ঢাকা, মঙ্গলবার 18 December 2012, ৪ পৌষ ১৪১৯, ৪ সফর ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু নির্যাতন বন্ধে সোচ্চার হতে হবে সবাইকে

শবনম আয়শা মুস্তারী : ১০ বছরের সালাম মিরপুরের একটি বাড়িতে কাজ নিয়েছে মাস পাঁচেক আগে। ওই বাড়ি থেকে প্রায়ই কান্না ও চিৎকারের শব্দ শুনে প্রতিবেশী পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ অর্ধমৃত সালামকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালে ছেলের শয্যাপাশে উপস্থিত সালামের মা জানান, সোনার অলঙ্কার চুরির অভিযোগে তার ছেলেকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। অভাবের কারণে তিনি তার ছেলেকে ঐ বাসায় কাজে পাঠিয়েছিলেন। অথচ এই পাঁচ মাসে একবারও সালামের সঙ্গে তাদেরকে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি।

সালামের মতো অমানুষিক নির্যাতনের শিকার তারই সমবয়সী রাজিয়া খাতুন। বাসাবোর এক বাসায় কাজ নিয়েছিল সে। কাজে দেরি হওয়ার কারণে গালাগালের পাশাপাশি তাকে মারধর করা হতো।

কাজের খোঁজে রাজধানীতে এসেছে আয়েশা বেগম (১৩)। মহাখালীতে এক বাসায় সে গৃহকর্মীর কাজ পেয়ে যায়। কিছুদিন যাওয়ার পর স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে বাসার গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয় সে। এর পর থেকে গৃহকর্তার দ্বারা প্রায়ই সে ধর্ষিত হতে থাকে। একসময় আয়েশা গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে চরিত্রহীন অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। আয়েশা কামরাঙ্গীরচরে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেয় এবং কিছুদিন পর একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। নবজাতককে নিয়ে আয়েশা মহাখালীর ঐ বাসায় গেলে তাকে আবারো নির্যাতন করা হয়।

সালাম, রাজিয়া ও আয়েশার মতো এমন অনেক শিশু গৃহকর্মী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শহরে বা গ্রামে বাসাবাড়িতে কাজ করে এমন শিশুদের ওপর নির্যাতনের হার বেড়ে চলছে আশঙ্কাজনকভাবে।

সাধারণত ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের গৃহকর্মে নিযুক্ত হওয়ার হার বেশি। তবে পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সীদেরকেও এ কাজে দেখা যায়। শিশু গৃহকর্মীদের ওপর এক জরিপে দেখা গেছে, এ কাজে ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সীরা রয়েছে শতকরা ৩৮ ভাগ, পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সীরা রয়েছে ২৪ ভাগ।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গৃহকর্মী হিসেবে শিশুশ্রমের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অগোচরে থেকে যাচ্ছে। এইসব শিশুদের শ্রম ও জীবন সংশ্লিষ্ট বাড়ির লোকজনের ওপর নির্ভর করে। কত সংখ্যক শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত তার সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এ ধরনের বাসাবাড়ির কাজে তাদেরকে ২৪ ঘণ্টাই শ্রম দিতে হচ্ছে। শিশুরা এই কাজে নিয়োজিত থাকার সময়ে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। কাউকে কাউকে এমন কাজে নিয়োজিত করা হয় যা তাদের বয়স ও শারীরিক ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার কেউ কাজে পারদর্শিতার অভাব, যথাসময়ে কাজ শেষ না করায় বা ভুল কোন কাজ করে ফেললে তার কপালে জোটে অকথ্য গালিগালাজ ও শারীরিক নির্যাতন। এছাড়া এসব শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনার ঝুঁকিতে থাকে সর্বাধিক।

ইউনিসেফ কর্তৃক প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গৃহকর্মে নিয়োজিত ৪৫ শতাংশ শিশুকে তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য পরিশোধ করা হয় না। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্টাটিস্টিকস-এর ২০০৩ সালের জানুয়ারির এক জরিপে বলা হয়, চার কোটি ২৫ লাখ শিশুর মধ্যে ৮০ লাখ শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত যাদের বয়স ৫-১৭ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে ২০ লাখের মতো শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত এবং বেশিরভাগই কন্যাশিশু। খুব অল্প পারিশ্রমিকে এই শিশুদেরকে জোর করে কাজে খাটানো হয়।

এদিকে ১৯৯১ সালে ১৪০ জন ভাসমান শিশু যৌনকর্মীদের নিয়ে জরিপ করে এনজিও শৈশব জানায়, এই শিশুদের মধ্যে ১০০ জন আগে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করত। এ সময় তারা কোন কোন সময় শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি বাড়ির পুরুষ সদস্য কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই শিশুদেরকে তাদের পরিবার গ্রহণ না করায় শেষ পর্যন্ত তারা যৌনকর্মীর জীবন বেছে নিয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী পরিষদের নির্বাহী পরিচালক সালামা আলী জানান, নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত প্রায় প্রতিটি পরিবারে কমপক্ষে একজন করে গৃহকর্মী রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব গৃহকর্মী দাসদের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও দাসপ্রথা এখন বিশ্বের কোথাও নেই। আইনজীবীদের মতো দেশে শিশুশ্রমবিরোধী আইন থাকলেও তার প্রয়োগ তেমন একটা দেখা যায় না বা এই আইন দিয়ে এ ধরনের শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রতিহতও করা যায় না।

আমাদের দেশে অনেক সংগঠন আছে যারা শিশু নির্যাতন রোধ ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে থাকে এবং এই ইস্যু নিয়ে তারা বিভিন্ন পরামর্শ ও মতামত দিয়ে থাকে। তাদের এ সম্পর্কিত বক্তব্য ও পরামর্শগুলো গণমাধ্যমেও প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে সমাজের ও ধর্মীয় নেতাদের অবহিত করা, জনমনে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলা যায়। এছাড়া শিশু নির্যাতন রোধে অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান ও প্রয়োজনে কার্যকর আইন প্রণয়নের স্বপক্ষে সংগঠনগুলো সোচ্চার। তবে এ ব্যাপারে সরকারের কার্যকর ভূমিকা শিশু নির্যাতন অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। -পিআইবি ফিচার

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ