ঢাকা, বুধবার 9 January 2013, ২৬ পৌষ ১৪১৯, ২৬ সফর ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

ইয়াসমিনদের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে নারীবাদীদের মুখে কুলুপ

0 ওয়াদা রাখেনি বর্তমান সরকার

0 ১৭ বছরেও চাকরি পায়নি ইয়াসমিনের মা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ‘ইয়াসমিন' ১৯৯৫ সালের আলোচিত এক চরিত্র। ওই বছরের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে পুলিশ সদস্যরা ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে। এ ঘটনায় দেশ ও বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। পুলিশ হেফাজতে ধর্ষিতা ইয়াসমিনকে নিয়ে সে সময় রাজনীতি হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ইয়াসমিন ইস্যুতে হরতাল, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, সংঘাত-সংঘর্ষের পথ বেছে নেয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচিকে স্বাগত জানায় নারীবাদী সংগঠনগুলো। তারাও বিভিন্ন ব্যানারে তখন ছিল সোচ্চার। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানামুখী তৎপরতা-অপতৎপরতা চালানো হয়। ১৭ বছর পর টাঙ্গাইলের মধুপুরে ইয়াসমিনের মতো আলোচনার ঝড় তোলে স্কুল ছাত্রী গণধর্ষণের ঘটনাটি। গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঘটনাটি ঘটলেও নজরে আসে ৩য় সপ্তাহে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায়। কথিত নারীবাদীরা আজ নিশ্চুপ। সরকারও কথা বলছে না। এ সরকারের আমলে ইয়াসমিনের উত্তরসূরীর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আতঙ্কজনকভাবে বাড়ছে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা। দেশের আনাচে-কানাচে ঘটছে হাজার হাজার নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা। এসব ঘটনার শিকার নারীদের করুণ আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তুললেও তা যেন নারীবাদীরা শুনছে না। পর্যবেক্ষক মহলের প্রশ্ন বর্তমান আওয়ামী লীগ কি নারী বৈরী? তারা এখন নির্বিকার কেন?

ইয়াসমিন ধর্ষণ

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ভোরে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী হাছনা এন্টারপ্রাইজের একটি নৈশকোচের সুপারভাইজার দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে ইয়াসমিনকে নামিয়ে দেয়। আর এক চায়ের দোকানদারকে বলে দেয়, সকাল হলে কিশোরীটিকে যেন দিনাজপুর শহরগামী কোনো বাসে উঠিয়ে দেয়।

কিছুক্ষণ পরই পুলিশের একটি টহল দল পিকআপ ভ্যান নিয়ে সেখানে আসে। পুলিশ সদস্যরা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা ইয়াসমিনকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। এক পর্যায়ে দিনাজপুর শহরে তাকে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে তাকে ভ্যানে তুলে নেয় পুলিশ।

এরপর তারা দশমাইল সংলগ্ন সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতরে নিয়ে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রেখে চলে যায়। এ ঘটনায় দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ওঠে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি।

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ৩টি মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলাগুলোর বিচার কাজ ১শ ২৩ দিনে শেষ হয়। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ের ৮ বছর পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে মামলার অন্যতম আসামী এএসআই মইনুল হক, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তারকে রংপুর জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। অপর আসামী পিকআপভ্যান চালক অমৃত লাল বর্মনকে ২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে রংপুর জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। উপমহাদেশের ইতিহাসে দোষী পুলিশদের ফাঁসিতে মৃত্যু কার্যকরের ঘটনা এটাই প্রথম।

টাঙ্গাইলের ইয়াসমিন

গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে এক বিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নাম করে টাঙ্গাইলের স্কুল ছাত্রী ১৫ বছর বয়সী মেয়েটিকে তার বান্ধবী বীথি মধুপুরের পাহাড়ি এলাকার এক বাড়িতে নিয়ে যায়। আগে থেকে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা চারজনসহ কয়েকজন মেয়েটিকে বন্দী করে রেখে পরপর তিন দিন গণধর্ষণ করে। এরপর মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়লে অর্ধচেতন অবস্থায় ১০ ডিসেম্বর সোমবার তাকে সদর উপজেলার রসুলপুর এলাকায় রেললাইনের পাশে ফেলে রেখে যায় তারা। ওই দিনই তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ১২ ডিসেম্বর তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওখানে তিন দিন চিকিৎসা নেয়ার পর সে মামার বাড়ি যায়। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় তাকে আবারও টাঙ্গাইলে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে ২০ দিন পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। মানসিক ভারসাম্যহীন স্কুল ছাত্রীটি বর্তমানে এখানেই চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গণধর্ষণের সঙ্গে জড়িত মনিরুজ্জামান মনি, হারুনুর রশীদ, নুরুজ্জামান গেদা ও শাজাহান আলীকে রিমান্ড শেষে গত ৬ জানুয়ারি রোববার দুপুরে টাঙ্গাইল জেলহাজতে পাঠিয়েছে মধুপুর থানা পুলিশ। ধর্ষণকারী চারজনের তিন দিনের রিমান্ড শনিবার শেষ হওয়ায় তাদের সরাসরি জেলহাজতে পাঠানো হয়।

মধুপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান জানান, গত সোমবার এ চারজন ও মেয়েটির বান্ধবী ঘটনার মূল হোতা বীথি আক্তারকে গ্রেফতার করে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। পরে মধুপুর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় তাদের। এরপর সাতদিন করে রিমান্ড চেয়ে বুধবার তাদের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত ওই চার ধর্ষকের তিন দিন করে এবং বীথির একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে শুক্রবার বীথিকে এবং ওই চারজনকে রোববার দুপুরে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

একের পর এক

টাঙ্গাইলের মধুপুরে স্কুল ছাত্রী কিশোরী (১৫) গণধর্ষণের শিকার হয় ৬ ডিসেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত চারদিন। অবস্থা বেগতিক দেখে পর দিন ১০ ডিসেম্বর হত্যার উদ্দেশ্যে রেললাইনে ফেলে রাখে ধর্ষকরা। ২০ দিন পর এ গণধর্ষণের খবর জানাজানির পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই একের পর এক ঘটতে থাকে ধর্ষণের ঘটনা। গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়ে থানায় মামলা করেন এক কর্মজীবী নারী (২২)। যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইল উত্তরপাড়া এলাকার ওই তরুণী নিউ মার্কেট থানা এলাকার ট্রপিক্যাল সেন্টারের দশম তলায় আলামিন ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট নামের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন।

গত ৫ জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহ আলী থানার ঝিলপাড় বস্তিতে স্কুল ছাত্রী চাঁদনীকে (১০) গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। পরদিন এ ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ করে এবং এক পর্যায়ে তারা থানা ঘেরাও করে। এ সময় হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল। নিহতের পিতা বাবুল মিয়া বাদী হয়ে থানায় ৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। চাঁদনী চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী ছিল।

গত ২৫ নবেম্বর সাভার পৌর এলাকায় ধর্ষণের শিকার হন এক কলেজ ছাত্রী। ওই দিন সকালে ওই ছাত্রীকে তার এক বান্ধবী কৌশলে পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনীর একটি মেসে নিয়ে যায়। সেখানে জাহেদ ওরফে রাজু তাকে ধর্ষণ করে। এ সময় তার বন্ধু শাহীন ধর্ষণের ভিডিও চিত্র ধারণ করে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা ওই দিন রাতেই সাভার মডেল থানায় মামলা করেন। এই ধর্ষণের সাথে জড়িত সবাই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর দানেশ নামের এক ছাত্র মেয়েটির মাকে ফোন করে ধর্ষণের দৃশ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করে। এরপরই ঘটনা জানাজানি হয়। বর্তমানে ওই কলেজ ছাত্রী ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। তার নাম জান্নাতুল ফেরদৌস (১৮)। বান্ধবীর নাম সুচি ওরফে লিজা। তারা সিংগাইর ডিগ্রী কলেজের একাদশ শ্রেণীর প্রথম বর্ষের ছাত্রী।

গত ৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার সোনাটিয়া গ্রামের এক প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষিতার ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে।

গত ২ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার চিংড়াখালী গ্রামে রাতের বেলায় ঘরে ঢুকে মা ও মেয়েকে গণধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে গৃহস্বামী আখতার হাওলাদারকে দুর্বৃত্তরা পিটিয়ে আহত করে পাশের একটি বাগানে নিয়ে বেঁধে রাখে।

এর আগে গত ১ জানুয়ারি মঙ্গলবার দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে গণধর্ষণের শিকার হন গৃহবধূ আঞ্জুয়ারা। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে ৩ জানুয়ারি। উল্লেখিত ঘটনাগুলো চলতি বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

বাংলাদেশের চিত্র :

১০ ডিসেম্বর, সকাল ৭টা। টাঙ্গাইলের রসুলপুর এলাকার রেললাইনে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রী। স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তির পর জানা গেল, তাকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এরপর কেটে গেছে ২০ দিন। হাসপাতালে এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে সে। এ অবস্থায় মা ছাড়া তার পাশে দাঁড়ায়নি কেউ-ই। ঘটনার জন্য মেয়েটিকে দায়ী করে নির্মম নির্যাতনের পর বাসা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন তার বাবা। এলাকার প্রভাবশালীরাও খারাপ মেয়ে আখ্যা দিয়ে তাকে সমাজচ্যুতির ঘোষণা দিয়েছেন। সে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলেও প্রকাশ্যে ঘুরছে ধর্ষণকারীরা। ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশও।

জানা গেছে, গত ৬ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের মেয়েটিকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে একটি বাসায় ৪ দিন আটকে রেখে গণধর্ষণ করে ৬-৭ জন যুবক। এর পরই মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ফেলে যায় রেললাইনে। প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু লোকচক্ষুর ভয়ে তাকে বাসায় নিয়ে যান মা। তখনই বাদ সাধেন বাবা। মেয়েটি এবং তার মাকে শারীরিক নির্যাতন করে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন। নিরুপায় মা মেয়েকে নিয়ে আবার হাসপাতালে হাজির হন। এলাকার প্রভাবশালীরা মেয়েটির মাকে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘চরিত্রহীন' মেয়েকে নিয়ে তিনি গ্রামে প্রবেশ করতে পারবেন না।

ভারতের চিত্র :

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নয়াদিল্লীতে যাত্রীবাহী বাসে গণধর্ষণের শিকার হন এক মেডিকেল ছাত্রী। টানা ১০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানেন এ ‘ভারতকন্যা'। তার এ মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ক্ষোভে উত্তাল ভারত। দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির রায় না হওয়া পর্যন্ত অনশনের ঘোষণা দিয়েছে তার পরিবার। ঘটনার প্রতিবাদে সরকার থেকে শুরু করে বিরোধী দল সবাই এক কাতারে। মেয়েটির মরদেহ গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া পান্ধী ছুটে যান এয়ারপোর্টে।

নির্যাতিত এ ভারতকন্যার পাশে দেশ এবং পরিবার দাঁড়ালেও বাংলাদেশে এ চিত্র উল্টো। এখানে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ  সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা চোখে পড়ে না। সচেতন মহলের মতে, ভারতের ঘটনা থেকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে বাংলাদেশকে। সব নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

এই মেয়েটির মতো বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত অনেকেই ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়লেও কেউই তাদের পাশে দাঁড়ায় না। এমনকি পরিবারগুলোও চায় ঘটনাটি আড়াল করতে। নারী নেত্রীদের মতে, বাংলাদেশে কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের ভয় এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে পরিবারই তথ্য গোপন করতে চায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃক্মখলা বাহিনীর সদসরা মেতে ওঠে ধর্ষণের শিকার নারীর চরিত্র হননে। আর মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয় এসব তথ্য। বাদ যায় না নির্যাতিতার নাম-ঠিকানাও। মানবাধিকারকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী ও আইনজীবীরা বলছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলেই ধর্ষণের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে সবার আগে ধর্ষিতাকে হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তারা।

পরিসংখ্যান :

চলতি বছরের ১ এপ্রিল রাজধানীর কাফরুল থানাধীন ইব্রাহিমপুরে ২ বছর ৪ মাস বয়সী এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ১ আগস্ট লৌহজংয়ে ধর্ষণের শিকার হয় এক বাক প্রতিবন্ধী। ওই দিনই ধর্ষিতার পরিবারকে হুমকি-ধামকি দিয়ে থানায় বসেই ঘটনার রফা করেন স্থানীয়  প্রভাবশালীরা।  ২৭ সেপ্টেম্বর রামগড়ে পৈশাচিকভাবে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় ধর্ষণ করা হয় ১২ বছরের এক শিশুকে। ২১ জুন মিরসরাইয়ে ৬ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ২ জুন রাজধানীর হাতিরপুলে নাহার প্লাজার ১৩তলায় ১৭ বছর বয়সী এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। তার ২৬ টুকরো লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। যা ছিল ২০১২ সালের নারী নির্যাতনের মধ্যে আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম। এমন হাজারো পৈশাচিক ঘটনা চোখে পড়ে প্রতিদিন প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যমগুলোতে।

জাতীয় মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের নবেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৭১১ জন নারŠ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৯ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮৯ জনকে। মহিলা পরিষদ বলছে, এ পরিসংখ্যান বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে সংগৃহীত। পত্রিকার পাতায় খুব কম ঘটনাই ওঠে আসে। ফরেনসিক পরীক্ষার ঝামেলা, আলামত সংগ্রহ এবং অভিযুক্তকে পুলিশের কাছে উপস্থিত হতে বাধ্য করায় অনেকেই লোকলজ্জায় ঘটনা এড়িয়ে যেতে চান। পত্রিকার পাতা থেকে কিছুটা অাঁচ করা যায় বাস্তবে এ চিত্র কতটা ভয়াবহ! ধর্ষণের শিকার হলেও বেশির ভাগ নারী বিচার চাইতে যান না। যেসব নারী বিচার চাইতে যান, তাদের পুলিশ, প্রশাসন, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যতেষ্ট হেনস্ত হতে হয়।

পুলিশ সদর দফতরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে ৩ সহস্রাধিক নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বছরের প্রথম ৬ মাসে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৮৬৯ জন। এদের মধ্যে ১৩ জনকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিহ্ন করতে পুড়িয়ে মারার মতো পৈশাচিক ঘটনাও রয়েছে। ২০১২ সালে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে ৯ শতাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭১১। ধর্ষণ ছাড়াও নারী নির্যাতনের ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যায় পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যানে। তাদের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১০ হাজার ২৯ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১১ সালে এর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৪৪।

মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান :

মহিলা পরিষদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ৬শ'র বেশি নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, আইন-শৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নির্যাতন, এসিড সন্ত্রাস, শ্লীলতাহানি ও আত্মহত্যার প্ররোচণাসহ বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতনের ঘটনা দেশে বেড়েই চলছে। ধর্ষণকারীরা ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, তা ভিডিও করে দোকানে দোকানে বিক্রি করছে অপরাধীরা। জাতীয় মহিলা পরিষদ গত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত নারী নির্যাতনের ঘটনার উপাত্ত তুলে ধরে। এতে বলা হয়েছে ক্ষমাসীন সরকারের এ এক বছরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ৫ হাজার ৬শ ১৬টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে ধর্ষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে ধর্ষণ এবং গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার নারী। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৬৬ জন, আইন-শৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার ৯ জন নারী, আত্মহত্যার প্ররোচণার শিকার অর্ধশত নারী। আত্মহত্যা করেছে সাড়ে ৪শ' এবং ইভটিজিংয়ের শিকার সাড়ে ৬শ'। একই সঙ্গে খুন হয়েছে ৯শ' নারী এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার ১০৬ জন নারী। নারী ও শিশু পাচার ১৯ জন, ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন প্রায় ২০ জন নারী। এছাড়া যৌতুকের জন্য, পারিবারিক সহিংসতাসহ বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে।

অভিমত :

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, আমাদের সমাজে ধর্ষিতার দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। ধর্ষণের মতো বর্বর সহিংসতার শিকার হয়ে আরও নির্মম পরিস্থিতিতে পড়েন তারা বিচার চাইতে গিয়ে। ধর্ষণ প্রমাণের নামে মেয়েটিকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করা হয়। হাসপাতাল থেকে কোর্ট প্রতিটি স্তরে সে বারবার ধর্ষিত হয়। তাছাড়া মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে হাল ছেড়ে দেন। ধর্ষণসহ সব নারী নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, আইন-শৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। একই সঙ্গে থাকতে হবে সম্মিলিত প্রতিবাদ প্রতিরোধ। পত্রিকার পাতা খুললে প্রতিদিনই চোখে পড়ে এক একটি লোমহর্ষক ঘটনা। এক বছরের শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউই রেহাই পায় না নরপশুদের পৈশাচিক তান্ডব থেকে। মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ধর্ষণ অপরাধ সারা বিশ্বেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দিল্লীর ঘটনার প্রতিবাদে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেভাবে মানুষ রাস্তায় নেমেছে; তাতে সরকার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের নেতানেত্রী সবাই এ ঘটনার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন; বিচার দাবি করেছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। আমরাও যদি সবাই মিলে ধর্ষণ নামক বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারি তবেই জাতি এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন বলেন, দিল্লীর ঘটনায় দলমত নির্বিশেষে সবাই প্রতিবাদী। আমাদের দেশে এমনটা হয় না। উল্টো রাজনৈতিক শক্তি থানাকে প্রভাবিত করে, ভিকটিমের বাবা-মাকে প্রভাবিত করে ঘটনা চাপা দিতে চায়। রাষ্ট্র যদি ধর্ষিতার পক্ষে না দাঁড়ায়, আইন যদি তার কলুষতা থেকে মুক্ত হতে না পারে, তাহলে সমাজে এ ধরনের ঘটনা বাড়বেই। প্রশাসনকে অবশ্যই ধর্ষিতার পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। যে কোনো ধর্ষণের ঘটনার পর মিডিয়ায় সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন; মন্তব্য করে তিনি বলেন, ধর্ষিতা নয়, ধর্ষকের ছবি বড় করে ছাপিয়ে তাকে সামাজিকভাবে বর্জন করা উচিত।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ধর্ষণের মামলা বিচার করার জন্য আদালতে ক্যামেরা ট্রায়ালের কথা বলা থাকলেও নারী ভিকটিমদের ক্ষেত্রে এটি ঘটছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিভিন্ন ধরনের আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে ইয়াসমিন ধর্ষণের পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সারাদেশে। আন্দোলনের মুখে অপরাধীদের গ্রেফতার এবং শাস্তি নিশ্চিত করে প্রশাসন। এরপর ১৯৯৮ সালে শিশু তানিয়া ধর্ষণের ঘটনারও প্রতিবাদ হয়েছিল। কিছুদিন আলোচনায় থেকে তা আড়ালে চলে যায়। এরপর ধর্ষণের আর কোনো ঘটনায় জোরালো প্রতিবাদ হয়নি।

ধর্ষকদের বিচার হোক প্রকাশ্যে : বাংলানিউজের লাইফ স্টাইল এডিটর শারমীনা ইসলাম। গত ৫ জানুয়ারি তার এক নিবন্ধের শিরোনাম ছিল এটি। এতে বলা হয়, নারী একজন মা, এক বোন কারও বা প্রেমিকা। এইতো সম্পর্ক না পুরুষের সঙ্গে? যেখানে থাকে শুধু ভালোবাসা, নির্ভরতা আর নিরাপত্তা। তাই যদি হয়, তবে কারা এই ধর্ষক? ওদের কোনো পরিচয় নেই। তারা কারও ভাই বা সন্তান হতে পারে না। টাঙ্গাইল বা মানিকগঞ্জে কি দেখছি আমরা? এভাবে আর কতোদিন নির্যাতিতা হতে হবে আমাদের মেয়েদের। কবে সচেতন হবো আমরা, শ্রদ্ধা করতে শিখবো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির। সেই ধর্ষকদের কেন একবারও মনে হয় না, তার প্রিয় বোনটির সঙ্গেও হতে পারে এমন কোনো অত্যাচার?

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আমরা নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছি নতুন স্বপ্ন পূরণের জন্য এখন সময় এগিয়ে যাওয়ার যেখানে প্রতিটি ঘরের কাজ থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস-আদালত, পোশাক, শিল্প কারখানায় পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করছে নারী। সংসারে আর জাতীয় অর্থনীতিতে সমানভাবে অবদান রাখছি আমরা, সেই নারীর প্রতি এতো সহিংসতা-নির্যাতন কেন?

যে দেশের প্রধানমন্ত্রী-বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী সে দেশে আজ ২০১৩ সালে এসেও মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার কেন শুধু নারী? কদিন পরপরই আমাদের দেখতে হয় পুরুষের লোভের শিকার নারী, যৌতুকের শিকার নারী, নির্যাতনের শিকার নারী, হত্যার শিকার নারী এ আমরা কোথায় আছি?

এতে প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? এই অবস্থার সমাধান কী? মাত্র কয়েকজন নরপশুর জন্য কেন আমাদের বিশ্বাস নষ্ট হবে, কেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবো আমরা? এসব নরপশুদের বিচার করা হোক প্রকাশ্যে, জনগণের সামনে, খোলা মাঠে। যেন মানবতাহীন অন্যদের মধ্যে সেই পশুপ্রবৃত্তি জেগে ওঠার আগে ভীতি কাজ করে।

ধর্ষকের পক্ষে না লড়ার আহবান : ধর্ষকের পক্ষে মামলা না লড়ার জন্য আইনজীবীদের আহবান জানিয়ে বরিশালে মানববন্ধন হয়েছে। গত শনিবার সকালে স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠন ‘জাতীয় শিশু নির্যাতন কমিটি' নগরীর অশ্বিণী কুমার হলের সামনে এ মানববন্ধন করে। টাঙ্গাইলে শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদ এবং ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। মানববন্ধন থেকে ধর্ষকের পক্ষে মামলা না লড়ার জন্য আইনজীবীদের আহবান জানানো হয়।

চাকরি পাননি ইয়াসমিনের মা :

১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন ধর্ষণের পর তার মৃত্যু ঘটে। এনিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুর সফর করেন। তিনি ইয়াসমিনের মা শরীফা বেগমকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, ক্ষমতায় গেলে এর বিচার হবে। চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এরপর '৯৬তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে  চলমান বিচারের প্রক্রিয়াকে শেষ করে জড়িত তিনজনকে ফাঁসি দেয়। কিন্তু চাকরি দেয়ার ওয়াদা ভুলে থাকে। পুনরায় ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। চার বছর শেষ হয়েছে সরকারের। এ পর্যন্ত ব্যবস্থা হয়নি ইয়াসমিনের মায়ের চাকরি। হয়নি ওয়াদা রক্ষাও। দফায় দফায় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের শরণাপন্ন হয়েও কোনো বিহীত ঘটেনি শরিফার জীবনে। তার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী তাকে ফেরাবেন না। চাকরি দেবেন। গত ৩ জানুয়ারি কথা হয় তার সাথে।

এ সময় তিনি জানান, প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চাকরি চেয়ে এখনো পাননি দিনাজপুরে পুলিশ হেফাজতে (!) ধর্ষিত কিশোরী ইয়াসমিনের মা শরীফা বেগম। তাই চাকরির বিষয়টি আরেকবার প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করে দিয়েছেন তিনি।

শরীফা এখনো বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে ফেরাবেন না, একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেনই। আকুল হয়ে বলেন, চাকরি কি আমারে দেবে না তারা? প্রধানমন্ত্রীরে আরেকটু মনে করায়া দিলে হইতো না? তারতো মেলা কাজ। মনে রাইখতে পারেনি হয়তো। আমার মনে খুব কয়, তিনি আমারে ফেরাইবে না। দিল্লীতে গণধর্ষণের শিকার মেডিকেল ছাত্রীর মৃত্যুর খবরে সারা বিশ্ব যখন শোকে মূহ্যমান, তখন অনেক বাংলাদেশীরই মনে পড়ে গেছে নিজেদের মেয়ে ইয়াসমিনের কথা। তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এভাবেই শরীয়া বেগম নিজের আর্জিটা আবারও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর আগেও চাকরির আবেদন রেখেছিলেন শরীপা বেগম। দিনাজপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) জামাল উদ্দিন আহমেদ এই আবেদনের কারণে শরীফাকে ডেকে নেন এবং চাকরির আশ্বাসও দেন। কিন্তু শরীফার ভাগ্যে এখনো সেই আরাধ্য চাকরিটির সন্ধ্যান মেলেনি।

কুশল জানতে চাইলে শরীপা এক বুক কষ্ট বয়ে বেড়ানো দুঃখের ঝাঁপি খুলে বসেন। শরীফা বলতে থাকেন, ওরাতো চাকরি দিলো না। সরকারিভাবে যে কুনো খোঁজ-খবর... কুনোইতো পাই না। আর কুনো আশ্বাসও দিলো না, কিসসু দিলো না। এদিগে ডিসিও নাকি বদল হইসে, কি জানি কি হইবো। একটা অনুদানও যদি দেতো, তাইলেও বাড়িঘর থেইকা কিসু কইরে খেতি পাইরতাম।

কথা ফুরোয় না শরীফার, ‘এতোদিন হই গেলো, গোপাল এমপি (দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল) কিছুই করলো না, আমার মেয়ের জন্যইতো গদি পাইলো নাকি? এতো কিছু কইরা এহন আমার দিকে আর তাকায়াই দেখে না' কিছুটা বিস্মিত শরীফা, ‘এইটা কি! ওরা বাবে না, মেয়েলোগটা কি খাছসে, কিভাবে চলতিসে? কি করতিসে?'

জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেন তিনি, ‘সেই যে ডাইকা নিলো, আর কুনো খবর নাই। ডিসি, কমিশনার, কেউ কুনো খবর নিলো গো।' নিজের চেষ্টার কথাও বলেন শরীফা, ‘এইটার জন্য আমি দৌড়াদৌড়ি কইরসি, তাওতো কই, কুনো খবর নাই।' ‘শরীফাকে আবারও ধোঁকা খেতে হল' বলে অভিযোগ করেন তার স্বামী ডাবলু রহমান।

ডাবলু বলেন, ‘তারা আমাদের ডেকে নিল। চাকরির কথা দিলো। আমরাও খুশি হলাম। কিন্তু এরপর আর কুনো খবর নাই।' তিনি প্রশ্ন করেন, ‘চাকরি না দিলে কথা দিলো কেন? একটা দুঃখী মহিলার সঙ্গে তারা ধোঁকাবাজি কইরলো কেন?' তিনি বলেন, ‘খুব বড় কিচ্ছু না, হাসপাতালে বা কোনখানে আয়া পদে একটি চাকরি হইলেই দিন চলে যাবে আমার। দেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে আমার এই কষ্ট থাকে না। তারে সামনে পাইলে বলতাম- আমি ইয়াসমিনের মা, একটি চাকরির আমার খুব প্রয়োজন।' হতাশ কণ্ঠে আক্ষেপ আর আর্তি ফুটিয়ে বলেন, ‘ইয়াসমিনের মারা যাওয়ার পর অনেকে অনেক আশ্বাস দিয়েছিলেন। কোনোটাই পূরণ করা হয়নি। একটা চাকরি-বাকরি দিলে সংসারটা চলতো। কষ্ট করে চলি, বড় কষ্টে আছি...' বলে ফুঁপিয়ে থামলেন ইয়াসমিনের মা। কপোল গড়িয়ে অঝোর অশ্রুর বান ডাকলো দু'চোখে। একে তো মাঝেমধ্যেই চাগাড় দেয় সতেরো বছর আগে বুকের গহীনে তৈরি হওয়া মেয়ে হারানোর ক্ষত। তার ওপর সংসারের নিত্য টানাপড়েনও হরহামেশা ডোবায় হতাশার অন্ধকারে। সব হতাশা, আক্ষেপ আর অপ্রাপ্তির বেদনা যেন প্রত্যাশার আর্তি হয়ে রূপ নিলো অবিরাম জলের ধারায়। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে করুণ সুরে বললেন, ‘কেউ খবর নেয় না, মাগো। ছাওয়ালটাকে হারাইছি, তার ছবি দিয়ে কতো মানুষ ক্ষমতায় বসলো, আমারে আর কারো মনে পড়লো না। একটা চাকরির জন্যে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছি। মন্ত্রী, এমপি, টিএনও, ডিসি কারো কাছে যাওয়া বাদ দেইনি। কেউ দিলো না আমাকে একটা চাকরি। এজন্য কাগজপত্র বানিয়েছি। কিন্তু চাকরি আর হয় না আমার।

ফের একটু জিরিয়ে বললেন, ‘স্বামী খুব খেটে সব মিলিয়ে হাজার পাঁচেক টাকা ঘরে আনতে পারে। এটা দিয়ে এই বাজারে সংসার তো চলে না।'

শহরের দশ মাইল মোড়ে ইয়াসমিন সরণিতে নির্মিত ইয়াসমিন স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে বেশ কষ্ট আছে এ মায়ের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে বা তার পরিবারের কাউকেই যেতে বলা হয়নি বলে জানালেন শরীফা। এরপর কথার বোমা ফাটালেন শরীফা বেগম। বললেন, ‘ইয়াসমিনের ছবি বলে যে ছবিটা স্তম্ভে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা ইয়াসমিনের নয়, কাল্পনিক।' এ সময় শরীফার পাশেই ছিলেন তার স্বামী ডাবলু রহমান। স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে বললেন, ‘ওই ছবিটা ইয়াসমিনের নয়।'

অভিযোগের সুরে তিনি আরো বললেন, ‘ইয়াসমিনের ছবি ইচ্ছামতো সবাই ব্যবহার করছ, এ ঘটনাকে ইস্যু বানাচ্ছে। দলের লোকজন, মহিলা সংস্থাগুলো ইয়াসমিনের ছবি দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। কিন্তু ইয়াসমিনের মাকে কেউ দেখতেও আসে না।'

ইয়াসমিনের একটিমাত্র ছবিই শরীফার কাছে আছে এখন। সেটাতেই তিনি সযতনে হাত বোলাচ্ছেন বারবার। স্মৃতির পাতা হাতড়ে বললেন, ‘ইয়াসমিনের পড়ার নেশা ছিলো খুব। তার ব্রেইন খুব ভালো ছিলো। পড়া বন্ধ করে যেন না দেই মাস্টাররা তা বারবারই সাবধান করতো।'

একটু থেমে ফের বলেন, ‘ইয়াসমিন বেঁচে থাকলে এখন নিশ্চয়ই আপনাদের বয়সী হতো, পড়ালেখা করে বড় কিছু হতো। কিন্তু আমার ছাওয়ালটারে কি ভুলে যে চলে যেতে হলো, কি পাপ সে করেছিলো যে, সব শেষ হয়ে গেলো? তার বড় হওয়া দেখার কপাল হইলো নাগো আমার।' শরীফা জানান, ইয়াসমিনের মৃত্যু দিবসগুলোতে তিনি নিজেই মিলাদ পড়ানোর ব্যবস্থা করেন, কবরটা জিয়ারত করে আসেন। প্রতিবেশীরা খোঁজখবর নেয়, কিন্তু কোনো মন্ত্রী-এমপি বা বড় কেউ কোনো সাহায্য নিয়ে আসে না। আকুতিভরা কণ্ঠে শরীফা বলেন, ‘একটু সম্মান চাই, খেয়ে-পরে বাঁচতে চাই, আর কোনো চাওয়া নাই কারো কাছে আমার। যা হারানোর তা তো হারাইছি।'

খালেদা জিয়ার দেয়া একলাখ টাকা দিয়ে সাত শতক জায়গা কিনেছিলেন শরীফা। তাতেই এখনকার এ বাড়ি, ঘুরে দেখালেন শরীফা। ছোট ছোট তিন কামরার বাড়ি, সঙ্গে শৌচাগার-গোসলখানা। পেছনের খালি জায়গাটিতে ২শ' টাকা দিয়ে চারটি লিচু চারা কিনে লাগিয়েছিলেন শরীফা। প্রতিবচর এগুলো থেকে হাজার চারেক টাকার লিচু বিক্রি করতে পারেন তিনি। আরো বললেন, ‘কাঁঠাল গাছটিতে এবার তিনটি কাঁঠাল ধরেছিলো। নিজেরাই খাইছি। আম গাছ এখনো বড় হয়নি। আমও ধরে নাই।' আগামী দিনের জন্য কিছু পরিকল্পনাও আছে তার। টাকা-পয়সা হাতে এলে বাড়ির খোলা জায়গায় ঘর তুলে ভাড়া দেবেন। তখন একটা নিশ্চিত আয়ের পথ হবে।

শরীফা বেগম জানান, ইয়াসমিন মারা যাওয়ার পর এডিসি ছয় হাজার টাকা দিয়েছিলেন, একজন মানুষ মায়া করে দিলেন ৫শ' টাকা, বনবিভাগ গাছ দিলোছিলো, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা, আর পাওয়া গেলো একটা রিকশা। মহাজন ঠকায় দেখে রিকশাটি পরে বেচে দিলেন শরীফা। তিনি বলেন, ‘সে সময় সবাই আপন সেজে আমার এসব টাকা পয়সা খেতে চেয়েছিলো। টাকা ধার চেয়েছিলো। নিজেকে শক্ত রেখে এগুলো রক্ষা করেছি। নইলে দাঁড়ানোর জায়গা পেতাম না' বারবার একটি চাকরির আকুতিই জানাতে থাকেন শরীফা। ইয়াসমিনের ছোট ভাই ১৩ বছরের শফিকুল ইসলাম এখন ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করে। আয় এতো কম যে, মাকে কিছুই দিতে পারে না। আর শরীফার এ সংসারের সন্তান ১০ বছরের শাহীনুর রহমান সোহান পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ছে। তার পড়ার খরচও বাড়ছে। মরিয়া কণ্ঠে জানান শরীফা, ‘একটু স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতে ন্যূনতম বেতনের একটি চাকরি হলেই চলবে।'

রামনগর এলাকার শরীফা বেগমের মেয়ে ইয়াসমিন ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসের টিকিট না পেয়ে সে ঠাকুরগাঁওগামী অপর একটি বাসে ওঠে। পরদিন ভোরে ওই বাসের সুপারভাইজার দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে একজন দোকানদারের জিম্মায় ইয়াসমিনকে দিনাজপুরগামী বাসে উঠিয়ে দেয়ার জন্য তাকে নামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে কোতোয়ালী পুলিশের টহল দল ইয়াসমিনকে শহরের রামনগরে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পিকআপে তুলে নেয়। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা পথে ইয়াসমিনকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেন। সকালে দিনাজপুর দশমাইল মহাসড়কের ধারে ব্র্যাক কার্যালয়ের সামনে ইয়াসমিনের লাশ পাওয়া যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ