|
|
খেয়ে বিল না দিয়ে চলে যাওয়ায় বাধাদানের জের
সিলেট ব্যুরো : বিল দখল, ভূমি দখল, টাকা না দিয়ে নরসুন্দরের ওপর হামলার পর এমসি কলেজ ছাত্রাবাস পুড়িয়ে দেয় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এবার নাস্তা খেয়ে বিল না দিয়ে চলে আসায় বাকবিতন্ডার জের ধরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) ছাত্রলীগ সমর্থিত শিক্ষার্থীরা পার্শববর্তী ‘কফি হাউজ' নামের একটি রেস্টুরেন্টে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর-লুটপাট করেছে বলে অভিযোগে প্রকাশ। এতে রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার, বাবুর্চি ও কর্মচারীসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানায়, সিকৃবি শিক্ষার্থী মুন্নাকে কোপানো হয়েছে এ অভিযোগ এনে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে রেস্টুরেন্টটি ভাংচুর করেছে। গতকাল রোববর বেলা ১২টায় সিকৃবি পার্শ্ববর্তী আলুরতল ইকোপার্ক গেইটে ‘কফি হাউজ' নামের রেস্টুরেন্টে এ ঘটনা ঘটে। হামলাকারী শিক্ষার্থীরা কফি হাউজের পার্শ্ববর্তী আরেকটি ভাসমান রেস্টুরেন্টেও হামলা ও লুট চালায় বলে অভিযোগ করেছেন ওই রেস্টুরেন্ট মালিক।
কফি হাউজের মালিক সোহাগ আহমেদ জানান, সিকৃবি কয়েকজন ছাত্র নাস্তা খাওয়ার পর বিল না দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে তাদের আটকানো হয়। ফোনে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়টি জানালে ছাত্রলীগ সমর্থিত শতাধিক ছাত্র রেস্টুরেন্টে ধারালো দা, লাঠিসোটা, স্টাম্প ও পাইপ নিয়ে হামলা চালায়। তিনি জানান, এ সময় রেস্টুরেন্টের রেফ্রিজারেটর, দেয়ালের গ্লাস ও ক্যাশ কাউন্টার ভাংচুর করে আনুমানিক ৪ লাখ টাকার ক্ষতি করে তারা। এছাড়া তাদের হামলায় আহত হন ম্যানেজার তাজুল, বাবুর্চি দয়াল, কর্মচারী ইউনুস। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
সিকৃবির কৃষি অর্থনীতি ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ লেভেল-৩-এর সেমিস্টার-১-এর শিক্ষার্থী মুন্না এবং ফরিদসহ ৪ জন রেস্টুরেন্টে পানি পান করতে যায়। তাদের একজন এক গ্লাসমাত্র পানি পান করে। দোকানমালিক চার গ্লাসের পানির দাম দাবি করলে তর্কাতর্কী শুরু হয়। একপর্যায়ে রেস্টুরেন্ট মালিক সোহাগ দা দিয়ে মুন্নার হাতে ও পিঠে কোপ দেয় বলে অভিযোগ করা হয়। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক ছাত্র রেস্টুরেন্টটিতে হামলা চালায়।
কফি হাউজের পার্শ্ববর্তী একটি ভাসমান রেস্টুরেন্টের মালিক শফিকুল ইসলাম জানান, কফি হাউজে হামলার পর তার চা-পিয়াজুর একচালা দোকানে হামলা চালায় শিক্ষার্থীরা। দোকানের ক্যাশে বসা আমিরুল ইসলামকে তারা মারধর ও ভাংচুর করে। ক্যাশ থেকে ৬/৭শ' টাকা লুট হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।।
শিক্ষার্থীদের সাথে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোঃ আইয়ুবসহ এক প্লাটুন পুলিশ সেখানে অবস্থান করে। তবে এর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের শান্ত করে ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
এমসি কলেজে মহড়া, হামলা ও কক্ষ ভাংচুর : সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্টুরেন্টে ফাও খেয়ে বিল না দিয়ে ভাংচুরের তিন ঘণ্টার মাথায় এমসি কলেজে শিবির সন্দেহে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা ও শ্রেণীকক্ষ ভাংচুর করেছে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। হামলা ও মহড়ার কারণে গতকাল রোববার দিনভর ক্যাম্পাস জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে দেখা যায়। দর্শন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগেও ভাংচুর চালায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানায়, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে শিবিরের পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে শিবিরকর্মী সন্দেহে অনার্সের সাগর, মামুন, শামীম সারওয়ার নামে ৪ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া কলেজের দর্শন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের দু'টি শ্রেণীকক্ষের ১৫/২০টি চেয়ার-টেবিল ভাংচুর করে ছাত্রলীগ। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, ছাত্রলীগ নেতা মিঠু, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আজির উদ্দিন, এস আর রুমেল, ও বহিরাগত ছাত্রলীগ নেতা রুহেল আহমদ, অসীম কুমার, পলাশ আহমদ, আকাশসহ ২০/৩০ জনের একটি দল লাঠিসোটা নিয়ে আতঙ্ক ছড়াতে বেশ কয়েকবার শিবির সন্দেহে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে। দুপুর পর্যন্ত ধাওয়া ও মহড়া অব্যাহত থাকে। এ সময় অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়।
বিষয়টি জানতে চাইলে কলেজ ছাত্রলীগে একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত রাতে গোপনে শিবির ক্যাডাররা কলেজের সবগুলো ভবনের দেয়ালে ‘ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও' শিরোনামের পোস্টার লাগিয়েছে। এসব পোস্টার এমন উঁচুতে লাগানো যে তা ছেঁড়াও যাচ্ছে না। এ নিয়ে ছাত্রলীগ অধ্যক্ষসহ কয়েকজন বিভাগীয় প্রধানকে হুঁশিয়ারি করে দিয়েছে। এছাড়া শিবিরকর্মী সন্দেহে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পিটানোর কথা স্বীকার করেন তিনি।
কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ধীরেশ চন্দ্র এ ব্যাপারে জানান, ছাত্রলীগ হঠাৎ করে বেশ কয়েকবার কলেজে মহড়া দিয়েছে এটা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটু ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তবে কোনো ছাত্র ছাত্রলীগের হাতে আহত হয়েছে কিনা তিনি জানেন না।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ আইয়ুব জানান, এমসি কলেজে ছাত্রলীগের মধ্যে একটি ঘটনার খবর তারা পেয়েছেন। তবে সেখানে গত ৮ জুলাই ছাত্রাবাস পুড়ানোর পর থেকে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা এড়াতে দিনরাত পুলিশ প্রহরা বসানো হয়। ১৫ জন পুলিশ সদস্য কলেজে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে বলে উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, গত শনিবারও এমসি কলেজের পার্শ্ববর্তী সিলেট সরকারি কলেজে একই ধরনের শিবিরের ছাত্রলীগবিরোধী পোস্টারকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষার্থী ও দু'কর্মচারীকে পিটিয়ে আহত করে ছাত্রলীগ। এ ব্যাপারে শাহপরাণ থানায় ছাত্রলীগ নেতাদের নাম উল্লেখ করে একটি জিডিও করা হয়।

