|
|
রামুর বৌদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হলেও আতঙ্ক কাটেনি সাধারণ মানুষের
0জেলা জুড়ে চলছে গ্রেফতার বাণিজ্য
কামাল হোসেন আজাদ/শাহজালাল শাহেদ, কক্সবাজার থেকে : কক্সবাজারের রামুতে ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কুরআন শরীফ অবমাননাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা কর্তৃক বৌদ্ধ বিহার ও বসতবাড়িতে হামলা ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে জ্বালাও-পোড়াওয়ের সহিংস ঘটনায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও আতঙ্ক কাটছে না সাধারণ মানুষের মাঝে। এ ঘটনায় ১৪ মামলায় নামিয়সহ অজ্ঞাত ৭ হাজার জনকে আসামী করে পুলিশ। এতে আটক করা হয়েছে শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষসহ ১৮৫ জনকে। গ্রেফতার এড়াতে বাড়িঘর ত্যাগ করে এলাকা ছেড়েছে পুরুষরা। ফলে আতংকগ্রস্ত হয়ে মানুষ শূন্য হয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম। জেলার রামুসহ বিভিন্ন এলাকায় বৌদ্ধ বসতিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের গণমামলা ও গণগ্রেফতার চলছে। সেইসাথে জেলা জুড়ে জমে উঠেছে পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য।
অভিযোগ সূত্রের দাবি, পুলিশ রাতে বাড়িঘরে অভিযান চালিয়ে যাকে পাচ্ছে তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাচ্ছে, আবার পরদিন সকালে বিভিন্ন অজুহাতে মুক্তি পাচ্ছে উৎকোচ দিয়ে। এখবরও মুক্তি পাওয়া অধিকাংশ মানুষের মুখে মুখে। এ ঘটনায় আগামীকাল শুক্রবার বিএনপির একটি তদন্ত টিম ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যাবেন। এ পর্যন্ত ওইসব ঘটনায় জেলার ১৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে রামু থানায় ৬টি, উখিয়ায়-৪, কক্সবাজার সদরে-২ ও টেকনাফ থানায় ২টি। মামলাগুলোতে অন্তত ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে আসামী করা হয়েছে। আসামীদের মধ্যে বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের জড়ানো হচ্ছে। উখিয়া বিএনপি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার জাহান চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক সোলতান মাহমুদ এবং টেকনাফে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও হোয়াইক্যং ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারীকে প্রধান আসামী করা হয়েছে। অন্যদিকে জেলার কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় গণহারে আটক অভিযান চলছে। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে ১৮৫ জনকে আটক করেছে। গত রোববার রাত থেকে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া দাবি করেছেন, বৌদ্ধ বসতি ও বৌদ্ধ বিহারে সহিংসতার ঘটনায় রামুসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১২ বৌদ্ধ বিহারে আগুন ও ৬টি বৌদ্ধ বিহার ভাংচুর এবং ২৮টি বসতবাড়ি ও দোকানে আগুনসহ শতাধিক বসতবাড়িতে ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, তাদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। কিন্তু টাকার অংকে পুড়ে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহারের ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষু প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সীমা বিহারে ৪শ'টির বেশি ছোট-বড় বৌদ্ধ মূর্তি ছিল। সহিংসতার পর মাত্র অর্ধশতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মূর্তি পাওয়া গেছে। সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নেতা বিজন বড়ুয়া জানান, ২৯ সেপ্টেম্বর সহিংসতা শুরু হয়েছিল রাত ৯টার দিকে। অথচ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে রাত ১২টার দিকে। পুলিশ এ সময় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে সহিংসতা এড়ানো যেত। কিন্তু এই সীমা বিহারে এসে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকজনকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ওই ঘটনা পরই সীমা বিহার ও বড়ুয়াপাড়ার বৌদ্ধ বসতিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, জেলার ৪টি থানায় বৌদ্ধ বিহারে অগ্নিসংযোগ, হামলার চেষ্টা ও পুলিশের কর্তব্য কাজের বাধা দেয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট থানায় ১৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ৭ হাজার মানুষকে আসামী করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রতিটি মামলাতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের আসামী করা হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ঘরে ঘরে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। সূত্রমতে, টেকনাফে দায়ের করা মামলায় জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও স্থানীয় হোয়াইক্যং ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারীকে প্রধান আসামী করা হয়েছে। টেকনাফে ২টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এ দু'টি মামলার মধ্যে একটিতে ৭০ জন ও অপরটিতে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় ৬শ' ৫৩ জনকে আসামী করা হয়েছে। টেকনাফ থানা পুলিশ দু'দিনে ৩১ জনতে আটক করে। আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
এদিকে উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার জাহান চৌধুরীকে প্রধান আমাসী ও সাংগঠনিক সম্পাদক সোলতান মাহমুদকে ২নং আসামী করে ২টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। সূত্রমতে, ২টি মামলাতে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৩ হাজার গ্রামবাসীকে আসামী করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় ৪১ জনকে আটক করা হয়েছে।
রামু থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপপরিদর্শক মুফিজ উদ্দিন জানান, রামু থানায় ৬টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে ৫টি মামলা সহিংসতা ও একটি মামলা ফেসবুকে কুরআন অবমানকর ছবি ট্যাগকারী উত্তম বড়ুয়ার বিরুদ্ধে রজু হয়েছে। তিনি জানান, উত্তম বড়ুয়ার মামলাটি ছাড়া অন্য ৫টি মামলার প্রতিটিতেই আড়াইশ থেকে ৩শ' জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে।
কক্সবাজার মডেল থানার পরিদর্শক মিজবাহ্ উদ্দিন খান জানান, সহিংসতার চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে দু'দিনে ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। ইতোপূর্বে হামলার চেষ্টা ও পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ২টি মালমা রেকর্ড করা হয়েছে।

