|
|
কুরআন হাদীস ও ছাত্রাবাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন \ বিপুল ক্ষতি
দিনাজপুর : দিনাজপুরে ছাত্রলীগের তান্ডবের প্রতিবাদে দিনাজপুর শহর ছাত্রশিবির এক সংবাদ সম্মেলন করে। এর আগে সকালে শহরে এক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে (বামে) -সংগ্রাম
0কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হোস্টেল ত্যাগের নির্দেশ
দিনাজপুর অফিস : দিনাজপুরে পুলিশের ছত্রছায়ায় অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে ইসলামী ছাত্রশিবির কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ৩০ জন শিবিরকর্মী আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা আশংকাজনক বলে চিকিৎসকগণ জানিয়েছেন। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা পবিত্র কুরআন-হাদীস ও ইসলামী সাহিত্যে অগ্নিসংযোগ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ছাত্রলীগ কর্মীদের সহায়তা করেছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশের গাড়িতে বহন করা পেট্রোল ঢেলেই ছাত্রাবাসে আগুন দেয় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। পুলিশ ছাত্রলীগকে নিবৃত্ত করার পরিবর্তে সাধারণ ছাত্রদের ওপর প্রায় ২০ রাউন্ড টিয়ারশেল ও ৫ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে। এ ঘটনায় কলেজ ও আশপাশের এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুরো শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এদিকে পরিস্থিতি শান্ত করতে গতকাল বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা ও সকল হোস্টেল খালি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দিনাজপুর সরকারি কলেজের একাডেমিক কাউন্সিল।
গত মঙ্গলবার রাত ১১টায় দিনাজপুর সরকারি কলেজের পার্শ্ববর্তী খালপাড়া ও সুইহারী এলাকার বিভিন্ন ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা হকিস্টিক, লাঠিসোটাসহ বিভিন্ন দেশী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। এ সময় ছাত্রাবাসের সাধারণ ছাত্ররা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কয়েকজন শিবির কর্মীকে ছাত্রলীগ কর্মীরা আটক করে এবং রড-হকিস্টিক দিয়ে বেদম প্রহার করে। আহতদের ১০ জনকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেন নামে আহত ১ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে হাসপাতালেই তাদের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ছাত্রাবাসগুলোতে হামলা চালায়। এর মধ্যে হিমি ছাত্রাবাসে লুটপাট শেষে আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিনা উস্কানিতেই ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা গভীর রাতে পুলিশের সহায়তায় এ হামলা পরিচালনা করে। হামলার সময় ক্যাডারদের সাথে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অংশ নেয়। ছাত্রাবাসে হামলা ও নিরীহ ছাত্রদের ওপর প্রহারের সময় অধিকাংশ পুলিশকে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের নির্দেশ পালন করতে দেখা গেছে। হিমি ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগের সময় পুলিশের গাড়িতে বহন করে আনা পেট্রোল দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এ সময় তারা ছাত্রাবাসে রক্ষিত কম্পিউটার, টেলিভিশন, মোবাইল সেট, টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে পেট্রোল ঢেলে পুরো ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগ করে। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে মুহূর্তেই পুড়ে ভস্ম হয়ে যায় ছাত্রাবাসের সকল কামরা, টিন, চেয়ার, টেবির, বিছানা, বালিশ, বুকসেলফ, ভাতের চাউল, পরীক্ষার প্রবেশপত্র, সার্টিফিকেট, বই-পত্রসহ সবকিছু। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি পবিত্র কুরআন-হাদীস ও ইসলামী সাহিত্যও।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, দিনাজপুর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাবিবর আহমেদ সুজন, ছাত্রলীগ নেতা রতন, দ্বীপ ও সুর্যসহ প্রায় ২০-২৫ জনের সন্ত্রাসী গ্রুপ এ হামলা চালায়। এ সময় তাদের হাতে রড, হকিস্টিক ছাড়াও পিস্তল, রামদা, চাপাতি ছিল। তাদের হামলায় গুরুতর আহত হয় দিনাজপুর শহর শিবির সেক্রেটারি আব্দুল কাইয়ুম, শহর সেক্রেটারিয়েট সদস্য আয়াতুল্লাহ, নাজমুল, আবু বকর সিদ্দিক, আব্দুল্লাহ, আসাদুল্লাহ, মাইদুল ইসলাম, মশিউর রহমান, সাদ্দাম হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন দিনাজপুর মেডিকেলসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে।
এ ব্যাপারে দিনাজপুর কোতয়ালী থানার ওসি আসলাম ইকবালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। কোতয়ালী থানার ডিউটি অফিসার আসমা খাতুন জানান, দিনাজপুর সরকারি কলেজ ও আশপাশের ছাত্রাবাসগুলো বর্তমানে শান্ত রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই কোনো মামলা হয়নি।
এলাকাবাসী জানায়, পুলিশের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা শুধু ছাত্রাবাসই নয়, পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায়। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা এ সময় পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ভয়ে এলাকার নারী ও শিশুরা আর্তচিৎকার করলে পুলিশ তাদের সহায়তার পরিবর্তে ক্যাডারদের নির্দেশে শাসিয়ে দেয়। দু'একজন প্রতিবাদে এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা তাদেরও রেহাই দেয়নি। বেধড়ক পিটুনি আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে এলাকার সাধারণ মানুষ পিছু হটতে বাধ্য হয়। হিমি ছাত্রাবাসের মালিক জালাল উদ্দীনের পুত্র জামান ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছলে ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনী তার ওপরও হামলা চালায়। পুরো অবস্থা ছিল লুটেরাদের রাজত্ব।
ছাত্রাবাসের মালিক জালাল উদ্দীন কেঁদে কেঁদে সাংবাদিকদের জানান, এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত কিছু ছাত্রলীগ কর্মী গতকাল আমার ছাত্রাবাসটি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার কি অপরাধ? এলাকায় আরো ছাত্রাবাস আছে, তাদের মত আমিও সেটি ভাড়া দিয়েছি। কিন্তু কেন এ ছাত্রাবাসে আগুন দেয়া হলো। আর পুলিশ ওইসব সন্ত্রাসীদের সাথে থেকেও কেন তাদের নিবৃত্ত করতে পারলো না? আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। ওই সন্ত্রাসীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল বুধবার সকালে দিনাজপুর শহর ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে এক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিছিল শেষে প্রতিবাদ সমাবেশে দিনাজপুর শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা সারা দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তারই অংশ হিসেবে দিনাজপুরে এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। পরিকল্পিত এ হামলায় নিরীহ শিবির কর্মীসহ সাধারণ ছাত্রদের বিরূদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ছাত্রলীগ। বিনা উস্কানিতে তারা এ তান্ডব চালিয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্রদের বসবাসের স্থানে যারা আগুন দেয়, তারা ছাত্র নয়, তারা জাতির কলঙ্ক, সমাজের দুশমন। কোনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গি গ্রুপ ছাড়া এসব কেউ করতে পারে না। হিমি ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা আগুন দিয়ে প্রমাণ করেছে ছাত্রলীগ একটি জঙ্গি সংগঠন। অবিলম্বে তাই ছাত্রলীগ নামের জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমি সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি- অবিলম্বে ছাত্রলীগ নামের এ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে। নচেৎ ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এছাড়া দিনাজপুর শহর শিবির সভাপতি মতিউর রহমান এক সাংবাদিক সম্মেলনে অবিলম্বে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ছাত্রলীগকে সহায়তাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চল জামায়াতের সহকারী পরিচালক ও চিরিরবন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্জ আফতাব উদ্দীন মোল্লা, দিনাজপুর জেলা জামায়াতের আমীর মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম, সেক্রেটারি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান ভূট্টো ও শহর জামায়াতের আমীর মোঃ তৈয়ব আলী। নেতৃবৃন্দ এ ঘটনার সাথে জড়িত সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এর আগে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের দিনাজপুর শহর সেক্রেটারি আব্দুল কাইয়ুমসহ অপর দু'জন মোটরসাইকেলযোগে দিনাজপুর সরকারি কলেজ এলাকা থেকে শহরে আসার পথে সুইহারী এলাকায় পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রলীগ ক্যাডাররা শিবির নেতাদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দিকে লুকিয়ে থাকা অন্য সন্ত্রাসীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে শিবির নেতাদের ওপর উপর্যুপরী হামলা চালায়। এ সময় তারা ওই ৩ শিবির নেতাকে এলোপাতাড়ি মারধোর করে। পরে আটককৃত শিবির নেতাদের পার্শ্ববর্তী চেহেলগাজী স্কুলে নিয়েও নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা। এ সময় আরো দু'জন আহত হয়। অপর আহতরা হলেন- আয়াতুল্লাহ ও মাইদুল ইসলাম। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

