Quantcast
ঢাকা, সোমবার 22 October 2012, ৭ কার্তিক ১৪১৯, ৫ জিলহজ্জ ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৪৪৯ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

ফেনী নদীতে ব্রিজ ও স্থলবন্দর নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে

এবার শুধু পানি নয়, নদীই গিলে ফেলার চক্রান্ত করছে ভারত

ছবিটি রামগড়ের অলিনগর এলাকা থেকে তোলা। নদীর ডান পাড়ে ভারতের অবস্থান ব্রিজ

ফেনী থেকে এ কে এম আব্দুর রহীম : কোন ধরনের সমঝোতা ছাড়াই একের পর এক ফেনী নদী দখলের অপচেষ্টা করছে ভারত। ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে হলেও চরম মিথ্যাচার করছে দেশটি। ইতোমধ্যে দেশটি ফেনী নদীতে ব্রিজ নির্মাণ ও স্থলবন্দর নির্মাণ করছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারেরও কোন মাথা ব্যথা নেই। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় পুরো ফেনী নদীই ভারতের দখলে চলে যাবে।

জানা যায়, তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সুরাহা না করেই ফেনী নদীতে ব্রিজ তৈরির ব্যাপারে ভারতকে অনুরোধ জানাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি এ সম্পর্কিত একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ফেনী নদীতে ব্রিজ নির্মাণ ও ভারতীয় অংশে সংযোগ সড়কসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাতে বলা হয়। খাগড়াছড়ি সীমান্তে ফেনী নদীর অংশ বাংলাদেশে পড়লেও এ নদীতে ব্রিজ করার ব্যাপারে ভারতই প্রথম প্রস্তাব দেয়। ফেনী নদীতে ব্রিজ হলে বাংলাদেশের তেগামুখ ও রামগড় স্থলবন্দরের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা পেতে বহুদিন ধরেই ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য ত্রিপুরা দাবি করে আসছিল। এটি হলে সাবরুম তেগামুখ থেকে বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব হবে মাত্র ৭২ কিলোমিটার। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা নিতে পারবে। এ লক্ষ্যে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে নয়াদিল্লীতে ঘোষিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইশতিহার অনুযায়ী তেগামুখ ও রামগড় স্থলবন্দর চালু করার ঘোষণা আসে। আর এ স্থলবন্দর কার্যকর করতে ফেনী নদীতে ব্রিজ করার প্রস্তাব দেয় ভারত। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের ফিরতি ঢাকা সফরে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার কথা ছিল। তবে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়ায় ফেনী নদীর বিষয়টি অনালোচিত থেকে যায়। এখন তিস্তার পানি চুক্তির ব্যাপারে কোন ধরনের সুরাহা না হলেও ফেনী নদীতে ব্রিজ করার জন্য ভারতকে অনুরোধ জানানোর জন্য চিঠি লিখেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র সচিবকে উদ্দেশ্য করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ফারহানা ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিটি সম্প্রতি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, রামগড়কে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া অবকাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প  প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অপরদিকে রামগড়ের সঙ্গে ভারতের কোন সংযোগ সড়ক বা অবকাঠোমা সুযোগ-সুবিধা নেই। রামগড় সীমান্তে ফেনী নদীতেও ব্রিজ নেই। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আরম্ভ হলে ব্রিজ নির্মাণ ও ভারতীয় অংশে সংযোগ সড়ক এবং  প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার। স্থলবন্দর কার্যকর করতে ফেনী নদীতে ব্রিজ নির্মাণসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়।

জানা গেছে, তেগামুখ ও রামগড় স্থলবন্দরের অপর পাশে ত্রিপুরা সরকার একটি আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট, শুল্ক অফিসসহ বন্দরের কয়েকটি  প্রয়োজনীয় পাকা ভবন নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করেছে। সাবরুম-আগরতলা-উদয়পুর সড়কসহ এ মহকুমার সঙ্গে অন্য মহকুমা ও জেলার সড়কের উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সে দেশের সরকার। ১শ' বছর মেয়াদী সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ভারতীয় মুদ্রায় ৪০ কোটি রুপি। প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ এ ব্রিজ এবং স্থলবন্দরের অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভারত ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্টও তৈরি করেছে।

সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি মাসে ভারতের আগরতলা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তেগামুখ ও রামগড় স্থলবন্দর চালুর সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফেনী নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণে কারিগরি পরীক্ষার ব্যাপারে নীতিগত অনুমোদন দেয় দুটি দেশ। সীমান্তবর্তী সাবরুমে ফেনী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণে গত ৪ মে দু'দেশ অনুমোদন দেয়ায় নির্মাণ কাজ চূড়ান্ত করে ভারত।

গত ৫ মে ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী জিতেন্দ্র চৌধুরী এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, এই ব্রিজ তৈরি হলে ত্রিপুরাসহ ভারতের গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল যেমন উপকৃত হবে তেমনি উপকৃত হবে বাংলাদেশও। কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সুরাহা না হওয়ায় নেয়া উদ্যোগ থমকে যায়। অথচ বাংলাদেশ সব সময় ভারতের নানা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ সত্ত্বেও বিনিময়ে পাচ্ছে শোষণ আর বঞ্চনা। তৎকালীন এরশাদ সরকারের সময় চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, সোনাগাজীসহ কয়েকটি উপজেলাকে সেচের আওতায় আনতে এই ফেনী নদীতে বাস্তবায়ন করা হয়েছে মুহুরী সেচ প্রকল্প। অথচ কোন প্রকার পানি চুক্তি করা ছাড়াই নদীর তলদেশে পাইপ বসিয়ে সেই পানি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে ভারত।

জাতীয় পার্টির লংমার্চ :

ফেনী নদীর পানি রক্ষার দাবিতে অবশেষে জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে গত ৫ মার্চ ঢাকা থেকে ফেনী অভিমুখে লংমার্চ শেষে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জনসভায় এরশাদ বলেন, জীবন দেব তবু ফেনী নদীর পানি দেব না। এই নদী ও নদীর পানি আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী। উক্ত লংমার্চ রাজনৈতিক ট্যান্টবাজি হলেও এলাকার হাজার হাজার মানুষ ফেনী নদী রক্ষার দাবিতে সেদিন এরশাদের জনসভায় হাজির হয়েছিলেন। এরশাদ  অবিলম্বে ফেনী নদীর অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

আজো কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি  :

ফেনী নদী রক্ষায় মিরসরাই, সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফেনী অঞ্চলের গণমানুষের দাবি হওয়া সত্ত্বেও সরকারি পর্যায়ে ভারতের পানি চুরি, ফেনী নদীর সীমানা অক্ষুণ্ণ রাখায় এখনো কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ভারত এগুচ্ছে ধীরে ধীরে এই নদীর ওপর ব্রিজ স্থাপনসহ স্থলবন্দর স্থাপনের প্রক্রিয়ায়। ব্রিজ বা বন্দর স্থাপন নিয়ে সাধারণ মানুষের মাথা ব্যথা নেই বা কেউ বাধাও দিবে না। বরং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবে সবাই। কিন্তু নদী রক্ষায় এত বড় গণআন্দোলন সত্ত্বেও ফেনীর প্রকৃত সীমানায় এখনো যায়নি ভারত।  নদীসহ অন্তত কয়েকশ' ফুট দখলে রাখতে চায় ভারত। সেই লক্ষ্যে বিএসএফ ক্যাম্পের বিশেষ নিরাপত্তা পোস্ট বর্ধিতও করেছে ভারত। আগে নদীর ওপারেও ছিল বাংলাদেশের জমি। কিন্তু সেই জমি দখল করে ধীরে ধীরে একটু একটু সীমানা এদিকে ঠেলে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বাংলাদেশের দিকে। এখন বলছে, নদীর অর্ধেক ভারতের অর্ধেক বাংলাদেশের। আবার ইতোমধ্যে ফেনী নদীতে টহল দেয়ার জন্য বোট নিয়েছে বিএসএফ। কিন্তু বর্ডার গার্ড টহল দিচ্ছে না নদীতে। নদী তীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় সরেজমিনে গেলে বাংলাদেশ অংশের অলিনগর আমলিঘাটের বৃদ্ধ আলী আহম্মদ মিয়া (৬৫) বলেন, স্বাধীনতার পরও নদীর ওই পাড়ে ঘর ছিল তার নদী ভেঙে ভেঙে এদিকে এসেছে আর সেও ওই পারের পর ভারত বলে এদিকে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এভাবে একের পর এক বাংলাদেশের ভূখন্ড দখল করছে। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের টাকায় বাস্তবায়ন করা মুহুরী প্রকল্পের সুফল তারা নিতে চায় জোর করে। এর সমাধান কি করতে পারে না বাংলাদেশ সরকার? ভূখন্ড রক্ষা এবং আমাদের নদী আমাদের দখলে রাখার আয়োজনও করা অসম্ভব?

ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভারতের মিথ্যাচার :

বহুল আলোচিত ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশে। ভারত অযথা নদীটির উৎপত্তিস্থল তাদের দেশে দাবি করছে। ব্যাপক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প থেকে খাগডাছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার আচালং এলাকার ভগবানটিলা (বি টিলা) পর্যন্ত অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বলা হতো, ফেনী নদী আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্তকারী এই নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যে। অথচ অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়, এটি বাংলাদেশের সম্পদ। এর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গার ভগবানটিলায়। নদীর ১০৮ কিলোমিটারের কোনো অংশ ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি।

সরেজমিন দেখা যায, আমলীঘাট সীমান্ত এলাকায় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে নদীর পাড়ে ব্লক তৈরি করছে ভারত। এই সীমান্তে পাইপ বসিয়ে ভারতের উপেন্দ্র নগরের জন্য পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রামগড়ের অদূরে সাবরুম শহরের পানি সঙ্কট মেটাতে ১৭টি পাইপ বসিয়ে পানি নিচ্ছে অনবরত। এছাড়া আচালং মৌজায় এক হাজার ৭০০ একর জমি ভারত দখল করে রেখেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি উপজেলার মধ্যবর্তী ভগবানাটিলা নামের একটি পাহাড় থেকেই এ নদীর যাত্রা শুরু। পাহাড়ের ছড়া থেকে উৎপত্তির পরপরই নদীটি বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ইজেরা গ্রামে প্রবেশ করে। ইজেরা গ্রাম থেকেই নদীটি ফেনী নদী নামে পরিচিত। দুই দেশের সীমান্ত ঘেঁষে বেশ কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর নদীটি মিরসরাইয়ের আমলীঘাট এক নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী উপজেলা ছুঁয়ে মিলিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য দ্য আসাম ট্রিবিউনে গত ৪ সেপ্টেম্বর ‘ত্রিপুরা হোপস ফর সলিউশন টু রিভার ডিসপুটস উইথ বাংলাদেশ' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফেনী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৩৪ সাল থেকেই বিরোধ চলছে। এ নদীর মোট আয়তন এক হাজার ১৪৭ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৫ বর্গকিলোমিটার ভারতের মধ্যে রয়েছে। নদীর বাকি অংশ বাংলাদেশ অংশে।' দ্য আসাম ট্রিবিউন লিখেছে, বিভিন্ন কারিগরি জটিলতায় ফেনী নদীর পানির পরিমাণ এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায়নি। সেজন্য পানির ভাগাভাগি নিয়েও বিরোধ নিত্তি হয়নি। এ দিকে ফেনী নাগরিক সমাজ ফেনী নদীকে ভারতীয় আগ্রসন থেকে রক্ষার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে।