Quantcast
ঢাকা, বুধবারর 26 September 2012, ১১ আশ্বিন ১৪১৯, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১৫৪ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

অস্তিত্ব সংকটে মধুপুর বন গবেষণা কেন্দ্র

৪ শতাধিক একর জমি স্থানীয় রাজনীতিকদের দখলে ‘হালাল' করার আবেদন আওয়ামী নেতাদের

0 নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা0

সাদেকুর রহমান ও নজরুল ইসলাম, মধুপুর (টাঙ্গাইল) থেকে : অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন গবেষণা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার সাড়ে ৪ দশকে কেন্দ্রের ৪৩৩ দশমিক ৫ একর জমির মধ্যে ৪১৩ একরই বেদখল হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে গবেষণা কেন্দ্রের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে স্থানীয় রাজনীতিকরাই বছরের পর বছর দখল করে আছে ৪০৩ একর জমি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা সাথী ফসল করার নাম করে জোরপূর্বক শতাধিক একর জমি দখল করে। সম্প্রতি মাত্র ২০ একর জমি ‘হালাল' করার জন্য তারা বন অধিদফতর ও বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে।

সূত্র মতে, বিলুপ্ত প্রজাতির গাছকে গবেষণার মাধ্যমে উন্নত প্রজাতিতে রূপান্তর করে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৬৮ সালে বন অধিদফতরের অধীনে মধুপুর বন গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়। কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ১৯৮৫ সাল থেকে কেন্দ্রটি বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ কেন্দ্রটি মোট ৪৩৩ দশমিক ৫ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠলেও ইতিমধ্যে ৪১৩ একর জমিই বেদখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৪০৩ একর জমির অবৈধ দখলদার স্থানীয় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতারা। অভিযোগ রয়েছে, খোদ মধুপুর বন গবেষণা কেন্দ্রের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসেই স্থানীয় ভূমিখেকো রাজনীতিকরা এই বিপুল পরিমাণ জমি নির্বিঘ্নে দখল ও ভোগ করে চলেছে। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অন্ততঃ ১০ জন নেতা বন গবেষণা কেন্দ্রের শতাধিক একর জমি দখল করে নেয়। এ ছাড়াও জলছত্র পুলিশ ফাঁড়ি এবং জলছত্র বাজার গড়ে উঠেছে গবেষণা কেন্দ্রের জমিতে।

গবেষণা কেন্দ্র সূত্র জানায়, ২শ' দেশীয় প্রজাতি এবং  ১২০টি বিদেশী প্রজাতির গাছের চারা নিয়ে এ কেন্দ্রে গবেষণা করা হচ্ছে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রায় ৮ একর জমিতে ওষুধি বাগান গড়ে তোলা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় ভূমিখেকোদের দৌরাত্ম্য ও কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক উদাসীনতায় কেন্দ্রটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। মাত্র ৩৫ একর জমি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান খোদ এই কেন্দ্রের স্টেশন কমান্ডার আতিকুর রহমান। তিনি আরো জানান, এ কেন্দ্রে গবেষণা কর্মকর্তাসহ কমপক্ষে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত থাকার কথা, আছে মাত্র ৯ জন। সিনিয়র রিসার্চ অফিসারসহ কেন্দ্রের অপরিহার্য ১০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকলেও পূরণে কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের। কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, কেন্দ্রটি এখন ক্লিনিক্যালি ডেড। এর মূল কার্যক্রম কেবল কাগজ-কলমে। তবে গবেষণা কেন্দ্রটি দেখিয়ে সরকার বিদেশ থেকে বনজ গবেষণার নামে কোটি কোটি টাকা ঋণ-অনুদান আনতে পারছে, এটিই হয়তো ‘সাফল্য' হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে দখলের হোতা হচ্ছেন মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ সরোয়ার আলম খান আবু। দখলদার ব্যক্তি ও সংগঠনের তালিকায় আরো রয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আক্তার খান, অরণখোলা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড  আওয়ামী লীগের সভাপতি নোয়াজ আলী, সাধারণ সম্পাদক মিন্টু, আউশনারা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস মেম্বার, অরণখোলা ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিনহাজ এবং জলছত্র ভাই ভাই ক্লাব। এসব দখলদার জমি ‘হালাল' করতে সাথী ফসল খাওয়ার অনুমতি চেয়ে স্থানীয় এমপি ও খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের সুপারিশ নিয়ে বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক ও বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন।

উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সম্প্রতি মধুপুরে আসেন বিএফআরআই-এর সিলভি কালচার্স বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল্লাহ ও চীফ রিসার্চ অফিসার ড. মোঃ খালেক। তারা বন গবেষণা কেন্দ্রে এসে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সাথে কথা বলেন। সার্বিক বিষয়ে মোঃ শহীদুল্লাহ বলেন, ৪১৩ একর জমি বেদখল হয়ে গেছে এটা ঠিক নয়। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কিছুটা এদিক-সেদিক হয়েছে। তবে ৩৫-৪০ একর জমিতে গবেষণা কেন্দ্রের পুরো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। জবরদখলকৃত জমি বৈধ করতে নেতাদের আবেদনের প্রসঙ্গে তিনি জানান, কর্তৃপক্ষ এর সিদ্ধান্ত নিবেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই জমি বাঁশের বেড়া দিয়ে দখল স্বত্ব বুঝানো হচ্ছে কেন- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেড়া দেয়া ঠিক হচ্ছে না। তবে তারা (দখলদাররা) আমাকে কথা দিয়েছে এমনটা আর করবে না।

স্টেশন কমান্ডার আতিকুর রহমান অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আমরা কিছু বলতে পারি না। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছি। গত আট মাস ধরে বেশ সমস্যা হচ্ছে। এ কেন্দ্রটি গবেষণা বনায়ন ও সামাজিক বনায়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হলেও আওয়ামী লীগ নেতারা অবৈধভাবে আনারস, আদা, হলুদ, পেঁপে ইত্যাদির চাষ করছেন। তারা ২০ একর জমিতে এসব আবাদ করেছেন। তিনি আরও জানান, অবৈধ দখলদার রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ২০১০ ও ২০১১ সালে বন আইনে দুটি মামলা হয়েছে। এ দুটি মামলায় আসামী করা হয়েছে মোট ৪ জন এবং জবর-দখল জমি দেখানো হয়েছে মাত্র ৬ একর। বিপুল জমি দখল ও দখলদার চিহ্নিত হলেও মামলায় তাদের আসামী করা হয়নি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক কিছুই বলা যায় না। আর বন আইন অনুসারে শুধু যারা সশরীরে বনে ঢুকে ধ্বংস করে তারাই অপরাধী। বন আইনের ত্রুটির কারণেই রাঘব-বোয়ালরা পার পেয়ে যায়।

দখল প্রসঙ্গে মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ সরোয়ার আলম খান আবু দৈনিক সংগ্রামের কাছে দাবি করেন, তারা বন গবেষণা কেন্দ্রের জমি দখল করেননি। যা বেদখল হয়েছে বিএনপির আমলেই হয়েছে।

বন বিভাগ বা গবেষণা কেন্দ্র কোন অভিযোগ না করলেও আওয়ামী লীগ নেতার দোষারোপের প্রেক্ষিতে দৈনিক সংগ্রামের পক্ষ থেকে মধুপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন সরকারের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের কোন নেতাকর্মী অবৈধভাবে বন বিভাগের জমি দখল করেনি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অনেকে বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিক বনায়নের জন্য জমি বরাদ্দ পায়। তবে কোন দখলদার অসৎ উদ্দেশ্যে বিএনপি পরিচয় দিয়ে থাকলে সে বিষয়ে আমরা দেখবো।