ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 July 2013, ৩ শ্রাবণ ১৪২০, ৮ রমযান ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

তওবার রাজনীতির প্রবর্তক আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.

মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী : ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। বস্তুত: ঈমান, আমল ও ইহসানের সমন্বিত এক ব্যবস্থার নাম হচ্ছে দ্বীন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনব্যাপী ত্যাগ, সাধনা, কুরবানী ও শ্রম দানের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার সরাসরি পথ নির্দেশনার আলোকে যে সুমহান জামায়াত গড়ে তুলেছিলেন তা হচ্ছে সাহাবায়ে কেরাম। তারা হলেন হক ও হক্কানিয়াতের মাপকাঠি। তারা ছিলেন হিদায়েতের এমন উজ্জ্বল নক্ষত্র ও আলোকবর্তিকা যে, যে কেউ তাদের অনুসরণ করবে সে সঠিক পথের সন্ধান পেয়ে যাবে। রিযায়ে ইলাহীর সুউচ্চ শিখরে তাদের অধিষ্ঠান। হযরত সাহাবায়ে কেরামের পথ ধরে প্রজন্ম পরম্পরায় গড়ে উঠেছেন তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, মুজাদ্দিদীন, মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও সালেহীন তথা আসলাফ ও আকাবিরে উম্মতের এক সুমহান কাফেলা। ইসলাম এক চিরন্তন জীবনব্যবস্থা। কিয়ামত পর্যন্ত তা টিকে থাকবে। পৃথিবীতে আর কোন নবীর আগমন ঘটবে না। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগে যুগেই এমন কিছু মনীষী সৃষ্টি করেছেন, যারা ছিলেন হক ও হক্কানিয়াতের আলমবরদার বা পতাকাবাহী। তাঁরাই উম্মতকে দরদভরা উপদেশ ও পথ প্রদর্শন করেছেন। জার জার হয়ে কেঁদেছেন মানুষের কল্যাণ চিন্তায় সর্বদায়। মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধুময় বাণী। সেই আকাবিরে উম্মতের সুযোগ্য উত্তরসূরি ঈমানী আলোয় উজ্জীবিত এক মহান ব্যক্তিত্ব হলেন উপমহাদেশের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক আমীরে শরীয়ত মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ)।

মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ) একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি বিপ্লব, একটি আদর্শ এবং একটি জীবন্ত কাফেলার নাম। তিনি ১৮৯৫ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানাধীন লুধুয়া গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮ রমযান ১৪০৭ হিজরী ইন্তিকাল করেন। তিনি স্থানীয় মক্তব ও প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষা সমাপনের পর ভারতের পানিপথ মাদরাসায় সহীশুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীম শিক্ষা লাভ করেন এবং হেফজ শেষ করেন। অতঃপর ভারতের প্রসিদ্ধ মোজাহেরুল উলূম সাহরানপুর মাদরাসা ও বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে তিনি হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ, তর্কশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন। শিক্ষা সমাপনের পর ১৯১৮ সনে হাকীমুল উম্মত মোজাদ্দেদে মিল্লাত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ)-এর কাছে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং খেলাফত লাভ করেন।

দেশে ফিরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়ায় শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশব্যাপী ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করেন। অতঃপর ঢাকায় এসে আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী ও আব্দুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুরের সাথে বড়কাটারা আশরাফুল উলূম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) ঢাকার বিখ্যাত জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গীরচর, জামিয়া এমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, মাদরাসায়ে ইশাআতুল উলূম লুধূয়া, লক্ষ্মীপুরসহ সারা দেশে দু’শতাধিক দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) যে অবদান রেখে গেছেন তা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এসব মাদরাসা থেকে হাজার হাজার আলিমে দ্বীন বের হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামের বহুবিদ খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজপতি, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, শাসকবর্গসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণকে সংশোধনের দাওয়াত দিতেন এবং ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী সকলকে পরিচালিত হতে অনুপ্রাণিত করতেন।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খান, জিয়াউল হক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও  হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেনীর সাথে সাক্ষাত করেও হাফেজ্জী হুজুর (রহ) তাদেরকে ইসলাহ-সংশোধনের নছিহত করেন এবং স্বস্বদেশে মানবজাতির মুক্তির জন্য কুরআনের বিধান বাস্তবায়ন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে প্রায় সবাই হাফেজ্জী হুজুরকে একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জানতেন, চিনতেন সমীহ করতেন।

হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) ছিলেন এক বিশাল মহীরুহ। অনন্য ছিল তার প্রতিটি কর্ম। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ আলেম, শিক্ষক, সংস্কারক, পীর-মোর্শেদ, মুজাদ্দিদ, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, খাঁটি নায়েবে রাসূল। তার জীবনের অমর কীর্তি হচ্ছে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তওবার রাজনীতি, নির্বাচনী জিহাদ এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা। চিন্তা-চেতনার মৌলিকতায় হাফেজ্জী হুজুরের রাজনীতি ছিল এক ভিন্ন জিজ্ঞাসা, ভিন্ন অনুভূতির সঞ্চার। রাজনৈতিক ময়দানে কালজয়ী আদর্শ হিসেবে তার দরদমাখা আহ্বান সে দিন নবদিগন্তের দিশা দিয়েছিল।

বর্তমান বিশ্বে মুসলিম শাসকগণ তাদের মুসলিম পরিচয় অব্যাহত রেখে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলামী শাসনপদ্ধতি তথা কুরআনের সংবিধানকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার কায়েমি স্বার্থে দেশী অথবা বিদেশী প্রভু-সমর্থকদের খুশি করার লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছে। তাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি আসে না। এ কারণেই মানুষ আজ শান্তির খোঁজে ব্যতিব্যস্ত। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষ আজ দিশেহারা। মানবিক মর্যাদা আজ ক্ষমতাধরদের হিংস্র থাবায় ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। এহেন দুর্দিনে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) গোটা জাতিকে তওবা করে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত ও প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার প্রতি ফিরে আসার আহ্বান জানান। কারণ, আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন পৃথিবীতে সভ্যতা ও শান্তির কিছুই ছিল না, কল্যাণ রাষ্ট্রের ভাবনাও ছিল না, মানবাধিকার কি এটাও মানুষ জানতো না।

মোটকথা, ঘোর অন্ধকারে বাস করতো মানুষ, সেই পরিস্থিতিতেও আলোর দিশারী প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা সর্বাঙ্গীন মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। হযরত রাসূল (সা)- এর স্বহস্তে প্রতিষ্ঠিত কোরআন ও সুন্নাহর শাসন ব্যবস্থাই আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মানবতার মুক্তির জন্য, শান্তি ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনিই হতে পারেন একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ।

হাফেজ্জী হুজুর (রহ) সেই আদর্শ তথা দীন কায়েমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বহু গুণ ও অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। তিনি সবসময় উম্মাহকে নিয়ে চিন্তা করতেন। দেশ ও জাতির মুক্তির পথ রচনায় নিমগ্ন থাকতেন। এদেশে তার মতো মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব বিরল। তিনি মনে করতেন, আত্মশুদ্ধি তথা ব্যক্তি চরিত্র সংশোধন করতে পারলে ব্যক্তির দ্বারাই একদিন সমাজ ও রাষ্ট্র ভালো হবে। তার জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগ আমাদের জন্য অনুসরণীয়। এর মধ্যে কিছু কিছু দিক আছে যা আমাদের জন্য অনন্য পাথেয়। যার দীপ্তি আমাদেরকে বিস্মিত ও বিমুগ্ধ করে যুগ যুগ ধরে। তাই তিনি আমাদের জীবন্ত আদর্শ।

তিনি যে রাজনৈতিক দর্শন পেশ করে গেছেন- তা একদিকে যেমন বাস্তবধর্মী, অন্য দিকে তা মর্মস্পর্শীও। ইসলামই যে আমাদের গোটা জীবনের দিকদর্শন তার একটি প্রামাণ্য চিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন। মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগেই রয়েছে ইসলামের অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি স্পষ্ট করে গেছেন যে, পীরের খানকায় কালিমার যে দীক্ষা দেয়া হয় তা ব্যক্তিগত জীবনেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং নিজেকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে গঠন করার পাশাপাশি-সমগ্র বিশ্বে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে যাওয়ার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়াই মুসলিম জীবনের বৈশিষ্ট্য। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) আজীবন কোরআন হাদিসের শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষাদানকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেও আমলি জিন্দেগি গঠন, মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব ও খানকা স্থাপন, জাতির ইসলাহ ও উত্তম চরিত্র গঠনে নিয়োজিত ছিলেন। রাজনৈতিক ময়দানে এসেও হাফেজ্জী হুজুর গোটা জাতিকে সংশোধনের চেষ্টায় একটি আদর্শ জাতি ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের সবক দিয়েছিলেন।

হাফেজ্জী হুজুর (রহ) ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক ময়দানে আবির্ভূত হন। সবার আগে তিনি দেশবাসীকে কোরআনুল কারীমের বাণী দিয়ে দরদভরা কণ্ঠে বলেন-

অর্থ : ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, নিশ্চয়ই তোমরা কামিয়াব হবে।’ (সূরা নূর, আয়াত-৩১)

তওবার রাজনীতির প্রবতর্ক মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ)-ই এদেশে রাজনীতিতে সংস্কারের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভোটের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ ও অসৎ লোকদের ক্ষমতায় পাঠানো হচ্ছে, সেই ভোটের মাধ্যমেই যোগ্য, সৎ ও আল্লাহওয়ালা মানুষদের নির্বাচিত করে ক্ষমতায় পাঠাতে হবে। তাদেরকে দেশ চালানোর দায়িত্ব দিতে হবে। তাহলেই সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

হাফেজ্জী হুজুর (রহ) বলতেন, ইসলামের নামে অর্জিত স্বাধীন এদেশে ইসলামী হুকুমত না থাকায় সবচেয়ে বড় অনিয়ম হচ্ছে। জান-মাল ঈমান ইজ্জতের ওপর জুলুম চলছে। শাসকেরা শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। রক্ষক আজ ভক্ষক সেজেছে। ইনসাফের আদালত জুলুমের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, এ জামানায় সবচেয়ে বড় হচ্ছে ভোটের গুনাহ। কারণ, ভোটের দ্বারা অধর্ম ও অধার্মিককে ক্ষমতায় বসানো হচ্ছে। তারা ক্ষমতায় গিয়ে আল্লাহ এবং তার বান্দাদের হক নষ্ট করছে। এতে করে ভোটদাতা জনগণ গুনাহের অংশীদার হচ্ছেন। তাই দুনিয়া আখেরাত ধ্বংসকারী এই ভোটের গুনাহ থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে দেশবাসীকে তওবার আহ্বান জানিয়ে হাফেজ্জী হুজুর (রহ) বলেন, তওবার উসূল-বা বিধান হচ্ছে, যেমন গোনাহ তেমন তওবা, ভোট দিয়ে গুনাহ করা হয়েছিল। তাই ভোট দিয়েই তার তওবা করতে হবে। এতদিন অপাত্রে ভোট দিয়ে যে গুনাহ করা হয়েছে, এবার ইসলামী হুকুমত কায়েমের উদ্দেশ্যে সুপাত্রে ভোট দিয়ে ভোটের তওবা সম্পন্ন করতে হবে। মূলত গায়রুল্লাহর প্রবর্তিত প্রতারণার রাজনীতি থেকে আল্লাহ প্রবর্তিত সততার রাজনীতিতে ফিরে আসার নামই হচ্ছে তার তওবার রাজনীতি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সময় সারাদেশে যে অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেজাল্ট আজকের বাংলাদেশের আলেম-উলামা ও দ্বীনদার শ্রেণীর মানুষের নেতৃত্বের পথকে সুগম করেছে। হাফেজ্জী হুজুর (রহ) তার আন্দোলনের মাঝে এদেশবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন। তার পক্ষে এবং বিপক্ষে ব্যাপক প্রচার প্রোপাগান্ডা চালানো হলেও পরে মূল বিষয়টি প্রকাশ পায় যে, তিনি একজন আল্লাহর ওলি। ইলহামের মাধ্যমেই তিনি এ কাজে অগ্রসর হয়েছিলেন।

হাফেজ্জী হুজুর (রহ)-এর আত্মীয় ও শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই তাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। ক্ষমতাসীন দল নিজেদের স্বার্থহানির ভয়ে তাকে বসানোর জন্য বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। কিন্তু হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) ছিলেন অটল অনড় ও দৃঢ়চেতা। কোনো লোভ, কোনো ভীতি, কোনো সঙ্কটই তাকে নীতিচ্যুৎ করতে পারেনি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন- নির্বাচনকে আমি জিহাদ হিসেবে গ্রহণ করেছি। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী, ফেরার হওয়া হারাম। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে নির্বাচনী জিহাদে অবতীর্ণ হলাম।

তিনি আরো বললেন, রমজানের চাঁদ যদি কেউ একা দেখে আর কেউ না দেখে এবং সারা দেশের মুসলমান রোজা নাও রাখেÑ তবু যে ব্যক্তি নিজের চোখে চাঁদ দেখেছে তাকে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে। আমি নিজে ইসলামী হুকুমতের কাজ অগ্রসর করার লক্ষ্যে ময়দানে নেমেছি। তিনি এও ঘোষণা করলেন, পরাজয়ের আশঙ্কা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের হিম্মতহারা করতে পারে না। কারণ, এ পথে পরাজয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার এ আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে পরকালীন সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। আমি যে খেলাফতের কাজ করছি এটা নিজ থেকে করিনি আমাকে দিয়ে করানো হয়েছে। এটাই ছিল হাফেজ্জী হুজুরের ভোটের জিহাদের দৃষ্টান্ত। ভোটের তওবা তথা নির্বাচনী জিহাদে বাংলার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলো, যা বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার দাবীর এক রেফারেন্ডাম হিসাবে বিবেচিত হলো।

বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিপ্লব কায়েমের লক্ষ্যে ১৯৮১ সালের ২৯ নবেম্বর হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) গঠন করেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা ওঠলে প্রশ্ন ওঠে কোন্ ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে? ইরানের না সৌদির ইসলাম? মওদুদীর না মুসলিম লীগের ইসলাম? হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ)  বলেন, খোলাফায়ে রাশেদার আলোকে আমরা মদীনার ইসলাম চাই। খেলাফতই হচ্ছে মুসলমানদের ঐক্যের প্রতীক। খেলাফতই হচ্ছে ইসলামী হুকুমতের বাস্তব নমুনা। তিনি আরো বলেন, মুক্তির একই পথ ইসলামী হুকুমত। ইসলামী হুকুমতের একই পথ কেন্দ্রীয় সালাহিয়াত বা নির্ভরযোগ্য মুজাহিদ নেতৃত্ব।

 খোলাফায়ে রাশেদার অনুকরণে খেলাফত পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য হাফেজ্জী হুজুর (রহ)-এর নেতৃত্ব ও কর্মধারা ছিল সহীহ আন্দোলনের মাইলফলক। সুন্নাতে নববীর মূর্ত প্রতীক হাফেজ্জী হুজুর (রহ)-এর কাছে ক্ষমতার মোহ ছিল না। তিনি প্রচলিত ধোঁকা ও প্রতারণার রাজনীতিতে ভেসে যাননি। তিনি নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস করেননি। প্রচলিত রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে কখনোই ইসলামী আদর্শ, নিয়মনীতি ও শরীয়তের বিধানকে জলাঞ্জলি দেননি।

১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে জিকিরে মুজাস্সাম হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ)-এর সাথে সফর করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দেখেছি, শত শত মাইলের পথ একটানা সফর ও সভা-সমাবেশ করার পরও তার নফল ইবাদত, জিকির-আজকার ও নিয়মিত আমলে কোনো কমতি ঘটেনি। সফরসঙ্গীরা যখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিতেন, তখনো তিনি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ে লেগে যেতেন। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন। ফজর নামাযের জন্য সফর সঙ্গীদের ডেকে তুলতেন। তার সালাত ও ইবাদত আমাদের জন্য আদর্শ। তিনি আজীবন কম কথা ও বেশি জিকির, তেলাওয়াত ও ইবাদত করতেন। সংযম ও বিনয়ী তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল। তার জীবন অবিচলভাবে নির্ভীক চিত্তে দ্বীনের রাস্তায় পথ চলার সাহস এবং ইসলাম, দেশ ও জাতির খেদমতে আত্মত্যাগ করার অনুপ্রেরণা জোগায়। হাফেজ্জী হুজুর (রহ) এর বৈশিষ্ট্যগুলোর অনুসরণ করলে জাতি লাভবান হবে।

বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে জাতি হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) এর মতো সৎ, নির্লোভ ও আল্লাহওয়ালা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। দুর্ভাগ্য, জাতির সামনে আজ তার মতো কোনো রাজনীতিক নেই।

হাফেজ্জী হুজুর (রহ) তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। অথএব তার অনুসারীদের কাজ হলো, হাফেজ্জী হুজুরের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার লক্ষ্যে চেষ্টা করা। তাহলেই হাফেজ্জী হুজুরের আত্মা আরো বেশি সুখী ও খুশি হবে।

লেখক : রাজনৈতিক, শিক্ষক ও প্রবন্ধকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ