ঢাকা, বুধবার 18 June 2014 ৪ আষাঢ় ১৪২১, ১৯ শাবান ১৪৩৫ হিজরী
Online Edition

কল-কারখানার ৬২ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে কর্ণফুলী তীরে বন্দরের ১০৯ একর জমি বেদখল ॥ বিলুপ্ত প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছ

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম অফিস: বন্দর নগরী চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী মারাত্মক দূষণাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। দূষণে আর দখলে এ নদী ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ময়লা-আবর্জনা ও বিষাক্ত বর্জ্যে প্রাণবৈচিত্র্য ও ব্যবহার উপযোগিতা হারাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে ক্রমেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী এ নদী। নদীটি ভরাটও হয়ে যাচ্ছে। খরস্রোতা, চঞ্চলা-চপলা পানির এ পাহাড় স্রোতস্বিনী কর্ণফুলী ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন । এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলার ওপর দিয়ে ৩২৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে এসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। চট্টগ্রামে এসে নদীটি কালের বিবর্তনে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়ে। কর্ণফুলীর ওপর একশ্রেণীর অপরিণামদর্শী নগরবাসীর অব্যাহত অত্যাচার নদীটিকে মুমূর্ষু করে ফেলেছে। কর্ণফুলী নদীর দু’পাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৬০ লাখ নাগরিকের বসতি ও কয়েক হাজার শিল্প কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য, বাণিজ্যিক বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, মানুষের মলমূত্র, জীবজন্তুর মৃত দেহসহ সব ধরনের বর্জ্য প্রতিদিন এ নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীটি মারাত্মক দূষিত ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৮ সালে কর্ণফুলীর দু’পাড়ে যেখানে ৭০০ শিল্প কারখানা ছিল, এখন সেখানে এ সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ২১৭টি শিল্প কারখানা রয়েছে, যেগুলোর বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। দূষণ তালিকার শীর্ষে রয়েছে ৪টি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী পেপার মিলস। শুধু সিটি কর্পোরেশনই প্রতিদিন ৭৬০ থেকে ৮০০ টন বর্জ্য কর্ণফুলীতে ফেলছে। কর্ণফুলী নদীর পাড়ের অধিকাংশ শিল্প কারখানার বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র বা ইটিপি নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানের ইটিপি আছে তারাও এ যন্ত্র ব্যবহার করে না। নদীতে চলাচলরত ১ হাজার ২০০ ছোট জাহাজ, ৬০-৭০টি তেলের ট্যাংকার, সাড়ে ৩ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকার বর্জ্যতেও প্রতিনিয়ত কর্ণফুলী দূষণ হচ্ছে। তবে পরিবেশ অধিদফতর ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে কর্ণফুলী দূষণের জন্য দায়ী হিসেবে শনাক্ত করেছে। পানি দূষণের কারণে ২৩ বছরে নদী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছ। এর সঙ্গে বহু জলজ জীববৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে। এছাড়া অজস্র বিভিন্ন ধরনের নৌযান ও জাহাজ চলাচলের কারণে রাসায়নিক বর্জ্য, তেল-মবিল, আবর্জনা, মলমূত্র আর কাদা পানির সঙ্গে মিলেমিশে ভিন্ন প্রকৃতির এক তরল পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কর্ণফুলীর নোংরা পানি এখন অচ্ছ্যুত। চট্টগ্রামের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নদীটির পানি মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৬০ কিলোমিটার কর্ণফুলী নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি সাগরে পতিত হয়। ফলে সাগরের পানিও দূষিত হচ্ছে। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) গবেষণামতে, নদীর দুই তীরে স্থাপিত প্রায় ২১৭টি প্রতিষ্ঠান তাদের বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে। এগুলোর মধ্যে ১৯টি ট্যানারি, ২৬টি টেক্সটাইল মিল, দুটি রাসায়নিক কারখানা, চারটি সাবান ফ্যাক্টরি, দুটি তেল শোধনাগার, পাঁচটি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, বিটুমিন প্লান্ট, সিইউএফএল, কাফকো, চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিল অন্যতম। দূষণ তালিকার শীর্ষে রয়েছে সরকারি চারটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী কাগজকল। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বর্জ্য শোধনাগার নেই। শুধু সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৭৬০ থেকে ৮০০ টন বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে ফেলে। এ ছাড়া জাহাজের দূষিত পানি, তেলসহ অন্যান্য আবর্জনা প্রতিদিনই কর্ণফুলীতে ফেলা হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানান, পার্বত্য অঞ্চলের কাপ্তাই, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, বোয়ালখালী উপজেলা, চট্টগ্রাম বন্দরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে কর্ণফুলী নদী প্রবাহিত। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে ৬২ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে প্রতিদিন। এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে সায়ানাইড, ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিনসহ নানা ধরনের অ্যাসিড, দস্তা, নিকেল, জিপসাম, সীসা, ক্যাডমিয়াম, লোহা, অ্যালকালির মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য। ফলে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীতে ভেসে ওঠা চরে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করাসহ নদীগুলোকে দখল করে নিচ্ছে ভূমিদস্যুরা। এর ফলে ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ নদী নাব্য হারাচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজের আওতায় রয়েছে নদীর পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা। বিআইডব্লিউটিএ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নদীর তলদেশ রক্ষা করে নদীর নাব্য ধরে রাখা। ভূমি মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নদীর পাড়ের মালিকানা রক্ষা করা। তারপরও দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল এখন দখল ও দূষণের চরম পর্যায়ে। আলোর মুখ দেখেনি কর্ণফুলী রক্ষায় নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ঘোষিত টাস্কফোর্স কমিটির কাজও। ২০১২ সালের ২৯ নবেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে এসে কর্ণফুলীর উভয় তীর থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করার ঘোষণা দেন নৌমন্ত্রী। গত দেড় বছরে কথিত এ টাস্কফোর্স উদ্ধার করতে পারেনি এক ইঞ্চি অবৈধ ভূমিও। উল্টো নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন উদ্যোগে দখল হচ্ছে নদী। উঠছে নতুন ঘরবাড়ি। কর্ণফুলীর তীরে থাকা ২ হাজার ৪৬৯ একর ভূমির মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজেদের ব্যবহৃত জমি মাত্র ৯৭৫ একর। অবশিষ্ট জমির মধ্যে বন্দর সহায়ক বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৩৫ একর ও বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩৩৪ একর জমি লিজ দেওয়া আছে। আর স্থানীয় রাজনীতিকদের ছত্রছায়ায় অবৈধ দখলে আছে নদী তীরে থাকা বন্দরের ১০৯ একর জমি। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের  ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এস্টেট জিল্লুর রহমান বন্দরের ভূমি স্থানীয় রাজনীতিকদের ছত্রছায়ায় অবৈধ দখলে রয়েছে এমনটি স্বীকার করতে নারাজ। তিনি জানান, বন্দরের ১০৯ একর জমির সবটুকু চট্টগ্রাম সিটিকর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে। চাক্তাই ও মনোহরখালী ঘাট এলাকায় কাঠের গুঁড়ি ফেলে নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে দখল করা হচ্ছে ভূমি। চাক্তাই ব্রিজের একটু দক্ষিণ-পূর্বে তোলা হয়েছে শত শত বাড়িঘর, ছোট ছোট গুদাম ও কারখানা। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে মুনীর চৌধুরী কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত উভয় তীরে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৭ একর জায়গা উদ্ধার করেন। কিন্তু এরপর চলেনি আর বড় ধরনের কোনো অভিযান। রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা, কদমতলী, শিলক, কোদলা, সরফভাটা, মরিয়ম নগর, পারুয়া, বোয়ালখালীর কালুরঘাট, চরণদ্বীপ, চৌধুরীঘাট, খরণদ্বীপ, কধুরখীল, পশ্চিম গোমদ-ী, আমুচিয়া, পশ্চিম পটিয়ার শিকলবাহা, কালারপুল, ডাঙ্গারচর, খোয়াজনগর, চরপাথরঘাটা, ইছানগর, নগরীর মোহরা, কালুরঘাট পশ্চিম, বাংলাবাজার, জলিলগঞ্জ, ফিরিঙ্গিবাজার ও ব্রিজঘাট এলাকায় কর্ণফুলী দখল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীতে চলাচলরত ১২শ’ ছোট জাহাজ, ৬০-৭০টি তেলের ট্যাংকার, সাড়ে ৩ হাজার ইঞ্জিন চালিত নৌকার বর্জ্য প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীতে নিঃসরণ হচ্ছে। নদীতে চলাচলরত নৌযানের পোড়া তেল এবং দুই তীরের বিশাল এলাকার প্রায় ৫০ লাখ অধিবাসীর পয়ঃ ও গৃহস্থালির বর্জ্য গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলীতে। সূত্র জানায়, নগরীর বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে প্রতিদিন ১৫০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। সিটি কর্পোরেশন হালিশহরের আনন্দনগর ও আর্টিলারি সেন্টারের দুটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপের পরও খাল-নালার মাধ্যমে ২৫ শতাংশ বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ রসায়নবিদ জমির উদ্দিন জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ভূপৃষ্ঠ বা নদীর প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ ৫ মিলিগ্রামেরও ওপরে, পিএইচ’এর পরিমাণ ৬ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম থেকে ৮ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম এবং নদীতে বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) ৫ থেকে ১০ মিলিগ্রাম থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের পরীক্ষায় কর্ণফুলীতে ডিও ৩ মিলিগ্রামেরও নিচে এবং বিওডি ৩ দশমিক ২ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে ছোট ছোট মাছ বাঁচে না। এ ছাড়া প্রাণী বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যায় এবং বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জাফর আলম জানান, নদীর মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দরের এবং নদীর দখল রোধ ও উচ্ছেদ করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশনের। অবৈধ স্থাপনার বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সিডিএ’র কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। জাফর আলম বলেন, কর্ণফুলি নদী দূষণের জন্য বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও দায়ী। শুধু জরিমানা আদায় করে এ দূষণ রোধ সম্ভব নয়। তাই এ নদী রক্ষায় একটি সমন্বিত উদ্যোগের লক্ষ্যে আমরা দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি। যারা এ নদীকে দূষণ করছে, তাদেরকেই উত্তরণের পথ বের করে আনতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানান, যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেয়। এ কাজের সঙ্গেও প্রশাসনের অনেকেই যুক্ত রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব এস এম আবদুল কাদের বলেন, কর্ণফুলি তীরবর্তী অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য আমরা একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে অনেক জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো যায়না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ