ঢাকা, শুক্রবার 1 November 2013, ১৭ কার্তিক ১৪২০, ২৬ জিলহজ্জ ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition

অসাধারণ কবি বে-নজীর আহমদ এবং আমার ছোট্ট স্মৃতি

শফি চাকলাদার : কবি বে-নজীর আহমদ। জন্ম ২৯ অক্টোবর ১৯০৩ বঙ্গাব্দ ১৩১০-এর ১২ কার্তিক। এখন ২০১৩ চলছে বে-নজীর আহমদ-এর ১১০তম জন্মবার্ষিকী মৃত্যুÑ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ নামগুলোর মধ্যে এই নামটিও উজ্জ্বল আখরে গেঁথে আছে। শুধু প্রতিভাদীপ্ত একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ-দরদী, মানব-দরবী মানুষ। আবার ছিলেন সন্ত্রাসবাদী একজন মানুষওÑ এই সন্ত্রাস ছিল শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এটা জানা যায় যে, বে-নজীর এক সময় ধনীদের থেকে টাকা লুট করে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। যে সকল ধনী-দরিদ্র, অসহায়দের কোনরকম সাহায্য করতেন না তাদের বাড়িতে ডাকাতি করে যে টাকা পেতেন সেই টাকা ঐ এলাকার দরিদ্র-অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। এটা লক্ষ্যণীয় যে, ছাত্রজীবনেই তিনি সমাজ সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। এবং মুসকিল ছাত্র সিমিতির কার্যালয়ের মধ্য দিয়ে বে-নজীর আহমদের সমাজ-সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছি। ১৯২৭ সালে বে-নজীর আহমদ এবং তার দল নোয়াখালীর রামগঞ্জ থানার নায়েব বাড়িতে ডাকাতি করেন। এমনি একবার কালীগঞ্জ থানার একটি গ্রামে ডাকাতি করাকালে অল্পেতে গুলীর মুখ থেকে বেঁচে যান। যাই হোক একবার এমনি করে কলকাতায় ধরা পড়েন। নদীপথে পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বে-নজীরের বক্তব্য পালাবার চেষ্টাটি এই রকমÑ“জীবনের সেই পর্যায়ে সব কিছুর বিরুদ্ধেই একটা বিদ্রোহের ভাব নিয়ে বোধহয় মরণের প্রস্তুতিসহ নদীবক্ষে ঝাঁপ দিয়েছিলাম সেদিন। পানিতে পড়ে প্রথম মনে হলো মৃত্যু আসন্ন। হস্তবদ্ধ অবস্থায় বহুকষ্টে চিত সাঁতার কেটে কেটে অগ্রসর হতে থাকলাম। এক সময় মনে হলো হাতকড়া খুলে গেল। কিছুক্ষণ পর মনে হলো শক্ত কি একটা পায়ে ঠেকছে। ভাবলাম কুমির নিশ্চয়ই। কিন্তু না, কুমির নয়। তিন চারটি ঠোঁকরের পর মনে হলো এটা নদীর চর। অবসন্ন দেহে নিকটস্থ এক গৃহস্থ বাড়ি গিয়ে আশ্রয় পেলাম। এই বাড়িতে দু’তিনদিন বিশ্রাম নেওয়ার পর একজন দারোগা ও আমার পূর্ব সহগামী প্রহরীরা এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেল।” বে-নজীরের জীবনে একটি সময় এভাবেই কেটেছে। শোনা যায় তার কাছে গাড়ির দরজা খোলার জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল কী’ ছিল। পালাবার জন্য তিনি এই চাবি ব্যবহার করে গাড়ি পাল্টিয়ে পাল্টিয়ে অন্যত্র সরে পড়তেন। এরপর বয়সের সাথে সাথে তিনিও বদলে যান। কাব্য-কবিতায় মন বেঁধে নিলেন।

বে-নজীর নামটি একবার আমার ক্লাসে লজ্জায় ফেলেচিল। বে-নজীর রচিত একটি কবিতা ‘দুর্বার পথিক’ আমাদের পাঠ্য ছিল। কবিতাটি বেশ কঠিনই লাগত আমার কাছে। কবিকে এ কারণেও মনে পড়ে। আমি তখন বরিশালের বাকেরগঞ্জ জেএসইউ স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের বাংলা শিক্ষক ছিলেন শাহ আলম স্যার। তার ক্লাসে একবার আমি এই কবির নাম উচ্চারণ করেছিলাম বে-নজীর আহমদ। স্যার শুনে ফেললেন। অমনি ধরেও বসলেন। তিনি শেখালেন বে-নজীর। অর্থও বলে দিলেন তুলনাহীন-যার তুলনা নেই।

আর এই বে-নজীর নামটিও কবির পিতৃ দেয়া নাম নয়। শোনা যায় কাজী নজরুল ইসলাম তার নামটি দেন। বে-নজীরের পিতার নাম সজেদুর রহমান। তার চার পুত্র এবং দুই কন্যা। পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র নাম বেনু মিয়া। নজরুল তার অসম সাহসী এবং মানবতা এবং সমাজদরদী কাজ শুনে তার নাম দেন বে-নজীর আহমদ।

১৯৭৫ সাল। জানুয়ারি মাস। আমি তখন নজরুলের কেয়ারটেকার। মাঝে-মধ্যেই নজরুলের বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত করতাম দোয়া মাহফিলের আয়োজন করতাম। এ কারণেই একবার চলে গেলাম কবির শাহজাহানপুরের বাড়িতে। বে-নজীর আহমদ আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। তার কাছে যাওয়ার কারণ শুনে খুশি হলেন বললেন অবশ্যই আসব। নজরুলকে আবারও কাছে পাবার সুযোগ কে হারায় বল? দেখবে ঠিক সময়তেই পৌঁছে গেছি। চা-নাস্তা শেষে উনি নিয়ে গেলেন ওনার প্রথমা স্ত্রী মরহুম জনুরা বেগম-এর কবরের পাশে। যেখানে ওনার স্ত্রীর পাশের কবরে শুয়ে আছেন বাঙলা সাহিত্যের অসাধারণ কবি ফররুখ আহমদ। কি করে কবি ফররুখের কবর এখানে হল সেই করুণ কাহিনী শোনালেন। ফররুখের লাশ তখন দিয়ে দেবার উপক্রম হয়েছে আঞ্জুমান-ই-মুফিদুল ইসলাম-এর কাছে। খবরটি শোনামাত্র তিনি ছুটে গেলেন অনুজ প্রতীম কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। ফররুখের বাড়িতে। সব শুনে পারিবারিক অনুমতি নিয়ে ফররুখের লাশ নিয়ে এসে তার প্রথমা স্ত্রীর কবরের পাশে যে স্থানটি তিনি তার জন্য নির্দিষ্ট রেখেছিলেন সেখানে ফররুখের দাফনের ব্যবস্থা করলেন। ওনার জন্য ওনার স্ত্রীর অপরপাশে যেখানে ওনার মৃত্যুর পর দাফন করা হয় ওনাকে। তদানীন্তন সরকার কবির প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ নানান। ৭৪-এর বন্যা নিয়ে ফররুখ সরকারের জোর সমালোচনা করে কবিতা-নিবন্ধ লিখেছিলেন। আর তাই কবির যাবতীয় সকল কিছু তার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এমনকি ফররুখের পুস্তক প্রকাশও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। নিদারুণ যন্ত্রণা-কষ্টে ফররুখের সংসার নিপতিত হল। সংসারের খরচাদি চলত না। এমনি করুণ অবস্থায় ফররুখের মৃত্যু হয় ধুঁকে ধুঁকে।

যা হোক কবি-ভবনে ঠিক সময়েই কবি বে-নজীর চলে এসেছিলেন। আমার ভালো লেগিছিল কবির পাশে বে-নজীরকে দেখতে পেয়ে। সেই দোয়া মাহফিলে সেদিন অনেকেই এসেছিলেন যার মধ্যে মরহুম সুফী জুলফিকার হায়দার, মরহুম কবি মঈনুদ্দীন খান, মরহুম সোহরাব হোসেন, মরহুম বেদারুদ্দীন আহমদ, মরহুম কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী, খালিদ হোসেন, বিচারপতি মোস্তফা কামাল প্রমুখেরা।

 শেষ করছি পুনরায় বে-নজীর বানান নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৯তে ‘কবিতা-সংগ্রহ’ সঙ্কলিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সম্পাদনায় রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আবু জাফর ও আবুল কাসেম ফজলুল হক। এতে বে-নজীর নামটি সূচিপত্রে, ৩০৪ এবং ৪৭০ পাতায় বেনজির আহমদ এসেছে। এটা অল্প নয়, এটা মারাত্মক ভুল আর ভুলটা করেছেন যারা সেই সম্পাদনা বোর্ডের তিনজনই সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। কবির এবার ১১০তম জন্মবার্ষিকী ২৯ অক্টোবর। আমরা যেভাবে কিছু কিছু নামকে ভুলে যেতে অভ্যস্ত হয়ে আছি কবির এই জন্মদিনে সেই অভ্যাসটা যাতে বলবৎ না থাকে সেমনটাই আশা রাখি। কবির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ