|
|
জাতিসংঘ ও বিশ্ব ব্যাংকের সংস্কারের আহবান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
নিউ ইয়র্ক থেকে বিডিনিউজ : বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফসহ বহুজাতিক দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পদ্মা সেতু নিয়ে বহুজাতিক দাতা বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের টানাপড়েন শেষে আপসরফার পর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে ভাষণে বৃহস্পতিবার এ আহবান জানান। ভাষণে শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সংস্কারের দাবিও তোলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘আমি জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জাতিসংঘ, ব্রেটন উড ইনস্টিটিউশনস ও অন্যান্য বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়ে পুনরায় গুরুত্ব আরোপ করছি।’’
চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ গত কয়েক বছর ধরেই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং এসব প্রতিষ্ঠানে তাদের ভোটের ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে।
ব্রেটন উডস কনফারেন্স নামে পরিচিত এক সম্মেলন থেকে ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ গঠন করা হয়।
সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ৬০ বছরের পুরোনো ক্ষমতার সমীকরণের প্রতিফলন।’’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ‘‘(এতে) অধিকাংশ দেশের স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে এবং কয়েকটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়।’’
তিনি ব্রেটন উডসসহ অন্যান্য বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুষম অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিও তোলেন।
সম্প্রতি ফোর্বস সাময়িকীতে ‘বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতি' নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি করতে বাংলাদেশ সরকারের কয়েকজন ব্যক্তি চক্রান্ত করেছে অভিযোগ এনে সংস্থাটির বৃহত্তম প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল করে বিশ্ব ব্যাংক। এই ঘটনার পর সরকারের সঙ্গে দাতা সংস্থাটির সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে।
শেখ হাসিনা সব দেশে শ্রমিকের অবাধ চলাচল নিশ্চিতের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার কথা বলেন। শ্রমিক প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর সুবিধা নিশ্চিতে ডব্লিউটিও'র চুক্তি জিএটিএস দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদও দেন তিনি।
তিনি বলেন, নিরাপদ অভিবাসন এবং নারীসহ অভিবাসী কর্মজীবীদের অধিকার সংরক্ষণে অভিবাসী প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর যৌথ দায়িত্ব ডব্লিউটিও নীতির অংশ করা উচিত।
শেখ হাসিনা মনে করেন, নতুন সহস্রাব্দে বেশকিছু রাষ্ট্র এবং বিশ্বায়ন একটি পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। জাতিসংঘে উপস্থিত বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে বাংলাদেশের সরকার প্রধান বলেন, ‘‘আজ আমরা ন্যায়বিচার, সমতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কথা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারছি। এ সবই আমাদের অগ্রাধিকার।’’ এজন্য ‘অতীতের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা' ভুলে সবাইকে এক লক্ষ্যে কাজ করার আহবান জানান তিনি।
‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিপত্তি'
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা শুরুতেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নাসির আবদুল আজিজ আল-নাসেরকে এবং জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুনকে ধন্যবাদ জানান।
বিশ্ব গণজাগরণ, আন্তঃদেশীয় সংঘর্ষ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সন্ত্রাসবাদের মতো সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে জাতিসংঘের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন একথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা এবারের আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ বা পরিস্থিতি নিস্পত্তিকরণ' এর প্রশংসা করেন।
শেখ হাসিনা তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে বলেন, ‘‘আজ থেকে ৩৮ বছর আগে এ মঞ্চে দাঁড়িয়েই ‘সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়', ‘সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান', ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের অবসান' এবং ‘বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান' এর ঘোষণা দিয়েছিলেন।’’
পিতার এই নীতিই তাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সাম্পাদনে এবং ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্ডার গার্ড বিদ্রোহ সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রেরণা যুগিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪১ বছরের পুরোনো বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তন
শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের উন্নয়ন উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে দারিদ্র্য, সম্পদহানি ও মানব স্থানচ্যুতি হচ্ছে। যা সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিচ্ছে। সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে স্থানচ্যুত অভিবাসীরা গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে।’’
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি একটি নতুন ‘আইনগত ব্যবস্থা' গ্রহণের তাগিদ দেন যা জলবায়ু অভিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ইত্যাদি কর্মকান্ডের জন্য ‘গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড' এর দ্রুত বাস্তবায়নেরও আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্ব নেতাদের তিনি সতর্ক করে দেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ব্যাপক অশান্তির সৃষ্টি করতে পারে। যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বাজারে এলডিসি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং ওডিএ প্রতিশ্রুতি পূরণ জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
‘শান্তির জন্য ন্যায়বিচার'
শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘শান্তির প্রতি আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা অন্যতম সর্বাধিক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ।’’ তার ভাষায়, একমাত্র ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব, যা উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণতন্ত্রের পর্যায়ক্রমিক অনুপস্থিতিকে সামাজিক অবিচার, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বঞ্চনা এবং অসহায়ত্বের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এটি চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়।’’
ফিলিস্তিন জনগণের ওপর ইসরাইলের ‘নগ্ন অবিচার, হত্যা, নির্যাতন ও অবমাননা'র ঘটনাগুলোকে মানব ইতিহাসের এক ‘লজ্জাজনক অধ্যায়' হিসাবে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘‘ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা এবং একই ধরনের জ্বলন্ত ইস্যুগুলোর আশু সমাধান অত্যন্ত জরুরি।

