|
|
ভারতীয় দালাল চক্র ও অসাধু পাচারকারীরা এখনই তৎপর
খুলনা অফিস ঃ এবার পবিত্র ঈদুল আযহায় খুলনাঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন। এর পেছনে হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ নানা কারণে ব্যাপক ঋণ না পেয়ে ব্যবসায়ীদের পুঁজি সংকট, অসাধু চামড়া পাচারকারীদের অপতৎপরতা, চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে স্থানীয় বাজার না থাকা, মজুদের জন্য পর্যাপ্ত গোডাউনের অভাব ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার কারণ উল্লেখ করেছেন। তবে অসাধু চামড়া পাচারকারীদের তৎপরতাকে মূর্তিমান বিপদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে পাচারকারীরা সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারীদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। এছাড়াও চক্রটি বাজার ধরতে অগ্রিম টাকা দেয়া শুরু করেছে। এতে করে চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীরা জানায়, কুরবানীর ঈদকে সামনে রেখে চামড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে তোড়জোড় ও ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। এবার চামড়ার বাজার মোটেও ভালো না বলে দাবি করেছেন খুলনার চামড়া ব্যবসায়ীরা। ট্যানারী মালিকরা বাজার দর কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও তারা সঠিকভাবে বিল পরিশোধ করছেন না। পাশাপাশি চামড়া ব্যবসায়ীরা সরকারি কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় বিভিন্ন ফড়িয়া বা খুচরা ব্যবসায়ীদের দাদনও দিতে পারছেন না। এদিকে নগদ টাকা ও বেশি মূল্য পাওয়ার আশায় এক শ্রেণীর অসাধুচক্র চোরাইপথে ভারতে চালান করতে ওঠেপড়ে লেগেছে। এখানকার ভালমানের চামড়াগুলো সাতক্ষীরা-কলারোয়া ও ভোমড়া এলাকা থেকে চোরাচালানীর মাধ্যমে পাচার করছে। ঋষি সম্প্রদায়ের কিছু খুচরা ব্যবসায়ী ও ভারতীয় এক শ্রেণীর দালালচক্র এ কারবারের সাথে জড়িত বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
চামড়া শিল্প ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমানউল্লা আমান বলেন, ভালো চামড়া ভারতীয়রা বেশি দাম দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে দেশীয় ট্যানারী (চামড়া ক্রেতা কোম্পানিগুলো) দাম কমিয়ে দিচ্ছে ও বকেয়া পরিশোধ করছে না। সরকার থেকে কোনোরকম সহযোগিতা পাই না। এমনকি সরকারি কোনো ব্যাংকও আমাদের টাকা লোন দেয় না। এতে করে আমরা খুচরা ক্রেতাদের দাদন দিতে পারছি না। সে কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ চামড়াও নগদ দামে কিনতে সমস্যা হবে। ফলে ভালো চামড়াগুলো ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখন বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।
খুলনায় চামড়া ব্যবসার মার্কেট ও গোডাউন সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খুলনাতে কোনো চামড়ার মার্কেট নেই। চামড়া মজুদ করার মতো কোনো গোডাউনও নেই। দোকান ভাড়া নিয়ে আমরা এখানে ব্যবসার কাজ পরিচালনা করি। ভাড়ার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে প্রয়োজনের মুখে অনেক সময় ঘর মালিকরা ঘর দিতে না চাইলে জায়গা সঙ্কটে আমাদের ব্যবসা ব্যাহত হয়। এব্যাপারে বহুবার আমরা জেলা কৃষি বিপণন অধিদফতরে আবেদন করেও কোনো ফল পাইনি। তিনি বলেন, ডিসি ও মেয়র সাহেব যদি চামড়া শিল্পের জন্য আলাদা একটা মার্কেট ও চামড়া মজুদ রাখার গোডাউন তৈরি করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মার খেত না।
খুলনার পাওয়ার হাউজ মোড়ের চামড়া পট্টির ব্যবসায়ী ইয়াসিন লেদারের প্রোপ্রাইটার মোঃ আবু জাফর বলেন, চামড়ার ভালো ব্যবসা নির্ভর করছে ট্যানারীদের ওপর। তারা যদি আমাদের পেমেন্ট সঠিকভাবে পরিশোধ করে তাহলে ব্যবসা কিছুটা ভালোভাবে করা সম্ভব। তিনি বলেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে খারাপ থাকায় বেসরকারি ব্যাংক বা এনজিও থেকেও আমরা ঋণ পাচ্ছি না। তিনি জানান, মোট চামড়ার প্রায় অর্ধেকের বেশি চোরাইপথে ভারতে চলে যায়। আমরা বার বার আবেদন করলেও সরকারিভাবে এসব ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। এতে করে আমাদের ব্যবসা এবং চামড়া শিল্পটাই মুখ থুবড়ে পড়বে।
খুলনায় চামড়া ব্যবসায়ীদের লেদার (দোকান) আছে প্রায় ১৮টি। এছাড়া কিছু মওসুমী ব্যবসায়ী কুরবানীর ঈদকে সামনে রেখে চামড়া ব্যবসা করে থাকে। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া ক্রয় করে ব্যবসায়ীরা এগুলো চামড়া কোম্পানি বা ট্যানারীদের নিকট চালান করে দেয়। আবার কিছু ট্যানারী কুরবানী ঈদের সময় খুলনাতে আসে চামড়া কিনতে। চামড়া কোম্পানি বা ট্যানারীদের মধ্যে আকিজ সেফ ইন্ডাস্ট্রিজ ছাড়াও বাজার হাট, নাটোর ও ঢাকার লালবাগ পোস্তায় আছে কিছু ট্যানারী কোম্পানি।
এবার কুরবানীর ঈদে চামড়া কেনা- বেচার সম্ভাব্যতা উল্লেখ করে খুলনার চামড়া ব্যবসায়ী আমান লেদারের ম্যানেজার শহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে এবার খুলনাতে ৭ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার চামড়া কেনা-বেচা হতে পারে। তবে চামড়া মজুদের গোডাউন থাকলে ও ট্যানারী'রা আমাদের পেমেন্ট ঠিকমত দিলে এবং আমরা সরকারের কাছ থেকে কিছু লোন নিয়ে খুচরা ক্রেতাদের দাদোন দিতে পারলে কেনা-বেচার এই পরিমাণ বেড়ে ২০ কোটি থেকে ২৫ কোটিতে উন্নীত হওয়া সম্ভব হতো। জেলা কৃষি বিপণন অধিদফতরের সূত্রমতে চলতি সপ্তায় চামড়া বিক্রি হচ্ছে গরু ৩শ' টাকা হতে ১ হাজার টাকা, মহিষ ৮শ' টাকা হতে ১২শ' টাকা দাম, ছাগল ও ভেড়া ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা।
খুলনা জেলা কৃষি বিপণন অধিদফতরের জেলা মার্কেটিং অফিসার আব্দুস সালাম তরফদার বলেন, আমরা অনেকবার চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য একটা মার্কেট ও চামড়া মজুদের জন্য গোডাউন তৈরি করার উদ্যেগ নিয়েছি কিন্তু জায়গা সঙ্কটের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তবে সস্প্রতি মেয়র সাহেব একটা জায়গার সন্ধান পেয়েছেন বলে জেনেছি। মেয়র সাহেব উদ্যোগ নিলে সেখানে একটা চামড়ার মার্কেট হতে পারে। চোরাইপথে চামড়া ভারতে পাচার হচ্ছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে নিজেরা সচেতন না হলে এবং সরকারিভাবে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পাচার ঠেকানো সম্ভব হবে না।

