|
|
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরামর্শ সভা
স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের এক পরামর্শ সভায় আইনজ্ঞ, কূটনীতিক ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের নাগরিক। তাদের সে দেশে সহাবস্থান ও বাংলাদেশ থেকে সুষ্ঠু প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারকেই নিতে হবে। এ দেশে মানবিক বিবেচনায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্ন হয় এমন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের উচিত মিয়ানমার সরকারের সাথে প্রয়োজনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আলোচনা করা। একই অনুষ্ঠানে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আমাদের আমন্ত্রণে কোনো সাড়া দেয়নি।
গতকাল শনিবার সকালে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের বাংলাদেশ অফিসের সাথে যৌথভাবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে দুটো প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যথাক্রমে চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক জাকির হোসেন এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা ছিলেন তথ্য কমিশনার অধ্যাপিকা ড. সাদেকা হালিম, ইউএনএইচসিআর-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মি. ক্রিস সেন্ডারস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোঃ বেনজীর আহমেদ। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার, শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মন, অধ্যাপক ড. রহমত উল্লাহ প্রমুখ।
অধ্যাপক জাকির হোসেন তার প্রবন্ধে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের নাগরিক। দুরভিসন্ধিমূলক নাগরিকত্ব আইন ও দেশটির সেনা শাসকের অত্যাচার-নিপীড়নে বাধ্য হয়ে তারা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে চলে আসে। বর্তমানে কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে। তাদের কারণে আইনশৃক্মখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, জমি ও খাদ্যের ওপর চাপ পড়ছে, শ্রম বাজার বেদখল হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট বহন করে সৌদি আরবে অবস্থান করছে। জাতিসংঘের শরনার্থী কমিশন রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী নাগরিক কার্ড ও জীবনযাপনে সহায়তা প্রদানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটা কোনো সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং ঐ দেশের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এক্ষেত্রে অবশ্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমার সরকারকে যৌক্তিক কারণেই চাপ দিতে হবে।
অপর প্রবন্ধকার রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি হয় ১৯৪৮ সালে। সে দেশে ১৩৫টি জাতি সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। রোহিঙ্গারা তাদের অন্যতম। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা মুসলমান এবং এক আল্লাহতে বিশ্বাস করে। আর রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে আছে সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানের জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে কেন? মিয়ানমার সরকারকে কেন কিছু বলছে না? রোহিঙ্গারা মুসলমান বলেই কি সেখানে তারা নির্যাতিত, তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। শান্তিতে নোবেল পাওয়া অং সান সুচি রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি শব্দও উচ্চারণ করছেন না কেন? রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং বিতাড়িতদের প্রত্যাবাসন ও সম্মানজনক পুনর্বাসনের ব্যাপারে জাতিসংঘ শরণার্থী হাইকমিশনকে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী যে কোন স্থানে বা দেশে জন্ম নেয়া রোহিঙ্গা শিশুরা মিয়ানমারের নাগরিক। বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেই সারা জীবন প্রতিপালন করতে হবে এমনটি কোনো সভ্য সমাজ বলবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থেও মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে নিজেদের উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম তার বক্তব্যে বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলা ভাষায় কথা বলে বিধায় তারা বাংলাদেশী এমন ভাবাটা ঠিক নয়। আর্জেন্টিনার বেশির ভাগ লোক স্প্যানিশ ভাষায় কথা বললেও তাদের পরিচয় আর্জেন্টাইন হিসেবেই। ইংরেজি ভাষাভাষী মাত্রকেই ইংলিশ ম্যান বলা যাবে না। তাদের কেউ আমেরিকান, কেউবা ইউরোপীয়ান। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয় বলে তাদের সকল দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশকে নিতে হবে কেন। তিনি মনে করেন, প্রয়োজনে কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা এসব বিষয়কে মাথায় রেখে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুত করা উচিত।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার মি. ক্রিস বলেন, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের এ দেশে জায়গা দিতে সম্মত হয়েছে। ইতোমধ্যে নয় শতাধিক রোহিঙ্গাকে আমরা পুনর্বাসন করেছি। এর প্রতিক্রিয়ায় অতিরিক্ত সচিব ড. কামাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হলে অনেকে প্রলুব্ধ হবে। ১৯৭১ সালে ভারতে মুক্তিকামী বাংলাদেশীদের আশ্রয় লাভ আর বর্তমানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি এক নয়। জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার অবকাশ নেই।
সভাপতির বক্তব্যে ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের সদ্য প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তারা কোনো সাড়া দেয়নি। অবশ্য তাদের মানবাধিকার কমিশন আমাদের কমিশনের মতো স্বাধীন নয়। সাড়া না পেয়ে আমাদের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা করছি। তিনি মনে করেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

