|
|
নূরুল হক হাওলাদারের জেরা শেষ- আজ পরবর্তী সাক্ষী
শহীদুল ইসলাম : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর বিশ্ব বরেণ্য মোফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষের ৩ নম্বর সাফাই সাক্ষী নূরুল হক হাওলাদারের জেরা শেষ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। গতকালের জেরায় তিনি জানিয়েছেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী বা বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার টিনশেড বাড়িতে বাস করে। তবে তার ঐ বাড়ি এখন দোতলার কাজ চলছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর নূরুল হক হাওলাদার মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ৩ নম্বর সাফাই সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এ জবানবন্দী দেন। ঐ দিনই তার আংশিক জেরা হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে পরের দিন তার জেরা হয়নি। গতকাল তার অসমাপ্ত জেরা শেষ করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলী প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। গতকাল বেলা পৌনে ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সোয়া ১ ঘণ্টায় এই জেরা শেষ হয়। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ছিলেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম, এডভোকেট মনজুর আহমেদ আনসারী ও আবুবকর সিদ্দিক। বিচারপতি নিজামুল হক, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই জেরা চলাকালে মাওলানা সাঈদী কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
গতকালের জেরার বিবরণ নিম্নরূপ :
প্রশ্ন : আপনারা ক' ভাই? নাম বলবেন?
উত্তর : ৩ ভাই। বড় ভাই শামসুল হক হাওলাদার, মেঝো ভাই মোজাম্মেল হক হাওলাদার। আর আমি নূরুল হক হাওলাদার।
প্রশ্ন : ঐ ২ জন কি আপনার বড়?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : মোজাম্মেল হকের ছেলে কটা।
উত্তর : চার ছেলে। শাহে আলম হাওলাদার, শহীদুল ইসলাম, সাইফুল্লাহ এবং হাফিজুর।
প্রশ্ন : শামসুল হকের ক' ছেলে।
উত্তর : ৩ ছেলে, তারা হলো লোকমান হাওলাদার, সোলায়মান হাওলাদার এবং জামাল উদ্দিন হাওলাদার।
প্রশ্ন : সোলায়মানের বয়স কত?
উত্তর : ৫৭/৫৮ বছর।
প্রশ্ন : মাহবুবুল আলম হাওলাদার প্রথমে তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছিল।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : আপনার ফুপা এবং মাহবুবের শ্বশুরের সম্পর্ক কি?
উত্তর : চাচাতো ভাই।
প্রশ্ন : মাহবুবের প্রথম স্ত্রী মাহবুবের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : সেই মামলায় আপনি সব সময় মাহবুবের বিপক্ষে কাজ করেছেন?
উত্তর : সত্য নয়। আমি পক্ষে-বিপক্ষে কোন দিকেই কাজ করি নাই।
প্রশ্ন : ঐ স্ত্রীর সাথে কি এখন মাহবুবের সম্পর্ক আছে?
উত্তর : না বৈবাহিক সম্পর্ক নেই। ঐ স্ত্রীর দায়েরকৃত মামলায় সে ২ বছর জেল খেটেছে।
প্রশ্ন : মাহবুবের বর্তমান বাড়ি কিসের?
উত্তর : টিনসেড বিল্ডিং। তবে দোতলার কাজ চলছে।
প্রশ্ন : মাহবুবের বাড়ির দোতলার কাজ চলছে। মর্মে আপনার প্রদত্ত বক্তব্য সত্য নয়।
উত্তর : আপনার বক্তব্য সত্য নয়।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধ চালাকালে আপনি কতবার রাজলক্ষী উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়েছেন?
উত্তর : ভিতরে কখনো যাইনি। আমাদের বাড়ির নিকটবর্তী রাস্তার পাশে স্কুল। এজন্য যাতায়াত ছিল। সব সময় ঐ রাস্তা দিয়ে চলাচল করতাম।
প্রশ্ন : আপনাকে তো কখনো মিলিটারী বা রাজাকার ডিস্টার্ব করেনি।
উত্তর : না, করেনি।
প্রশ্ন : আপনার গ্রামের বাড়িতে বা পারেরহাটের বাড়িতে কোন দিন পাকিস্তান আর্মি বা রাজাকার যায়নি।
উত্তর : যায়নি।
প্রশ্ন : পারেরহাট বাজারে লুট ও অগ্নিসংযোগ ক'দিন হয়েছিল?
উত্তর : একদিন লুটপাট হয়। তার পরের দিন খালের ওপারে বাদুরা ও চিতলিয়া গ্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
প্রশ্ন : পারেরহাট বাজারে কোন অগ্নিসংযোগ হয়নি।
উত্তর : জি, হয়নি।
প্রশ্ন : বাজারে লুটের দিন আপনি কোথায় ছিলেন?
উত্তর : বাজারে ছিলাম।
প্রশ্ন : লুটপাট হওয়ার পরে আপনি কি করলেন?
উত্তর : আমি আমার বাসায় চলে আসি।
প্রশ্ন : কাদের বাড়ি লুট হয়েছিল?
উত্তর : ৫/৬ টি হিন্দুর বাড়ি যেমন মাখন সাহা, মদন সাহা, নারায়ন সাহা, বিজয় মাস্টার, গৌরাঙ্গ পালের দোকান লুট হয়। দোকানের সঙ্গেই তাদের বাড়ি।
প্রশ্ন : গৌরাঙ্গ পাল এখন কোথায় থাকে?
উত্তর : মারা গেছে।
প্রশ্ন : হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছিল যারা তারা মুসলমান না হলে মেরে ফেলা হতো?
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন : এই ভয় কেন দেখিয়েছিল?
উত্তর : তারা দেখছিল যে পাকিস্তানী মিলিটারিরা তাদের মেরে ফেলছে। সেই ভয়ে তারা মুসলমান হয।
প্রশ্ন : পাকিস্তান আর্মিরা কি জানতো যে কে হিন্দু কে মুসলমান?
উত্তর : তারা না জানলেও পিস কমিটির সদস্যরা দেখিয়ে দিতো।
প্রশ্ন : যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের সাথে কি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আপনার দেখা হয়েছিল?
উত্তর : জি, পারেরহাট বাজারেই দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল।
প্রশ্ন : আপনি কি মাঝে মাঝে টগরা যেতেন?
উত্তর : আমি পারেরহাটে থাকতাম। মঝে মাঝে গ্রামের বাড়ি টগরা যেতাম।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর তো মুক্তিযোদ্ধা মিজান তালুকদার বাড়িতে ফিরে আসে।
উত্তর : যুদ্ধের পরে মুক্তযোদ্ধারা বাড়িতে ফিরে আসে। মিজানুর রহমান তালুকদারকে আমি এক মাস পরে দেখেছি।
প্রশ্ন : মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এসে কি করেছিল?
উত্তর : পিস কমিটির ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা থাকতো। জনসাধারণ তাদেরকে খাবার সরবরাহ করতো।
প্রশ্ন : মান্নান তালুকদার কি করতো?
উত্তর : পিরোজপুরের এক ব্যাংকে চাকরি করতো।
প্রশ্ন : উনি উনার বাড়ি থেকেই কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন।
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : মান্নান তালুকদার সাহেব তার ওপর নির্যাতনের কথা আপনাকে বলেননি- একথা সত্য নয়।
উত্তর : ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন : রাজাকারদের লুটের মালামাল পরে মুক্তিযোদ্ধারা উদ্ধার করে ফেরত দেয়ার কথা আপনি শোনেননি মর্মে যা বলেছেন তা সঠিক নয়।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি মান্নান তালুকদারের সাথে গ্রামের কওমী মাদরাসার কমিটিতে ছিলেন। একথা অসত্য।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি আপনার বাড়ি থেকে কত দূরে?
উত্তর : এক কিলোমিটার।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বাড়ি ও গৌরাঙ্গের বাড়ির মাঝে কোন বাড়ি ছিল কি না?
উত্তর : ২০/২৫ টি বাড়ি ছিল।
প্রশ্ন : আপনার বাড়ি থেকে রাজাকার ক্যাম্প এর মাঝে ক'টা বাড়ি ছিল?
উত্তর : ১০/১৫টি বাড়ি ছিল।
প্রশ্ন : আপনার বাড়ি আর গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ির মধ্যে যে ২০/২৫টি বাড়ি ছিল তার মধ্যে হিন্দু ক'টা। মুসলমান ক'টা।
উত্তর : ৭/৮টি হিন্দু বাড়ি ছিল।
প্রশ্ন : এর মধ্যে আপনার বাড়ি থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী মুসলমানের বাড়ি কার?
উত্তর : শফিজ উদ্দিন মৌলবীর বাড়ি ছিল।
প্রশ্ন : শফিজ উদ্দিনের ক'টা ছেলে মেয়ে ছিল?
উত্তর : ২ ছেলে ১ মেয়ে। তখন তার বড় ছেলের বয়স ২০/২২ বছর ছিল।
প্রশ্ন : গৌরাঙ্গের বাড়ির পাশে কার বাড়ি ছিল?
উত্তর : সতীন্দ্র ডাক্তারের বাড়ি। এখন সেই বাড়ি ও গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি নেই। নদীতে ভেঙ্গে গেছে।
প্রশ্ন : সতীন্দ্র ডাক্তারের ছেলে মেয়ে ক'টা ছিল?
উত্তর : সুবাশ নামে এক ছেলে ছিল। আরেকটা ছেলে ছিল তার নাম বলতে পারবো না। মেয়ে ছিল কি না তা বলতে পারবো না।
প্রশ্ন : মোসলেম মওলানার বর্তমানে কটা স্ত্রী আছে?
উত্তর : জানি না।
প্রশ্ন : উনি কটা বিয়ে করেছেন?
উত্তর : জানি না।
প্রশ্ন : বিপদ সাহার মেয়েকে মোসলেম মওলানা বিয়ে করেছে বলে প্রচারিত হয়েছে মর্মে যে কথা আপনি বলেছেন তা অসত্য বলেছেন।
উত্তর : সত্য বলেছি।
প্রশ্ন : সাঈদী সাহেব রাজাকারও ছিলেন না। স্বাধীনতা বিরোধীও ছিলেন না, তিনি মানবতা বিরোধী কোন কাজও করেননি- কথাগুলো অসত্য।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি রাজনৈতিক দলের জনসভায় সব সময় যান?
উত্তর : মাঝে মাঝে যাই।
প্রশ্ন : পত্র-পত্রিকা পড়েন?
উত্তর : মাঝে মাঝে পড়ি।
প্রশ্ন : সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত যেসব খবর জনকণ্ঠ ও যুগান্তরে ছাপা হয়েছে তা আপনি পড়েছেন?
উত্তর : ২/১ টা পড়েছি।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালের আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সাঈদী সাহেব পারেরহাটে আসেন, মর্মে যে কথা আপনি বলেছেন তা অসত্য।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার ভাতিজা রাজাকার ছিল। আপনার পুরো পরিবারই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করেছে।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : বর্তমানে আপনি জামায়াতে ইসলামী করেন এবং পারেরহাট জামায়াতের দায়িত্বে আছেন।
উত্তর : সত্য নয়। আমি জামায়াতে ইসলামী করি না।
প্রশ্ন : জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করেন বলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে সত্য গোপন করে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
উত্তর : ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার বাবা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।
উত্তর : সত্য নয়। আমি এই প্রথম শুনলাম।

