|
|
শহরে ১৪৪ধারা \ সরকারি কলেজ বন্ধ ঘোষণা
রাঙামাটি থেকে আনোয়ার আল হক : রাঙামাটি শহরে পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে আকস্মিক এক সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে রাঙামাটি শহরে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে রাঙামাটি সরকারি কলেজ। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সকালে রাঙামাটি সরকারি কলেজে পাহাড়ি-বাঙালি ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হলে মোবাইল গুজবে এই সংঘর্ষ সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় শহরজুড়ে ব্যপক দোকানপাট ভাংচুর ছাড়া পাঁচটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। শহরের সংঘর্ষের খবর উপজেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়লে সেখানেও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়। পুরো জেলায় বর্তমানে যুগপৎভাবে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে রাঙামাটি সিএমএইচে ৩৮ জন, রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১২জনকে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে সাংবাদিক, পুলিশ, আনসার, ছাত্র ও বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। গুরুতর অবস্থায় ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। শহরে বিভিন্ন পয়েন্টে সেনা সদস্য ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সেনা বাহিনী ও র্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে বিকেলে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, চট্টগ্রাম অঞ্চলের জিওসি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ, বিজিবি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সমন্বয়ে জরুরি আইন-শৃক্মখলা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাঙামাটি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে যে কোনো মূল্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তবে বিকেলে আবারও শহরের রাঙাপানি এলাকায় পাহাড়ি যুবকরা একটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, সকাল ১০টার দিকে রাঙামাটি সরকারি কলেজে পাহাড়ি ছাত্ররা বিনা উস্কানিতে একজন এক বাঙালি ছাত্রকে মারধর করলে কলেজে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বাঙালি ছাত্ররা একত্রিত হয়ে ওই পাহাড়ি ছাত্রদের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য গেলে ছাত্রদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়। এসময় কয়েকশ বহিরাগত পাহাড়ি যুবক লাটিসোটা, দা-কিরিচ নিয়ে কলেজে অতর্কিত হামলা করে। পাহাড়িরা তান্ডব চালিয়ে ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বাঙালি ছাত্রদের মারধর করে। এসময় কলেজে অনার্স ১ম বর্ষের মধ্যবর্ষ পরীক্ষা চলছিলো। আহত কলেজ ছাত্র হাসান মুরাদ জানায়, অস্ত্রধারী পাহাড়ি যুবকরা পরীক্ষার হলে হামলা করে খাতা ছিঁড়ে ফেলে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের এলোপাতাড়ি মারধর করে। এসময় আতঙ্কে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। বহিরাগত পাহাড়ি যুবকরা কলেজ অধ্যক্ষের রুমসহ পুরো কলেজে ভাংচুর চালানোর পর কলেজের বাইরে এসে বাঙালি দোকানদার ও ভাসমান তরকারি ব্যবসায়ীদের পিটিয়ে আহত করে। আহত কলেজ হোস্টেলের পাহারাদার রমজান আলী (৬০) জানান, কলেজের বাইরে ব্যবসায়ীরা কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই বাহির থেকে ছাত্রদের সাথে যোগ দেয়া পাহাড়িরা যেখানে যাকে পায় তাকেই পিটিয়ে কুপিয়ে আহত করে। এসময় কে বা কারা দুইজন বাঙালি ছাত্রকে পাহাড়িরা জবাই করে হত্যা করেছে শহরময় এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন জায়গায় বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে পাহাড়িদের ওপর আক্রমণ চালায়, প্রতিরোধ করে পাহাড়িরাও। মুহূর্তেই সংঘর্ষ শুরু হয় শহরের বনরূপা, কাঠালতলী ও তবলছড়ি বাজারে। উভয় পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা পাঁচটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর মধ্যে চারটি বনরূপায় ও একটি রিজার্ভ বাজার এলাকায়। তবলছড়ি বাজারেও ব্রিজের গোড়ায় পাহাড়ি-বাঙালি মুখোমুখি অবস্থান নিলে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উভয় পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর কিছুক্ষণের মধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে দুপুর ১২.৪৫ মিনিটে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ১৪৪ ধারা জারি করে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা এ ব্যাপারে জানান, সকাল ১১টার দিকে টিটিসিতে দু'জন বাঙালি ছাত্র নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে কলেজ গেইট এলাকায় বাঙালিদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় উত্তেজিত জনতার সাথে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের আধাঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল ছুঁড়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও কয়েক রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে।
এরপর দুপুর ১২টার দিকে রাঙামাটি উপজেলা পরিষদে ইউএনডিপির উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের নিয়ে একটি কর্মশালা শেষে বের হওয়ার সময় উত্তেজিত বাঙালিরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আহত হয়। বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি বিশ্বকল্যাণ চাকমা জানান, কিছু বাঙালি যুবক অতর্কিত হামলা চালিয়ে আমাদের কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে আহত করে।
সকাল ১১টার দিকে পুরো শহরের দোকানপাট ও গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীরা আটকা পড়ে। গাড়ি বন্ধ থাকায় আহতদের যথাসময়ে হাসপাতালে নেয়াও দুস্কর হয়ে পড়ে। সেনা সদস্যরা সহায়তা করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। দিনভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আটকে থাকার পর বিকেলের দিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আটকে পড়া ছাত্রীরা বাড়ি ফিরে যায়।
এদিকে আহত ছাত্ররা রাঙামাটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বাঞ্চিতা চাকমার অপসারণ দাবি করে ঘটনার সূত্রপাত তার কারণে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। ছাত্ররা জানায়, ‘কলেজে যখন ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল অধ্যক্ষ চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তা নিরসন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বাঙালি ছাত্রদেরকে নিষেধ করলেও পাহাড়িদের উস্কে দেন। এরপরপরই পাহাড়ি ছাত্ররা আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়'।
তবে কলেজের অধ্যক্ষ বাঞ্চিতা চাকমা বলেন, পুরো ঘটনাটি আমার কাছে পরিকল্পিত একটি ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। পরিস্থিতি নিয়ে দুপুরে কলেজে একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠক থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
রাঙামাটি পুলিশ সুপার মাসুদ উল হাসান জানান, বিশিষ আইন-শৃক্মখলা সভায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সভা থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি গুজবে কান না দেয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, এই ঘটনায় পুলিশের এক এসআইসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।
এদিকে কলেজে সাধারণ ছাত্রদের ওপর পাহাড়িদের হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জেলা ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ইসলামী ছাত্র শিবির, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন ও পার্বত্য গণপরিষদ।

