|
|
রাসূল (সা.)-এর অবমাননার শাস্তির দাবিতে ও পুলিশী জুলুমের প্রতিবাদে
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের কর্মীদের প্রতি পুলিশী এ্যাকশন -সংগ্রাম
0সমাবেশ ও মিছিলে পুলিশের বাধাদান 0 সংঘর্ষ ও ভাঙচুর 0 মাওলানা আহমাদুল্লাহ, মাওলানা নেজামীসহ শতাধিক গ্রেফতার 0 জাতীয় প্রেস ক্লাব অবরুদ্ধ0
স্টাফ রিপোর্টার : রাসূলের সা. সম্মান রক্ষার দাবীতে আজ রোববার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইসলামী ও সমমনা ১২ দল। হরতাল ঘোষণার পর পরই নেতাকর্মীদের উপর পুলিশের নির্যাতন ও ধর পাকড় শুরু হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে ১২ দলের যুগ্ম আহবায়ক মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ ও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামীসহ শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ফলে প্রেসক্লাব এলাকায় সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এতে সাংবাদিক, পুলিশসহ প্রায় অর্ধশত আহত হয়েছে।
আমেরিকার চলচ্চিত্রে রাসূল সা.কে অবমাননা করার প্রতিবাদে ও সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের দাবিতে ইসলামী ও সমমনা ১২ দল পল্টন ময়দানে গতকাল শনিবার মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু পল্টন ময়দানের অনুমতি না পাওয়া পল্টন মোড়ে এ সমাবেশ স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু ঢাকা মহানগর পুলিশ কোন প্রকার কারণ ছাড়াই পল্টন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। তাদেরকে মহাসমাবেশ করতে না দেয়ায় বেলা ১১ টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে রোববার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের যুগ্ম আহবায়ক ও খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, এনডিপি মহাসচিব আলমগীর মজুমদার প্রমুখ।
সাংবাদিক সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাব থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ নেতাকর্মীদের উপর লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ১২ দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ, মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী ও যুব নেতা মুফতী ফখরুল ইসলামসহ বেশকিছু নেতাকর্মীদের আটক করে। পুলিশের টিয়ারশেলে প্রেসক্লাবে চলমান যুবদলের এক অনুষ্ঠানের বিঘ্ন ঘটে। ফলে পুরো প্রেস ক্লাব এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে দৈনিক নয়া দিগন্তের এক ফটো সাংবাদিকের মটর সাইকেল পুড়ানো হয়। এ ঘটনায় সাংবাদিক-পুলিশসহ প্রায় অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। পুলিশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে একের পর এক ধর পাকড় করতে থাকে। সাংবাদিকরাও পুলিশের ধরপাকড় থেকে রেহাই পায়নি।
ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, আমরা অনেক চেষ্ট করেছি পূর্ব ঘোষিত সমাবেশ করার জন্য। কিন্তু পুলিশ রাজধানীর কোথাও আমাদের সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি। বরং তারা বিনা কারণে ১৪৪ ধারা জারি করে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে।
তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলন রাজনৈতিক নয়। রাসূলের সা. অবমাননার প্রতিবাদে এটি ঈমানী দায়িত্ব। আমরা বার বার অনুরোধ করেও মহাসমাবেশ করার অনুমতি পাইনি। এমন কী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। অবশেষে আর কোন উপায় না পেয়ে আমরা রাসূলের সা. সম্মান রক্ষার দাবিতে রোববার সকাল-সন্ধ্যা দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। এ হরতাল আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। ঈমানী দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে দল-মত নির্বিশেষে সকল পেশার মানুষকে হরতাল সফল করার জন্য তিনি আহবান জানান। তিনি অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের বিরোধী দলের অনুরোধে বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়াকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
এদিকে ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন জানিয়েছেন, সকালে প্রোগ্রাম চলাকালীন সময়ে তাদের অফিসে পুলিশ তল্লাসী চালিয়ে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক উপদেষ্টা আশরাফ আলী আকন্দসহ ৩০ নেতাকর্মীকে আটক করে পল্টন থানায় নিয়ে গেছে।
গতকাল শনিবার বিকেলে আজকের হরতাল পালনের জন্য রাজধানীর থানায় থানায় ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের ব্যানারে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাব অবরুদ্ধ
গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব অবরুদ্ধ করে রেখেছে পুলিশ। অবরুদ্ধ নেতা-কর্মীরা বের হলেই আটক করছে পুলিশ। বিকেল পর্যন্ত প্রেস ক্লাবের ভিতর থেকে যে-ই বের হচ্ছে তাকে আটক করছে পুলিশ। এমন কী সাধারণ পথচারীরা রেহাই পায়নি। প্রেস ক্লাব থেকেই প্রায় ৪০/৫০ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। শনিবার সকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কারাবন্দি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর মুক্তির দাবিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আববাসের উপস্থিতিতে হওয়া অনুষ্ঠানে আসা যুবদলের নেতা-কর্মীদেরকেও আটক করছে বলে যুবদল অভিযোগ করেছে। বিএনপি নেতা মির্জা আববাস অনুষ্ঠান শেষে প্রেস ক্লাব ত্যাগ করার পরপরই যুবদলের নেতা-কর্মীরা প্রেস ক্লাব থেকে বের হতে চাইলে পুলিশ তাদের আটক করছে। তাদের মধ্যে রয়েছে শ্যামপুর থানা যুবদলের সহ-সভাপতি খলিল, সূত্রাপুর থানা যুবদলের শরীফ, আজাদ, জাহাঙ্গীর, কাওসার, মামুন ও নাজিরসহ ১৫/২০ নেতা-কর্মী। যুবদলের আটককৃত নেতা খলিল পুলিশের পিকআপ ভ্যানে সাংবাদিকের জানান, আমরা সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত নই তারপরও পুলিশ আমাদের অন্যায়ভাবে আটক করেছে। আমরা প্রেস ক্লাবের ভিতরে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে এসেছিলাম।
রমনা জোনের ডিসি নুরুল ইসলাম জানান, গতকাল (শুক্রবার) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে সকল সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তারপরও আজ (শনিবার) নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল ও সভা-সমাবেশ করায় পুলিশ অ্যাকশন নিয়েছে এবং আইন অমান্যকারীদের আটক করেছে।
সাংবাদিকরাও পুলিশী হয়রানির শিকার
সমমনা ১২ দলীয় ইসলামী দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর প্রেস ক্লাবের সামনে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশি গ্রেফতার থেকে সাংবাদিকরাও বাদ পড়ছে না। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অনলাইন পত্রিকা বাংলানিউজ২৪.কমের সিলেট প্রতিনিধি রুহুল আমিন আঙ্গুরী ও সিলেট জালালাবাদ প্রতিনিধি পুলিশ পরিচয় পাওয়ার পর আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।
বাংলানিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ইসমাইল হোসেন জানান, অফিসের কাজে ঢাকায় আসা এই দুই সাংবাদিককে পুলিশ পরিচয় পাওয়ার পরও আটক করেছে। তিনি আরো বলেন, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়েছে তিনি পরিচয় পেলে অবশ্যই এই দুই সাংবাদিককে ছেড়ে দিবেন।
সাংবাদিক আটকের খবরের পর প্রেস ক্লাবে অবস্থানরত সাংবাদিকরা পুলিশের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন প্রেস ক্লাব একটি সংরক্ষিত এলাকা। এখান থেকে সাংবাদিক আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া কোনো ভাবেই শোভনীয় নয়।
অন্যদিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিচ্যুতদের চাকরি রক্ষা ও পুরুদ্ধার কমিটির একটি সাংবাদিক সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাবের গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় ৮ জনকে টেনে হিঁচড়ে পুলিশ ভ্যানে উঠায় এবং শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। এ সময় কর্তব্যরত পুলিশের এডিসি আনোয়ার ও নুরুন্নবীর কাছে নেতৃবৃন্দ বারবার তাদের সহকর্মীদের ছেড়ে দেয়ার আবেদন জানালেও পুলিশ তাতে কর্ণপাত করেনি।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বিকেল পর্যন্ত ৪৩ জনের আটকের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন আটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে আটককৃতদের মধ্য থেকে যাচাই বাছাই করে নির্দোষ ব্যক্তিদের ছেড়ে দেয়া হবে।
শনিবারের সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো মামলা হয়েছে কি না তিনি এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, মামলার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। উপরের নির্দেশে মামলা হবে।
রমনা ডিসি নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মোট ৩টি মামলা হবে আজকের (শনিবার) সংঘর্ষের ঘটনায়। হামলা, ভাংচুর, আগুন লাগানো, গাড়ী পোড়ানো ও সরকারি কাজে বাধা দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে এই মামলা ৩টি হচ্ছে। মামলার বাদী হচ্ছে পুলিশ। এদিকে একজন সাংবাদিকের মটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিককে থানায় মামলা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

