ঢাকা, মঙ্গলবার 18 December 2012, ৪ পৌষ ১৪১৯, ৪ সফর ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

বিএসএফ-এর হত্যা-নির্যাতন-সন্ত্রাস বন্ধে ব্যবস্থা নিন

এই খবর বহুদিন আগেই পুরনো হয়ে গেছে যে, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশের নিরীহ নাগরিকদের নিয়মিতভাবেই হত্যা করে আসছে। নির্যাতনও চালাচ্ছে তারা নির্বিচারে। শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, এবার হয়তো আওয়ামী লীগের ‘বন্ধুরাষ্ট্র' তার নীতি ও কর্মকান্ডে পরিবর্তন ঘটাবে এবং রাতারাতি না হলেও পর্যায়ক্রমে বিএসএফ-এর হত্যা-নির্যাতনের অবসান ঘটবে। অন্যদিকে বন্ধ হওয়া দূরে থাকুক, বাস্তবে সীমান্ত এলাকা বাংলাদেশীদের জন্য এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। বেড়েছে বিএসএফ-এর নিষ্ঠুরতাও। প্রসঙ্গক্রমে কুড়িগ্রামের ১৫ বছর বয়সী ফেলানীর নৃশংস হত্যাকান্ডের কথা স্মরণ করলে এখনো মানুষ মাত্রকেই আতঙ্কিত হতে হয়। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কিশোরী ফেলানীকে পাশবিক নির্যাতনের পর কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রেখেছিল বিএসএফ। বীভৎস সে দৃশ্য গোটা পৃথিবীর মানুষ দেখেছে এবং দেখে ঘৃণায় ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারকে তৎপর হতে দেখা যায়নি। সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিতে ভুল করেনি বিএসএফ। ফলে নিহত ও নির্যাতিত বাংলাদেশীদের সংখ্যা কেবল বেড়েই চলেছে। গত রোববারের দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ৪৭ মাসে বিএসএফ ২৪৩ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। এ সময় বিএসএফ-এর হাতে নির্যাতিত হয়েছে ৩০৭ জন। বিএসএফ অপহরণ করেছে অন্তত ২৫৪ জনকে। পরিসংখ্যানগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে। এসবের বাইরে আরো অসংখ্য বাংলাদেশী হতাহত হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে দেখা গেছে, দীর্ঘ সীমান্তের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে বাংলাদেশী নাগরিকরা বিএসএফ-এর হত্যা-নির্যাতনের শিকার না হয়েছে এবং না হচ্ছে। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি রিপোর্টের পরিসংখ্যানও চমকে দেয়ার মতো। এতে জানানো হয়েছে, গত এক দশকে বিএসএফ প্রায় নয়শ' বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।  আহতদের সংখ্যা এক হাজারের বেশি।  আপত্তির কারণ হলো, চাষাবাদ করার বা গরু-ছাগলকে ঘাস খাওয়ানোর মতো কোনো প্রয়োজনে সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের জমিতে গেলেও বাংলাদেশীরা বিএসএফ-এর গুলীর শিকার হচ্ছে। একই বিএসএফ কিন্তু চোরাচালানীদের কিছুই বলছে না। গুলী করা দূরে থাকুক, বিএসএফ-এর জওয়ানরা চোরাচালানীদের উল্টো প্রশ্রয় দিচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতাও করছে। এর ফলে চোরাচালান শুধু বাড়ছেই। বড়কথা, ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আসছে নানা ধরনের নেশার সামগ্রী। আসছে নানা রকমের হাজার হাজার অস্ত্রও। অন্য একটি জাতীয় দৈনিকের এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মনিপুর ও ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তসংলগ্ন এলাকাজুড়ে নেশা সামগ্রীর অসংখ্য কারখানা গড়ে উঠেছে। যশোর-কুষ্টিয়া থেকে সিলেট ও কুমিল্লা পর্যন্ত দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন ভারতীয় এলাকায় রীতিমতো হাট বসছে প্রতিদিন। বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে। বস্তা বোঝাই করে অস্ত্র ও নেশার সামগ্রী বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে আসছে চোরাচালানীরা। তারপর সেগুলো চলে যাচ্ছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। সবই ঘটছে বিএসএফ-এর চোখের সামনে। কোথাও তারা দেখেও না দেখার ভান করছে, কোথাও আবার তারাই সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে সাবেক বিডিআর তথা বর্তমান বিজিবির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। লোকবল কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বিজিবি চোরাচালান ঠেকাতে পারছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারাও নাকি রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে, হয়তো ক্ষমতাসীনদের গোপন ইঙ্গিত রয়েছে বলেই! ফলে বাধাহীনভাবেই তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে চোরাচালানীরা। এ অবস্থার সুযোগও আবার বিএসএফই নিচ্ছে। ফেলানীর মতো কিশোরীর পাশাপাশি অসংখ্য নিরীহ বাংলাদেশীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেও বিএসএফ ‘উদারতা' দেখাচ্ছে চোরাচালানীদের ব্যাপারে। এই ‘উদারতা'র কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানোর দরকার পড়ে না। উদ্বেগের বিষয় হলো, পেছনে রাষ্ট্রের তথা ভারত সরকারের গোপন অনুমোদন ও প্ররোচনা না থাকলে এমন একটি ধ্বংসাত্মক নীতি অনুসরণ করা এবং হত্যা-নির্যাতনের কর্মকান্ড শুধু বিএসএফ-এর পক্ষে চালানো সম্ভব হতে পারে না। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, প্রকৃতপক্ষে ভারতই একদিকে নিরীহ বাংলাদেশীদের প্রাণে মারছে অন্যদিকে বাংলাদেশের যুব সমাজকে নেশায় আসক্ত করার এবং সন্ত্রাসী বানানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে উঠেছে। এর ফলে বাংলাদেশীরাই শুধু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে না, দেশের যুব সমাজের মধ্যেও নেশার সামগ্রী ছড়িয়ে পড়ছে। তারা মাদকাসক্ত হচ্ছে, একযোগে অস্ত্র চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের হাতে। সহজে অস্ত্র পাওয়ায় তরুণ-যুবকদের একটি অংশও হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা মনে করি, বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া দরকার। কারণ, তথাকথিত বিদ্রোহের আড়ালে সংঘটিত পিলখানা হত্যাকান্ডকে অজুহাত বানিয়ে দেশপ্রেমিক বিডিআরকে প্রকারান্তরে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। বিজিবির মধ্যে সাবেক বিডিআর-এর মতো কঠিন মনোবল আর নেই। তার ওপর রয়েছে লোকবল ও অস্ত্রশস্ত্রের স্বল্পতা। ফলে চাইলেও বিজিবির পক্ষে এত দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে চোরাচালান প্রতিহত করা এবং বাংলাদেশীদের জীবন বাঁচানো সম্ভব নয়। প্রসঙ্গক্রমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর কথাও উল্লেখ করা দরকার। কারণ, ভারত থেকে অবৈধ পথে আসছে বলেই বাংলাদেশে উৎপাদিত কোনো পণ্য প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সকল পণ্য বরং বাজার হারাচ্ছে। ফলে লোকসান গুণতে গিয়ে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জাতীয় পুঁজির বিকাশও ঘটতে পারছে না। অথচ দেশীয় পণ্য বাজার না পেলে এবং জাতীয় পুঁজির বিকাশ না ঘটলে কোনো দেশই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না। এ সত্য প্রতিষ্ঠিতও হয়েছে যে, মূলত ভারতীয় পণ্যের প্রবল দাপটের কারণে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কোনো শিল্পেরই সুষ্ঠু বিকাশ ঘটতে পারেনি। এ অবস্থা চলছে স্বাধীনতার পর থেকেই। পেছনে ভারত সরকারের প্রশ্রয় রয়েছে বলে কখনো কখনো ঘটনাক্রমিক অভিযান চালানো হলেও চোরাচালান একেবারে বন্ধ বা প্রতিহত করা যায়নি। আমরা মনে করি, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সরকারের উচিত সীমান্তে বিজিবির প্রহরা জোরদার করা এবং বিএসএফ-এর হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করার পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিহত করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। এ উদ্দেশ্যে বিজিবির লোকবল বাড়াতে হবে, এর জওয়ানদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিতে হবে। সীমান্তে একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকেও মোতায়েন করা দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার সরকারি পর্যায়ে চোরাচালান বিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়া। কারণ, এই অভিযোগ রয়েছে যে, সরকারের মধ্যে ভারতকে ‘বন্ধুরাষ্ট্র' হিসেবে মাথায় রাখার মতো লোকজনের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে বলেই বিএসএফ-এর হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করার এবং চোরাচালান প্রতিহত করার চিন্তা পর্যন্ত করা হচ্ছে না। এমন মনোভাবের সুযোগও বিএসএফই নিচ্ছে। নিরীহ বাংলাদেশীদের ওপর গুলী চালালেও চোরাচালানীদের বেলায় বিএসএফ ‘সন্ন্যাসব্রত' পালন করছে। আমরা আশা করতে চাই, অনেক হয়েছে, সরকার এবার একটু নড়েচড়ে উঠবে এবং বিজিবির মাধ্যমে চেষ্টা  চালানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়েও ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। আমরা চাই, আর কোনো নিরীহ বাংলাদেশীকে যাতে বিএসএফ-এর গুলীতে প্রাণ হারাতে না হয়, ফেলানীর মতো আর কোনো কিশোরীকে যাতে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকতে না হয়। বলা বাহুল্য, এমন অবস্থা নিশ্চিত করাই যে কোনো দেশের নির্বাচিত সরকারের প্রধান কর্তব্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ