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে গুম। এতে মানবাধিকারের মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাছাড়াও সেমিনারের সমাপনী দিনে আরো ৫টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এগুলোতে নারীর ক্ষমতায়ন ও সিডও সনদ বাস্তবায়ন, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার, অভিবাসী শ্রমিক ও মানব পাচার, টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

