ঢাকা, রোববার 22 September 2013, ৭ আশ্বিন ১৪২০, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

ফিলিস্তিন ও বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা এবং মুসলিম উম্মাহর ঈমানী দায়িত্ব

প্রফেসর ড. জাকির হুসাই : বর্তমানে ফিলিস্তিন ও আরাকানসহ মুসলিম জাহানের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূখ- পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। কারণ, ফিলিস্তিন কেবল একটি মুসলিম ভূখ-ই নয়, বরং একটি পবিত্র ভূমি, আর মুসলমানদের প্রথম কিবলাহ বায়তুল মুকাদ্দাস হচ্ছে এই ফিলিস্তিনের প্রাণকেন্দ্র।

কোনো স্থানের পবিত্রতার মর্যাদা দু’ধরনের হতে পারে : সত্তাগত পবিত্রতা ও আরোপিত পবিত্রতা। কোনো জায়গাকে কেবল ঐশী নির্ধারণের মাধ্যমেই সত্তাগত পবিত্রতার অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। অন্যদিকে কোথাও কোনো নবী-রাসূলকে (আঃ) বা কোনো অলি-আল্লাহকে কবর দেয়া হলে বা ইবাদতের জন্য মসজিদ তৈরি করা হলে তা আরোপিত পবিত্রতার অধিকারী হয়।

অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, সাধারণভাবে ফিলিস্তিন ভূখ- এবং বিশেষভাবে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রথমোক্ত অর্থে পবিত্রতার অধিকারী। কারণ, কা’বাহ গৃহ যেভাবে আল্লাহর নির্দেশে নির্মিত হয়, সেভাবে মসজিদুল আক্বছ¦াও নির্মিত হয় (মুসলিম শরীফ) এবং আল্লাহ তা’আলা এর চতুষ্পার্শ্বস্থ এলাকাকে বিশেষভাবে বরকতময় করেছেন (সূরাহ বানী ইসরাঈল : ১)। এছাড়া বর্তমানে প্রচলিত তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)কে [যদিও তাওরাত-বিকৃতকারীরা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর পরিবর্তে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করেছেন] বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র প্রস্তর (ছ¦াখরাহ)-এর ওপর নিয়ে কুরবানী করার চেষ্টা করেন। ছ¦াখরাহ মুবারকের বিশেষ পবিত্রতার কারণেই যে তাওরাত বিকৃতকারীরা এ ঘটনাকে ঐ স্থানের প্রতি আরোপ করেছিল তা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের এ ছ¦াখরাহ মুবারকের ওপর থেকে মি’রাজ গমন করেন।

কুরআন মজিদে হযরত মূসা (আঃ)-এর যবানীতে ফিলিস্তিন ভূখ-কে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বনী ইসরাঈলকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের আদেশ দেন, কিন্তু তারা সেখানে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানায়। (সুলাহ আল-মায়েদাহ : ২১-২২)।

অনেকে মনে করেছেন যে, এখানে ‘পবিত্র ভূমি’ বলতে বায়তুল মুকাদ্দাসকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু উক্ত নির্দেশ প্রদানের সময় বানী ইসরাঈল ছিল সীনাই উপদ্বীপে এবং সেখান থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস বেশ দূরে। তৎকালে সীনাই ও বায়তুল মুকাদ্দাসের মাঝামাঝি এলাকায় দক্ষিণ ফিলিস্তিনীদের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হতো। এ থেকে নিশ্চিত যে, মধ্যবর্তী ফিলিস্তিনীদেরকে এড়িয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করা নির্দেশের উদ্দেশ্য ছিলো না। অতএব সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখ-ই ছিল এ নিদেশের উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিক সূত্র থেকেও এটাই মনে হয়।

অবশ্য বর্তমান জর্দানভুক্ত এলাকার পশ্চিম অংশ অর্থাৎ জর্দান নদী ও মৃত সাগরের পূর্ব তীরবর্তী এলাকা ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে ফিলিস্তিনের অংশবিশেষ থাকলেও যেহেতু আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলের জন্য তাদের নাফরমানির শাস্তি স্বরূপ চল্লিশ বছরের জন্য ‘পবিত্র ভূমি’তে প্রবেশ করতে না পারা’ নির্ধারণ করে দেন, অথচ এ সময়ের মধ্যে হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নিয়ে মৃত সাগরের পূর্ব তীরে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়, এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, জর্দান নদী ও মৃত সাগরের পশ্চিম তীর থেকে ভূমধ্য সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বর্তমান ফিলিস্তিনই ‘পবিত্র ভূমি’, জর্দান নদী ও মৃত সাগরের পূর্ব তীর ‘পবিত্র ভূমি’র অন্তর্ভুক্ত নয়।

বনী ইসরাঈলের প্রতি ‘পবিত্র ভূমিতে’ প্রবেশের হুকুম নাযিল হবার পরে হযরত মূসা (আঃ) একটি প্রতিনিধিদলকে তথ্য সংগ্রহের জন্যে সেখানে পাঠান। তারা ফিরে এসে যে রিপোর্ট দেন তা শুনেই বনী ইসরাঈল পবিত্র ভূমিতে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ, ইতিহাসের শুরুতে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপনকারী কেনআনী আরবদের বংশধর ‘আনাক্বীরা এ সময় আলÑখালীল, গাযাহ ও বিরুস, সাব’-এর মধ্যবর্তী ত্রিভুজ এলাকায় বসবাস করতো। বানী ইসরাঈল এই ‘আনাক্বীদের ভয়েই ফিলিস্তিনে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানায়। আর তথ্যসংগ্রহকারী দলকে ‘দক্ষিণ ফিলিস্তিনে’ (আনাক্বীদের এলাকায়) পাঠানো থেকে সুস্পষ্ট যে, এ এলাকাও পবিত্র ভূমির মধ্যে গণ্য ছিল অর্থাৎ বর্তমান পুরো ফিলিস্তিনই ‘পবিত্র ভূমি’র হুকুমের মধ্যে শামিল। নচেৎ কেবল বায়তুল মুকাদ্দাসকে ‘পবিত্র ভূমি’ বুঝানো হলে মূসা (আঃ) সেখানেই তথ্য সংগ্রহকারী দল পাঠাতেন।

অন্যান্য দলিল প্রমাণ থেকেও প্রমাণিত যে, সাধারণভাবে সমগ্র ফিলিস্তিনই পবিত্র ভূমি, তবে বায়তুল মুকাদ্দাস বিশেষ পবিত্রতার অধিকারী। অতএব, মক্কাহ মু’আযযামাহ ও মদীনাহ মুনাওয়ারার ন্যায় ফিলিস্তিনের প্রতি যে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঈমানী দায়িত্ব রয়েছে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তাই ফিলিস্তিনী ভূখ-ের ওপর যায়নবাদী ইসরাঈলের জবর দখল মেনে নেয়া তো দূরের কথা, এমনকি তার একাংশের ওপর কথিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়েও অপর অংশের ওপর যায়নবাদী ইসরাঈল রাষ্ট্রকে মেনে নেয়া মুসলমানদের ঈমানী দাবির বরখেলাফ।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর নবুয়াত প্রাপ্তির সময় থেকেই মুসলমানদের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস পবিত্র স্থান রূপে পরিগণিত ছিল এবং এর হারাম এলাকা (মসজিদুল আকসা, যদিও তখন সেখানে কোন ভবন বা গৃহ ছিল না।) ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলাহ। পরবর্তীকালে কিবলাহ হিসেবে কা’বাহ গৃহ নির্ধারিত হলেও মুসলমানদের দৃষ্টিতে বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতার মর্যাদা অক্ষুণœ থাকে। কারণ, পবিত্র ভূমির পবিত্রতা একটি চিরন্তন ব্যাপার। অতএব, কিবলাহ না থাকার কারণে পবিত্র স্থান হিসেবে ঐ ভূখ-ের সাথে মুসলমানদের আত্মিক সম্পর্কে কোনরূপ অবনতি ঘটা সম্ভব নয়। ঠিক যেমন পবিত্র মদীনাহ মুনাওয়ারাহ ও মুসলমানদের কিবলাহ নয়, কিন্তু তার সাথে মুসলমানদের আত্মিক সম্পর্কে কোনরূপ ঘাটতি দেখা দিতে পারে না। তাছাড়া হাদীসে মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদুল আকসায় নামায আদায়ের জন্য বিশেষ ছাওয়াবের কথা বলা হয়েছে যা থেকে মসজিদুল আকসা তথা বায়তুল মুকাদ্দাসের বিশেষ পবিত্রতার মর্যাদা অব্যাহত থাকার বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

ইয়াহুদী ও খৃস্টান প্রাচ্যবিদ প-িতদের অনেকে এ প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তারা বলেন যে, সূরাহ বানী ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে মসজিদুল আকসা বলতে বায়তুল মুকাদ্দাসকে বোঝানো হয়নি। তাদের যুক্তি : কুরআন মজিদের দৃষ্টিতে  উক্ত পবিত্র ভূমি হচ্ছে ‘নিকটতম ভূমি।’ কারণ, সূরাহ আর রূমে পারসিকদের নিকট রোমানদের পরাজয়ের স্থানকে ‘নিকটতম ভূমি’ (আদনাল আরদ) বলা হয়েছে,  অতএব, ‘দূরতম মসজিদ’ মসজিদুল আকসা) এটি নয়। দ্বিতীয় অপযুক্তি হচ্ছে এই যে, ঐ সময় (মি’রাজের সময়) বায়তুল মুকাদ্দাসের হারাম এলাকায় কোনো ইবাদত-গৃহ ছিল না।

এর জবাব হচ্ছে, ‘নিকটতম ভূমি’তে ‘দূরতম মসজিদ’-এর অবস্থানের মধ্যে কোনো স্ববিরোধিতা থাকতে পারে না। কারণ, অভিন্ন সীমান্তের কারণে ফিলিস্তিন আরব উপদ্বীপের নিকটতম ভূখ-। অন্যদিকে ঐ সময় মসজিদুল হারাম থেকে সর্বাধিক দূরত্বে অবস্থিত পবিত্র স্থান ছিল শুধু বায়তুল মুকাদ্দাস; এর চেয়ে দূরবর্তী অন্য কোন ইবাদত কেন্দ্র ছিল না যা তাওহীদবাদীদের নিকট পবিত্র বলে পরিগণিত হতো। এমতাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র ভ্রমণের (মি’রাজ) জন্যে কিবলাহকে রেখে (তখনো যা কিবলাহ ছিল)অন্য কোনো ইবাদত কেন্দ্রকে মধ্যবর্তী ‘ট্রানজিট স্টেশন’ রূপে বেছে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

আর যদি এরূপ অন্য কোনো পবিত্র ইবাদত কেন্দ্র অন্য কোথাও থাকতো এবং তাকে মি’রাজের মধ্যবর্তী ‘ট্রানজিট স্টেশন’ রূপে গণ্য করা হতো, তাহলে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) অবশ্যই তার অবস্থান ও পরিচিতি সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)কে অবহিত করতেন বা তাঁরা জিজ্ঞেস করে তা জেনে নিতেন। কিন্তু এ মর্মে একটি হাদীসও পাওয়া যাবে না। এ থেকে সুস্পষ্ট যে, সূরাহ বানী ইসরাঈল নাযিলের সময় সাহাবায়ে কেরামের নিকট ‘মসজিদুল আকসা’ অপরিচিত ছিল না।

দ্বিতীয় যুক্তি সম্পর্কে বলতে হয়, ঐ সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের হারাম এলাকায় ইবাদতের জন্য বিশেষ ‘গৃহ’ বা ‘ভবন’ না থাকায় তার ‘মসজিদ’ হওয়াতে কোনো বাধা নেই। কারণ, আরবী ভাষায় “মাসজিদ” মানে “সিজদাহর জায়গা।” তাই যে কোনো জায়গাই নামাযের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত হবে আরবী ভাষায় তাই মসজিদ; এ জন্যে গৃহ বা ভবন হওয়া শর্ত নয়। এ কারণেই কা’বাহ গৃহের চতুষ্পার্শ¦স্থ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণকে “মসজিদুল হারাম” (সম্মানার্হ/পবিত্র মসজিদ) বলা হয়, যদিও এর ওপরে কোনো ছাদ নেই।

তৃতীয়তঃ হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর মি’রাজ গমন প্রসঙ্গে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত এসব হাদীসে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দু’টি বিষয়ে বিন্দুমাত্র মতপার্থক্য নেই। তা হচ্ছে মি’রাজ গমনের মূল বিষয়টি এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদুর আকসার ছ¦াখরাহ মুবারকের ওপর থেকে গমনের বিষয়টি।

অতএব, বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতার বিষয়টি পরবর্তীকালের আরোপিত বলে দাবি করার পিছনে কোনো ভিত্তি নেই। ইরানের ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী এ পবিত্র মসজিদ পুনরুদ্ধারের দাবিতে রমযানের শেষ শুক্রবার আল-কুদস দিবস ঘোষণা করেন।

 লেখক : প্রফেসর, আল-হাদীস বিভাগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ