|
|
রাবি ক্যাম্পাস কি ডাকাতের গ্রাম?
ছবি কথা বলে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অস্ত্র নিয়ে মহড়ায় কোন রাখঢাক ছিলো না। পুলিশের সামনে পিস্তল লোড করা, পিস্তল থেকে প্রতিপক্ষের প্রতি গুলীবর্ষণ এবং পুলিশের সামনেই রামদা দিয়ে কোপানো যেন কোন অপরাধের মধ্যেই পড়ে না। গত মঙ্গলবারের ছাত্রলীগের কর্মীদের অস্ত্রবাজির কয়েকটি ফাইল ফটো সে কথাই বলছে
কোন ঘটনা ঘটুক বা না ঘটুক পুলিশের চিরুনী অভিযান শিবিরের বিরুদ্ধে
সংগ্রাম রিপোর্ট : জঙ্গলের শাসনও যেন হার মেনেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। প্রশ্ন উঠেছে রাবি ক্যাম্পাস কি ডাকাতের গ্রাম? শাসকদলের অঙ্গ-সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা এই ক্যাম্পাসে গত পৌনে চার বছরে তিনটি খুন করেছে। প্রকাশ্যে পিস্তলসহ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। কি অন্য ছাত্র সংগঠন আর কি নিজেদের মধ্যে বিরোধে- নানাবিধ অস্ত্রসজ্জিত হয়ে মহড়া দেয়া নিয়মিত ঘটনা। পুলিশের চোখের সামনে তাদের এই অস্ত্রবাজি কোন রাখঢাকের ব্যাপার নয়। তবু তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আর কোন ঘটনা ঘটলেই পুলিশের চিরুনী অভিযান চলে শিবিরের বিরুদ্ধে।
গত মঙ্গলবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অস্ত্রবাজি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। পুলিশ, প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যগণ, শত শত শিক্ষার্থী প্রভৃতির সামনে তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে গুলী করে চলেছে। আইনশৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতেই পিস্তলে গুলী ভরতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। আইনশৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশেই শুধু গুলী ছোঁড়াই নয়- পিস্তল, রামদা, দা, হকিস্টিক ও চাপাতি হাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রীতিমতো যেন যুদ্ধের মহড়া দিয়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এখানেই শেষ নয়, শিবির কেন ক্যাম্পাসে আসলো- এই অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে রাবি প্রক্টর প্রফেসর চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়ার জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে ভিসির বাসভবনের সামনে নিয়ে গেলো। প্রক্টর তবু নির্বিকার- পদত্যাগের কথাও ভাবলেন না। ছাত্রলীগ অন্য সহকারী প্রক্টরদেরও লাঞ্ছিত করলো। একই অভিযোগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'টি বাস ও ভিসির বাসভবন ভাঙচুর করলো।
ছাত্রলীগ গত কয়েক বছরে শুধু অস্ত্রবাজিই করেনি- একের পর এক খুন করেও চলেছে। বর্তমান সরকারের আমলে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে প্রথম খুনের শিকার হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের এক পর্যায়ে অবরুদ্ধ শিবির কর্মীদের উদ্ধার করতে গিয়ে শের-ই-বাংলা ফজলুল হক হলের অভ্যন্তরে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন তিনি। একই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারুক হোসেন নিহত হয়। এই ঘটনার দায় শিবিরের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শুরু ছাত্রলীগ-পুলিশের তান্ডব। এ ধরনের অনেক ঘটনা ক্যাম্পাসে ঘটলেও ফারুক নিহত হওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর আমীর, নায়েবে আমীর, সেক্রেটারি জেনারেল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে পর্যন্ত জড়িয়ে ফেলে মামলা দেয়া হয়। এই ঘটনায় ১৪টি পর্যন্ত মামলা করা হয়। এসব মামলার আসামী ধরার নামে জামায়াত-শিবিরের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে দিনের পর দিন কারাবন্দি রাখা হয়। এই সর্বব্যাপী অভিযানের ফলে জনমনে সন্দেহ হয় যে, জামায়াত-শিবিরের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর জন্যই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছিল। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। একই বছরের ১৫ আগস্ট রাবিতে দলীয় কোন্দল ও ইফতারের টোকেন ভাগাভাগির জের ধরে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের কর্মীরা প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছাত্রলীগ নেতা নসরুল্লাহ ওরফে নাসিমকে হাতুড়ি, লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে এসএম হলের দোতলা থেকে নিচে ফেলে দেয়। ২৩ আগস্ট ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। চলতি বছর ১৪ জুলাই গভীর রাতে ছাত্রলীগের দু'টি গ্রপপের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলীতে বাম চোখে গুলীবিদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগ কর্মী সোহেল রানা খুন হয়। রাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হাতে এই তিন খুনের আসামীরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আইন প্রয়োগকারীরা যথারীতি তাদের ‘দেখতে পায় না'।
গত মঙ্গলবারের অস্ত্রবাজির দৃশ্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করার পর রাবি ভিসিকে সাংবাদিকদের সামনে টেলিফোন করেন এবং গুন্ডাদের ধরার এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। শিক্ষামন্ত্রীর এই টেলিফোন এবং তার ভিডিও চিত্র প্রচার এ পর্যন্ত ‘কর্তৃপক্ষীয় তৎপরতা' হিসেবেই প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন রাজশাহীর আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর কোন প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি।

