ঢাকা, শনিবার 23 March 2013, ৯ চৈত্র ১৪১৯, ১০ জমাদিউল আউয়াল১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

আইভী রহমানের কবরেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাষ্ট্রপতি মরহুম মোঃ জিল্লুর রহমান

 

স্টাফ রিপোর্টার: প্রিয়তমা সহধার্মিনী আইভী রহমানের কবরেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাষ্ট্রপতি মরহুম মোঃ জিজিল্লুর রহমান। গতকাল বিকেল ৪টায় বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রপতির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে বাদ জুমা জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতির শেষ নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ভৈরবে রাষ্ট্রপতি জিজিল্লুর রহমানের প্রথম নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়  গতকাল সকাল ১০টা ৭ মিনিটে।

 জাতীয় ঈদগাহে জানাযা শেষে রাষ্ট্রপতির লাশ নিয়ে বনানী কবরস্থানের দিকে রওনা হয় ফুলে ফুলে সাজানো সেনাবাহিনীর একটি পিকআপ। বনানীর পথে গুলশানে জিল্লুর রহমানের নিজের বাড়ি ‘আইভিস লিগেসি’তে কিছু সময় রাখা হয় তার কফিন। বিকেল সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রপতির লাশ বনানী কবরস্থানে পৌঁছলে মেজর জেনারেল বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার দশজন সেনা কর্মকর্তা কাঁধে করে কফিন কবরের পাশে নিয়ে যান। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদসহ মন্ত্রিসভার সদস্য এবং জিল্লুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সংক্ষিপ্ত জীবনী পড়ে শোনান একজন সেনা কর্মকর্তা।   

লাশ কবরে নামানোর আগে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সামরিক কায়দায় স্যালুট জানানো হয় রাষ্ট্রপতিকে। ধর্মীয় রীতি মেনে লাশ কবরে নামানোর সময় সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ দল ২১ বার তোপধ্বনি করে গান স্যালুট প্রদান করেন।

রাষ্ট্রপতির ছেলে নাজমুল হাসান পাপন ও পরিবারের সদস্যরা জিল্লুর রহমানের লাশ  কবরে শোয়ানোর পর বিকেল ৪টার দিকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় । এ সময় সেনাবাহিনীর প্যারেড দল তিনবার শূন্যে গুলী ছুঁড়ে (ভলি ফায়ার) রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান জানায়। দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরচ হয় শ্রদ্ধা নিবেদন। প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এবং এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন রাষ্ট্রপতির  কবরে পুষ্পস্তক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম, সেনা প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব, বিমানবাহিনীর প্রধানের পক্ষে সহকারী বিমান বাহিনী প্রধান, কূটনৈতিক কোরের ডিন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, ডেপুটি স্পিকার, স্বরাষ্ট্র ও পরারাষ্ট্র মন্ত্রী এবং কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতের পক্ষে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্টের মরণোত্তর সালাম ও সশস্ত্র বাহিনীর স্যালুটের পর মরহুমের আত্মার শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়। সবশেষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের স্বীকৃতি হিসেবে জিল্লুর রহমানের স্বজনদের কাছে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন।

গতকাল শুক্রবার সকালে ভৈরবে  প্রথম জানাযার পর জিল্লুর রহমনের লাশ ঢাকায়  নিয়ে আসার পর দুপুরে এক ঘণ্টার জন্য রাষ্ট্রপতির লাশ বঙ্গভবনের দরবার হলে রাখা হয়। বিভিন্ন বন্ধু দেশের প্রতিনিধি,  কূটনীতিক ও বিদেশী অতিথিরা সেখানে জিল্লুর রহমানের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। 

এদিকে সকাল থেকেই দূর দূরান্ত থেকে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের নামাযে জানাযায় অংশ নিতে জাতীয় ঈদগাহে জড়ো হন। জানাযার আগে সেখানেই জুমার নামায আদায় করেন তারা।

জানাযার কারণে শাহবাগ মোড়, মিন্টো রোডের প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনের রাস্তা এবং পল্টন মোড় থেকে জাতীয় ঈদগাহমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তারপর ও হাজার হাজার মানুষকে পায়ে হেঁটে ঈদগাহ ময়দানের দিকে ছুঁটতে দেখা যায়।

বেলা ২টা ১২ মিনিটে রাষ্ট্রপতির লাশ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নিয়ে আসার পর  উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের সামনে বাবার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন রাষ্ট্রপতির ছেলে সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন।

এসময় তিনি বলেন, আপনারা আমার বাবার প্রতি যে ভালবাসা দেখিয়েছেন আমি এবং আমার পরিবার সারাজীবন আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। সারা দেশের মানুষ তার জন্য দোয়া করছেন। তিনি জেনে শুনে কারো সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করেননি। যদি মনের অজান্তে কাউকে দুঃখ দিয়ে থাকেন আমি তার পক্ষ থেকে সেজন্য আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

জানাযার নামাজ পড়ান বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। এর আগে রাষ্ট্রপতির জন্য দোয়া করা হয়।  

জানাযার নামাজে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরচল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির শীর্ষ নেতারা, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, বিকল্প ধারার মহাসচিব আব্দুল মান্নান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা জানাযায় অংশ নেন। নামাযে জানাযার পর সশস্ত্র বাহিনী ও ঢাকার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমানকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। 

ভৈরবে রাষ্ট্রপতির প্রথম নামাযে জানাযা

রাষ্ট্রপতি মরহুম মোঃ জিল্লুর রহমানের প্রথম নামাজে জানাযা তার জন্মস্থান ভৈরবে  গতকাল সকাল ১০টা ৭ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয়। হাজী আসমত আলী কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত এ জানাযায় শরীক হয় ভৈরবের লক্ষাধিক লোক।

জানাযায় ইমামতি করেন ভৈরব বড় মসজিদের ইমাম হাজী মোহাম্মদ জামালুদ্দিন হাফেজ। রাষ্ট্রপতির কফিনের সাথে তার ছেলে নাজমূল হাসান পাপন, এলজিআরডি মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী ভৈরবে আসেন। জানাযায় চীফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, সিলেট মেয়র বদরচদ্দিন আহমেদ কামরান, স্থানীয় এমপি, আওয়ামী লীগের ও বিএনপি স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য দলের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। ভৈরবের অসংখ্য লোক তাদের প্রিয় নেতা এম জিল্লুর রহমানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল। গত চার দশকে ভৈরবের এসব লোক তাদের ভোট দিয়ে জিল্লুর রহমানকে কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেন। জানাযা শুরচর আগে রাষ্ট্রপতির ছেলে নাজমুল হাসান পাপন উপস্থিত লক্ষাধিক লোকের কাছে তার পিতার জন্য দোয়া করতে বলেন। জানাযা শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে পৃথক গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

জানাযা শেষে হাফেজ মোহাম্মদ মুসা রাষ্ট্রপতির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করেন। এর আগে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমঘর থেকে রাষ্ট্রপতির কফিন  তেজগাঁও বিমান বন্দরে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টার ভৈরবের উদ্দেশে রওনা দেয়। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে হেলিকপ্টার ভৈরব স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। ফুলে ফুলে সজ্জিত ও জাতীয় পতাকাবাহী মোটরগাড়িতে করে রাষ্ট্রপতির কফিনটি হাজী আসমত আলী কলেজ মাঠে আনা হয়।

গত বুধবার বিকেলে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ বিমানে করে তার লাশ দেশে আনার পর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রপতির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। গতকাল শুক্রবার সকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে হয় তার প্রথম জানাযা।

এদিকে রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের কুলখানী আজ। এ উপলক্ষে বিকেলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ