ঢাকা, শুক্রবার 9 May 2014 ২৬ বৈশাখ ১৪২১, ৯ রজব ১৪৩৫ হিজরী
Online Edition

রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলীওয়ালা’

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন : বেশ কয়েক বছর আগে ফরহাদ মজহার এক লেখনিতে প্রশ্ন করেছিলেন রবীন্দ্র সৃষ্টির এত বিশাল অঙ্গনে একটি মুসলিম চরিত্র কি একটুও ঠাঁই পেতে পারতো না, যাকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হতাম। সম্ভবত এ উত্তর রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারো পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। তবে রবীন্দ্র প্রেমিকেরা স্পষ্ট করেই বলেন যারা এমন প্রশ্ন করে তারা সাম্প্রদায়িক। নতুন করে হিন্দু মুসলাম বিরোধ তৈরি করাই এদের কাজ। প্রকৃত অর্থে রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার মানুষকে স্থান দিয়ে তাঁর সাহিত্য সম্ভারকে নোংরা করতে চাননি। তিনি পাশাপাশি বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যে স্থান দিয়ে হিন্দু মুসলমানদের একই স্থানে জায়গা দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেননি। এমনি এক গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’।

সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ ও ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্প দু’টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং পঠিত। কিন্তু আনন্দদানের বাহিরে ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে যে হৃদয়বিদারক মানবিক সংঘাত আমরা দেখি  তা সত্যি লজ্জাজনক। তাই দুঃসাহস করেই গল্পটির কিছু বিষয় আলোকপাত করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

গল্পটির বক্তা মিনির বাবা রামদয়াল। কিন্তু এ বক্তা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবুও এটিকে কেবল তাঁর সৃষ্টি হিসাবে বিবেচনা করে আলোচনার সূত্রপাত করাই ভাল। গল্পের অন্যতম চরিত্র মিনি অল্প বয়সী। স্বাভাবিকভাবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় কাবুলিওয়ালাকে দেখে তার কৌতুহলের সীমা থাকেনা। তাই দেখা মাত্রই রহমতকে ‘কাবুলিওয়ালা, ও কাবুলিওয়ালা’ বলেই ডাকে। সে ডাক অপমানের, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের। সে ডাকে ভয় ও নিন্দা প্রকাশ পায়।

মিনির ডাক শোনে ‘কাবুলিওয়ালা মুখ ফিরাইল এবং আমাদের বাড়ির দিকে আসিতে লাগিল অমনি সে উর্ধ্বশ্বাসে অন্তঃপুরে দৌড় দিল, তাহার আর চিহ্ন দেখাও পাওয়া গেল না’। মিনির এমন আচরণের মধ্যে ধরা পড়ে ‘কাবুলিওয়ালা’ নামক মানুষগুলির প্রতি এ সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। কেননা ‘কাবুলিওয়ালারা’ সমাজে আজব প্রাণি বা ভয়ানক খারাপ মানুষ হিসাবে শিশুদের কাছে পরিচিত করে তোলা হয়েছে। ফলে মিনি তাকে দেখেই পালালো।

ইংরেজ শাসন আমলে এদেশের মানুষের উপর কি পরিমান নির্যাতন হয়েছিল তার ইতিহাস লেখা কখনো শেষ করা সম্ভব হবেনা। কি বৃদ্ধ, কি শিশু-নারীকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। ইংরেজদের ভয়ে এদেশের মানুষ আতঙ্কিত ছিল সব সময়। ইংরেজরা নানাভাবে এদেশের মানুষজনকে দাসত্বের শিকলে বন্দী করত পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু সে অপকর্মের দায়ভার কোন চরিত্রের মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেননি। বরং সাধারণ খেটে খাওয়া কাবুলিওয়ালাদের ঘাড়ে এমন অপবাদের কলঙ্ক চাপিয়ে দেয়া হল।

সত্যিকার অর্থে কাবুলিওয়ালারা কখনো শিশু চুরি করেছে কিনা, ইতিহাস নিজেই জানেনা। কিন্তু তারা এদেশে ঝোলাতে করে যে কিচ্মিচ্ জাতীয় পণ্য বিক্রি করে বেড়াতো তার প্রমাণ মেলে। অথচ তাদের সেই ঝোলার ভয় দেখিয়ে শিশুদের আতঙ্কিত করা হতো। এগুলি কি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ নয়? এ কাহিনী কি পৌরাণিক কাহিনীকেও হার মানায়নি?

দিনে দিনে কাবুলওিয়ালার সাথে মিনি এবং তার বাবার বেশ একটা সখ্য গড়ে ওঠে। তবে সে সখ্যতার প্রতি পুরো পরিবার  সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। আর সতর্ক দৃষ্টি চরম সন্দেহের কারণে। কেননা মিনির মা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার বাবা বলল, “রহমত কাবুলিওয়ালা সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ নি:সন্দেহ ছিলেন না। তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিবার জন্য তিনি আমাকে বারবার অনুরোধ করিয়াছিলেন।”  এখানেই স্পষ্ট যে সখ্য কাবুলিওয়ালা ও মিনির পরিবারের মধ্যে বিদ্যমান ছিল তার ভীত কত গভীর ছিল।

এ কথা সত্য মিনির বাবা তার মায়ের এত সন্দেহপ্রবণ না হলেও সম্পূর্ণ নিঃসংশয়েও ছিলেন না। তিনিও কাবুলিওয়ালাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেননি। তার ভাষায়, “কাবুলীওয়ালাকে প্রতি মধ্য মাঘ মাসে বাড়ি ফিরিতে হয় কিন্তু একবার মিনিকে দর্শন দিয়া যায়। দেখিলে বাস্তবিকে মনে হয়, উভয়ের মধ্যে একটা ষড়যন্ত্র চলিতেছে।” রবীন্দ্রনাথ কাবুলিওয়ালা সর্ম্পকে মারাত্মক শব্দ ব্যবহার করেছেন। কাবুলিওয়ালার বিপক্ষে এমন শব্দের সামাজিক ও মানোজগতের গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন রয়েছে। এ শব্দের মধ্যদিয়ে এও প্রকাশ পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে মুসলিম চরিত্র সমূহকে সন্দেহের শিকলে বন্দী করেছেন।

মিনির বাবার কাছ থেকেই জানা যায় রহমত কাবুলিওয়ালা প্রতি বছর মাঘ মাসের মাঝামাঝি দেশে ফিরে যায় পরিবার পরিজনের সাথে দেখা করতে। এ সময়ে দেনা পাওনা বুঝে নিতে রহমত কাবুলিওয়ালা বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এমনি কারণে এক সকালে মিনিদের বাড়ির নিকটবর্তী প্রতিবেশির কাছে পাওনা টাকা আদায় করতে গেলে, সে প্রতিবেশি দেনা অস্বীকার করে। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে কাবুলিওয়ালা তার শরীরে ছোরা বসিয়ে দেয়। সে রক্ত মাখা ছোরাসহ কাবুলিওয়ালাকে দু’পাহারাওয়ালা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। পিছনে পিছনে ছোট ছোট কৌতুহলী শিশুদের লম্বা সারি ছিল। মিনির বাবার মতে  সে “প্রতিবেশি একজন রামপুরী চাদরের জন্য রহমতের কাছে কিঞ্চিৎ ধারিতে- মিথ্যাপূর্বক সেই দেনা সে অস্বীকার করে এবং তাহাই লইয়া বচসা করিতে করিতে রহমত তাহাকে এক ছুরি বসাইয়া দিল।”

এখানে মিনির বাবা যে শব্দসমুহ রহমতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন তার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে হেয় করার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠেছে। যে মানুষটি সারা বছর পরিবার পরিজনকে ছেড়ে এ অঞ্চলে বাকীতে ব্যবসা বাণিজ্য করে যাচ্ছে এবং এখানকার মানুষগুলি দিনের পর দিন টাকা না দিয়ে জিনিস পত্র  ব্যবহার করেও দেনা অস্বীকার করছে। তথাপি এটিকে গুরুতর অপরাধ হিসাবে দেখা হয়না। বরং মিনির বাবার মতে “কিঞ্চিৎ” হিসাবে দেখেছেন। যে মানুষটি সরল বিশ্বাসে ধার দিল সেটি কি তার মহত্বের পরিচয় নয়? যারা দেনা অস্বীকারের মত হীন কাজ করল তারা কি অপরাধী নয়?

“সাংঘাতিক আঘাত করা অপরাধে” আট বছর জেল খেটে রহমত কাবুলিওয়ালা ফিরে এসে সোজা মিনিদের বাসায় চলে যায়। কিন্তু ততদিনে মিনি অনেক বড়  হয়ে ওঠে। আর সেদিন মিনির বিয়ের সানাই বাজছিল। তাই বাড়িতে ব্যাপক আয়োজন। আর এমন দিনে মিনির বাবা রহমত কাবুলিওয়ালাকে দেখে বিব্রতবোধ করে। তার প্রতিক্রিয়াটি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। তার মতে, “কোনো খুনীকে কখনো প্রত্যক্ষ দেখি নাই, ইহাকে দেখিয়া সমস্ত অন্তঃকরণ যেন সংকুচিত হইয়া গেল। আমার ইচ্ছা করিতে লাগিল, আজিকার এই শুভ দিনে এ লোকটা এখান হইতে গেলেই ভালো হয়।”

পাঠক হিসাবে আমাদের মনে জাগতে পারে কাবুলিওয়ালা বিনা স্বার্থে মিনিদের বাড়িতে আসতে পারে কি? নাকি বিশেষ কোন মতলব আছে? প্রকৃত পক্ষে সেদিন মিনিকে বিয়ের পিড়িঁতে দেখে কাবুলিওয়ালার অন্তর হু হু করে কেঁদে উঠেছে। মিনির বাবার মতে “দেখিলাম, কাগজের উপর একটি ছোট হাতের ছাপ। ফটোগ্রাফ নহে, হাতে খানিকটা ভূষা মাখাইয়া কাগজের উপরে তাহার চিহ্ন ধরিয়া লইয়াছে। কন্যার এই স্মরণচিহ্নটুকু বুকের কাছে লইয়া রহমত প্রতি বৎসর কলিকাতার রাস্তায় মেওয়া বেচিতে আসে-যেন সেই সুকোমল ক্ষুদ্র শিশু হস্তটুকুর স্পর্শখানি তাহার বিরাট বিরহী বক্ষের মধ্যে সুধাসঞ্চার করিয়া রাখে।” যদিও পরক্ষণে মিনির বাবা বুঝতে পারল, “সেও যে আমিও সে, সেও পিতা আমিও পিতা।” আর অনীক মাহমুদের ভাষায়, “কাবুলিওয়ালা রহমতের পিতৃত্ব কেবল ব্যক্তি রহমতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে তার পিতৃত্বের মহিমায় বাঙালি পিতার বাৎসল্যকেও করতে পেরেছে।” কিন্তু এ উপলব্ধি বেশ দেরি হয়ে গেছে। তাছাড়া মিনির বাবা ছাড়া গল্পের শেষ পর্যন্ত আর কারো মধ্যে কোন পরিবর্তন হয়নি দৃষ্টিভঙ্গিতে। ফলে এটি প্রতীয়মান হয় মানুষের প্রতি যে সমান দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের থাকা প্রয়োজন ছিল, তা এ গল্পে নেই।

কেউ হয়তো বলতে পারে এটি সমাজে একটি খ- চিত্র, যাকে রবীন্দ্রনাথ কালির আঁচড়ে বন্দী করে অপূর্ব একটি গল্প তৈরি করেছেন। এখানে সাম্প্রদায়িকতা বা অসম দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলাটা যুক্তিযুক্ত নয়। এক্ষেত্রে আমার স্পষ্ট বক্তব্য হল লেখকের নৈতিক দায়িত্ব হল সমাজকে শুদ্ধ করে তোলা। বিশেষ কারো বা গোষ্ঠীর প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ নয়। লেখক গল্পের মধ্যে এমন বার্তা দিবেন যাতে মানুষ ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা পায়। কিন্তু এখানে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বৈষম্যের শিকার রহমত কাবুলিওয়ালা। আর এমন বৈষম্য আজো আমাদের সমাজে বিদ্যমান। ফলে সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে মুসলমানদের সন্ত্রাসী বানিয়ে দেয়া এবং সর্বস্বান্ত করে ভুল স্বীকার করা হয়। এমন ঘটনাগুলি কি ষড়যন্ত্রের অংশ নয়? অথবা মুসলমানরা আজ কথায় কথায় জঙ্গি হিসাবে পরিচিত, সেটিও এমন নোংরা অপকৌশলের ফসল। আর এমন সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি প্রতিয়মান হওয়া স্বাভাবিক রবীন্দ্রনাথের এ গল্পে মানবতা নিষ্পেষিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ