|
|
প্রশাসন ও ছাত্রলীগের নিয়োগ বাণিজ্যের জের
হুমায়ূন কবির, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে : দেশের প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আওয়ামী প্রশাসনের দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, এলাকাপ্রীতি ও ছাত্রলীগের খুন, ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, মারামারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্যের কবলে পড়েছে। এই সকল অপকর্মের হাত থেকে রেহাই পায়নি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আওয়ামী প্রশাসনের দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, এলাকাপ্রীতি ও ছাত্রলীগের নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে দীর্ঘ একমাস ৫ দিন ধরে। দীর্ঘ সময় ধরে অচলাবস্থা নিরসন করতে প্রশাসন ব্যর্থ হওয়ায় গত শনিবার রাত ৯ টায় এক জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে বসে। বৈঠকে পবিত্র ঈদুল আযহা ও দুর্গাপূজা ছুটি উপলক্ষে নির্ধারিত ছুটির ৭ দিন আগে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন । দীর্ঘ একমাস ৫ দিন ধরে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু করতে প্রশাসন ব্যর্থ হওয়ায় বিপাকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী। চরম সেশনজটে পড়েছে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাস সচল না করে নির্ধারিত ছুটির সাত দিন আগে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা। ছুটির পড়ে ঠিক সময়ে ক্যাম্পাস খুলবে কি না তা নিয়ে শঙ্কিত শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত ছুটির আগে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, শিক্ষকদের সংগঠন গ্রীন ফোরাম, জিয়া পরিষদ, ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এদিকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিভিন্ন বিভাগের প্রায় তিন শতাধিক চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। এতে চরম সেশনজটে পড়েছে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে দীর্ঘ ৫ বছরের সেশনজটে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে আল-ফিকাহ বিভাগ, সাড়ে তিন বছরের জটে পড়েছে আইন ও মুসলিম বিধান বিভাগ, দুই বছরের জটে পড়েছে ইংরেজি বিভাগ, এক বছরের জটে পড়েছে বাংলা বিভাগ। এছাড়াও এই একমাস ৫ দিন বন্ধ থাকার কারণে প্রায় প্রতিটি বিভাগই প্রায় ছয় থেকে এক বছরের সেশন জটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রমতে, গত ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১৭তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিন্ডিকেটে ৯২টি পদের বিপরীতে ১২৬ জন নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ২ জন শিক্ষক বাদে শাখা কর্মকর্তা পদে ৩ জন, ৩য় শ্রেণী (উচ্চমান ও নিম্নমান সহকারী) ও ৪র্থ শ্রেণী (মালি ও গার্ড) পদে ১২৩ জন। ৯২টি পদের মধ্যে সাক্ষাৎকার বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৭০টি পদের। ৭০টি পদের বিপরীতেই নিয়োগ হয়েছে ১২৬ জনকে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের নেতাকর্মী ও স্থানীয় কিছু ক্যাডার নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ছাত্রলীগের নিয়োগ বঞ্চিত ও স্থানীয় ক্যাডাররা। এরই সূত্র ধরে গত ১০ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সামসুজ্জামান তুহিনের নেতৃত্বে চাকরি বঞ্চিত দলীয় ও স্থানীয় ক্যাডাররা প্রক্টর অফিসে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। নিয়োগের দাবিতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি পরিচালকের অফিস, মেডিকেল, প্রকৌশলী অফিস, পরিবহন অফিস, প্রশাসনিক ভবনে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। বোমা মেরে দুটি বাস জালিয়ে দেয় এবং একটি এ্যাম্বুলেন্স ভাংচুর করে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ প্রহরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাড়ি ক্যাম্পাসে পৌঁছায়। অফিস শেষে দুপুর দুইটায় গাড়ি ফেরার সময় গাড়ি ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের মধুপুর নামক স্থানে পৌছালে চাকরি বঞ্চিত ছাত্রলীগ ও স্থানীয় ক্যাডাররা প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন ও ট্রেজারার প্রফেসর ড. শাহজাহান আলী ও কর্মকর্তার গাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। ২০ সেপ্টেম্বর সকাল ৯ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. শাহজাহান আলী গাড়িতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সময় গাড়িটি এগার মাইল নামক জায়গা পৌছালে অজ্ঞাত সাত -আটজন নিয়োগ বঞ্চিত বহিরাগত ক্যাডার তার গাড়িকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় তারা শিক্ষকদের বহনকারী একটি গাড়িতেও হামলা চালায় সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধসহ সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। ফলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সেশনজটের আশঙ্কা। চরম হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৪শত মাদরাসার যাবতীয় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম থমকে গেছে। বি্শ্ববিদ্যালয়ের এই অচল অবস্থায় আগামী ১৮ নবেম্বর কামিল প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা সঠিক সময়ে শুরু হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কিত ১৪০০ ফাযিল-কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থীরা।
এদিকে ক্যাম্পাসে সৃষ্ট অচলাবস্থার পিছনে ছাত্রলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও তার মামা ঝিনাইদহ জেলার পৌর মেয়র ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সভাপতি সাইদুল করিম মিন্টুর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়োগে তাদের চাহিদাপুরণ না হওয়ায় ক্যাম্পাসের সকল পরিবহন বন্ধ করে দেয় তারা। যদি কুষ্টিয়া পরিবহন মালিকের কোন পরিবহন ক্যাম্পাসে সরবরাহ করে তাহলে কুষ্টিয়ার কোন পরিবহন ঝিনাইদহ ও খুলনা রোডে চলতে দিবে না হুমকি দেয় বলে কুষ্টিয়া পরিবহন মালিক-শ্রমিকের একটি সূত্র জানিয়েছে। এই ভয়ে কুষ্টিায়া পরিবহন মালিক-শ্রমিক কোন গাড়ি ক্যাম্পাসে সরবরাহ করছে না।
এই সৃষ্ট অচলাবস্থা সামাল দিতে না পেরে গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালযের ভিসি ও সিন্ডিকেট সভাপতি প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দিনের সভাপতিত্বে রাত ৯টায় তার কুষ্টিয়া শহরে বাসভবনে এক জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে বসে। অনুষ্ঠিত ২১৯তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূঁজার ছুটি ১ সপ্তাহ এগিয়ে এনে গতকাল রোববার থেকে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য পূর্ব নির্ধারিত ঈদুল আজহা ও দূর্গাপূজার ছুটি শেষে ৯ নভেম্বর হল সমূহ খুলে দেয়া হবে এবং ১০ নবেম্বর থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা সমূহ যথারীতি চলবে।

