|
|
মাওলানা সাঈদীর পক্ষের ৭ম সাক্ষী জামাল ফকিরের জেরা সম্পন্ন
সামছুল আরেফীন : জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে ৭ম সাক্ষী জামাল হোসেন ফকিরের জেরা সম্পন্ন হয়েছে। জেরাকালে তিনি আবারো জানিয়েছেন, ইব্রাহিম কুট্টির লাশ তিনি নিয়ে যেতে দেখেছেন। যেভাবে, যে তারিখে, যেখানে ইব্রাহিম কুট্টির লাশ দেখেছেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তা সত্য। এর আগে গত মঙ্গলবার দেয়া জবানবন্দীতে তিনি জানিয়েছিলেন, নলবুনিয়ায় নিজ গ্রামে থাকাকালে তিনি ১৯৭১ সালের আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময় একদিন রাতের শেষ ভাগে গুলীর আওয়াজ শোনেন। পরে ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলতে দেখেছেন তিনি। কালাম চৌকিদারসহ অন্যান্য রাজাকাররা তার লাশ টেনে নৌকায় উঠায়। মোসলেম মওলানা (বর্তমান আওয়ামী ওলামা লীগ নেতা)সহ অন্যান্য রাজাকাররা সাহেব আলীকে পীছমোড়া দিয়ে বেঁধে তাকেসহ তার মাকেসহ নিয়ে যায়। পরে তার মাকে ছেড়ে দেয় এবং সাহেব আলীকে গুলী করে হত্যা করা হয়। অথচ রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে তাতে ইব্রাহিম কুট্টিকে ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে চিতলিয়া গ্রামে মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পারেরহাট খালের ওপর ব্রীজের ওপর গুলী করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয় বলে উল্লেখ আছে। আর ঐ ঘটনার সাথে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে জড়ানো হয়েছে।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষীকে জেরা করা হয়। প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী তাকে জেরা করেন। বিচারপতি নিজামুল হক, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই সময় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
গতকালের জেরা:
প্রশ্ন: লেখাপড়া করেছেন?
উত্তর: সামান্য করেছি, নাম দস্তখত করতে পারি। কুরআন শরীফ খতম করেছি।
প্রশ্ন: কয় ভাইবোন?
উত্তর: দুই ভাই, দুই বোন।
প্রশ্ন: সবার বড় কে?
উত্তর: বড় ভাই, নাম নুরুল ইসলাম।
প্রশ্ন: নুরুল ইসলাম বড় নাকি কুট্টি বড়?
উত্তর: সম বয়সী।
প্রশ্ন: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কবে ভর্তি হয়েছিলেন?
উত্তর: খুব সম্ভব ৫/৬ বছর বয়সে।
প্রশ্ন: সাক্ষী দিতে হবে কবে শুনেছিলেন?
উত্তর: ১ বছর ২/৩ মাস আগে।
প্রশ্ন: তখন আপনার ও আপনার বাবার নাম লিখে দিয়েছিলেন?
উত্তর: দিয়েছিলাম।
প্রশ্ন: জাতীয় আইডি কার্ড দেখিয়েছিলেন, আজকে এনেছেন?
উত্তর: ভোটার লিস্ট এনেছি।
প্রশ্ন: ভোটার লিস্টে আপনার ছবি আছে?
উত্তর: নেই।
প্রশ্ন: আতাহার হাওলাদারকে চিনেন?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কী করতেন?
উত্তর: বাড়ীতে ছিলেন।
প্রশ্ন: তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, নাকি বিপক্ষে ছিলেন?
উত্তর: পক্ষে।
প্রশ্ন: তিনি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন?
উত্তর: থাকতে পারেন।
প্রশ্ন: আপনি যখন ওই বাড়ীতে ছিলেন, তখন আতাহার আলী কোথায় ছিলেন?
উত্তর: জানি না।
প্রশ্ন: আজহার আলী হাওলাদার ও আতাহার আলী হাওলাদারের বাড়ী একটিই?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: সাহেব আলী ও তার মাকে নিয়ে যেতে দেখেছেন?
উত্তর: দেখেছি।
প্রশ্ন: কখন নিয়ে যেতে দেখেছেন?
উত্তর: ফজরের নামায শেষে ফর্সা হয় যখন, তখন নিয়ে যেতে দেখেছি।
প্রশ্ন: সাহেব আলীদের বাড়ীতে ঘটনার দিন কারা এসেছিল?
উত্তর: রাজাকাররা এসেছিল, কোন আর্মি আসেনি।
প্রশ্ন: সাহেব আলী ও তার মাকে কারা নিয়েছে?
উত্তর: রাজাকাররা।
প্রশ্ন: পারেরহাটের সব রাজাকারদের চিনেন?
উত্তর: ২/৪ জনকে চিনি।
প্রশ্ন: নলবুনিয়া থেকে পারেরহাট উজানে, নাকি ভাটিতে?
উত্তর: নলবুনিয়া ও পারেরহাটের মধ্যে পারেরহাট ভাটিতে, নলবুনিয়া থেকে পিরোজপুর যেতে ভাটিতে নেমে জোয়ার দিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্ন: নলবুনিয়া থেকে পারেরহাট কোন দিকে?
উত্তর: পূর্ব-দক্ষিণ দিকে আর পিরোজপুর উত্তর-পশ্চিম দিকে।
প্রশ্ন: খালটা কোন পর্যন্ত গেছে?
উত্তর: কচা নদী থেকে জোয়ারের পানি পিরোজপুরের দিকে তিন মাইলের মত দূরে যায়।
প্রশ্ন: বাদুরাপুলের পার কচা নদী থেকে কত দূরে?
উত্তর: আড়াইশ গজ দূরে।
প্রশ্ন: বাদুরা কী?
উত্তর: গ্রাম।
প্রশ্ন: বাদুরা লাগোয়া গ্রামের নাম কী?
উত্তর: চিতলিয়া।
প্রশ্ন: শ্রাবণ মাসে খালে পানি থাকে?
উত্তর: থাকে।
প্রশ্ন: খালে ১২ মাস মাছ থাকে?
উত্তর: যখন পানি থাকে।
প্রশ্ন: বাংলা কোন মাসে ইংরেজী কোন কোন মাস তা বলতে পারবেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: যে ঘটনার বর্ণনা দিলেন তা কী লিখে রেখেছিলেন?
উত্তর: লিখে রাখিনি। আর এটা সব মানুষেরই জানা।
প্রশ্ন: রানী বেগম কে?
উত্তর: আমার ফুফু।
প্রশ্ন: আপনার বড় না ছোট?
উত্তর: বড়।
প্রশ্ন: মোস্তফা?
উত্তর: ছোট।
প্রশ্ন: সেতারা বেগম?
উত্তর: দাদী হন।
প্রশ্ন: সেতারা বেগম, রানী বেগম, মোস্তফা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য দিয়েছে, তা আপনি জানেন?
উত্তর: দিতে পারে, তবে তা জানি না।
প্রশ্ন: রইজ উদ্দিন পসারী ও সইজ উদ্দিন পসারী নামে দুই বড় ব্যবসায়ী চিতলিয়ায় ছিল?
উত্তর: ছিল।
প্রশ্ন: চিতলিয়ায় রাজাকাররা বাড়ীঘর পুড়িয়েছিল, তা জানেন?
উত্তর: শুনেছি। পাকিস্তান আর্মিরাও ছিল।
প্রশ্ন: রইজ উদ্দিন পসারী ও সইজ উদ্দিন পসারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না বিপক্ষের লোক ছিল?
উত্তর: পক্ষের।
প্রশ্ন: ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নিয়ে যাওয়া আপনি দেখেননি।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাত্রের প্রথম ভাগে বিলে বড়শি পেতে আসি। রাত্রের শেষ ভাগে আমি নৌকা নিয়ে বড়শি তুলে বাড়ির কাছাকাছি আসলে বিশাল একটা শব্দ শুনতে পাই। শব্দ শুনে আমি খেয়াল করি আমার পাশ লাগানো আজহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে কান্নাকাটির শব্দ শোনা যায়। আমি ঘরে চলে আসি। আমার আববা বলেন আজহার মামার বাড়ি বড় একটা শব্দ শোনা গেছে এবং কান্নাকাটিরও শব্দ শোনা যাচ্ছে চলো গিয়ে দেখে আসি। আমার বাড়ির পূর্ব দিক থেকে আজহার আলীর বাড়ির উঠানের মাঝ বরাবর পূর্ব দিকের গাছের আড়ালে গিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ আইয়ুব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হাকিম মুন্সি, মান্নান ও আশরাফ আলী খালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পিছে দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মওলানা, রুহুল আমিন, মোমিনরা সাহেব আলীকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তার মাকেসহ পারেরহাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলে পারেরহাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেব আলীদের ঘরে চলে আসি। ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছে এবং তার হাত দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়ছে। তার বোন রানী বেগম মমতাজের হাত বেঁধে দিচ্ছে দেখি। তখন আমি ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমকে জিজ্ঞাসা করলাম ফুফু তোমার কি হয়েছে? তখন মমতাজ বেগম উত্তর দেয় যে গুলীতে ইব্রাহিম কুট্টি মারা গেছে সেই গুলী তার হাতেও লেগেছে, লাঠি দিয়ে তার আববার গায়েও আঘাত করেছে। আববার গায়েও আঘাত করেছে। এই কথাগুলি অসত্য।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: ইব্রাহিম কুট্টির লাশ পারেরহাট বাদুরাপুলের সাথে নৌকায় বেঁধে রেখেছে মর্মে আপনার শোনার কথা অসত্য।
উত্তর: সত্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি মমতাজের মামলার সাক্ষী ছিলেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: মামলার এজহারে কী লেখা ছিল, তা বলতে পারবেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: যেভাবে, যে তারিখে, যেখানে আপনি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ দেখেছেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তা সত্য নয়।
উত্তর: আমি সত্য বলেছি।
প্রশ্ন: আপনার নাম কয়টা?
উত্তর: একটাই নাম, জামাল হোসেন ফকির।
প্রশ্ন: আপনার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট আছে?
উত্তর: জি করিয়েছি। কিন্তু আজ ট্রাইব্যুনালে আনি নাই।
প্রশ্ন: আপনার বয়স প্রমাণ করার জন্য চেয়ারম্যান, মেম্বারের কাছ থেকে কোন সার্টিফিকেট, পরিচয়পত্র এনেছেন?
উত্তর: না, আনি নাই।
প্রশ্ন: আপনি যে বয়স বলেছেন, তা সত্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি একেবারেই নাবালক ছিলেন।
উত্তর: সত্য নয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রশ্ন: আপনি কোন সনে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন?
উত্তর: আমার মনে নাই।
এই সাক্ষীর বয়স এবং চেহারার ব্যাপারে প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ২ মাস পরে বাংলা কোন মাস ছিল?
উত্তর: আষাঢ় মাস ছিল।
প্রশ্নঃ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ২/৩ মাস পরে পাকিস্তান আর্মি ও রাজাকাররা সাহেব আলী ও তার মাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল কিনা?
উত্তরঃ আর্মিরা নয়, রাজাকাররা নিয়েছিল এবং সেটা আশ্বিন মাসে।
প্রশ্ন: দেশ স্বাধীনের পাঁচ ছয় মাস পর মমতাজ বেগম, তার ভাই এবং স্বামী হত্যার মামলা করার কথা অসত্য।
উত্তর: এটা সত্য নয়।

