ঢাকা, শুক্রবার ৩ October 2014 ১৮ আশ্বিন ১৪২১, ৭ জিলহজ্জ্ব ১৪৩৫ হিজরী
Online Edition

মহান কুরবানীর গুরুত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) নবী হওয়ার পর মক্কায় তেরটি বছর অতিবাহিত করেন। তারপর তিনি আল্লাহর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করে চলে যান। অতঃপর কিছুদের মধ্যে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়ার নির্দেশ পান। এ হুকুম পাওয়ার পর তিনি দশ বছর বেঁচেছিলেন। তাই ঐ দশ বছরই তিনি কুরবানী করতে থাকেন। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) দশ বছর মদীনায় অবস্থান করেন এবং কুরবানীও করতে থাকেন। (আত-তিরমিযী, ১ম খ-, ১৮২ পৃষ্ঠা, মিশকাত ১২৯ পৃষ্ঠা) হাফেয ইবনুল কাইয়্যূম বলেন, রাসূল (সা.) কখনো কুরবানী বিরতি দেননি। (যা-দুল মা’আদ- ১ম খ-, ২৪৬ পৃষ্ঠা)
উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, কুরবানী সুন্নাতে মুআক্কাদা। এটা ফরয ও ওয়াজিব নয়। তবে কোনো কোনো হাদীস দ্বারা বাহ্যত মনে হয় যে, কুরবানী ওয়াজিব বা অবশ্য পালনীয় কাজ। যেমন- ইবনে মাজাহ একটি হাদীসে আছে- রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কুরবানীর সামর্থ্য রাখে অথচ কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে। (ইবন মাজাহ ২৩২ পৃষ্ঠা)।
আল্লামা জামালুদ্দীন আব্দুল্লাহ যায়লাঈ বলেন, এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদ, মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, মুসনাদের আবু ইয়ালা, সুনানে দারাকুতনী ও মুস্তাদরাকে হাকিম প্রভৃতিতেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর কয়েকটি বর্ণনার সনদ রাসূল সা. পর্যন্ত পৌঁছায় না; বরং তা সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) পর্যন্ত শেষে হয়ে যায়। কাজেই হাদীসটি মারফু নয়; বরং মাওকুফ। (নাসবুর রায়াহ ৪র্থ খ-, ২০৭ পৃষ্ঠা)। ইমাম তাহাভীও বলেন, মওকুফ হওয়াটা সঠিক। তথ্যটি এ হাদীসে কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ নেই। (ফাতহুল বারী ১০ম খ-, ১ম পৃষ্ঠা)।
এ হাদীসটির একজন বারী আব্দুল্লাহ ইবনে আইয়াশকে ইমাম আবু দাউদ এবং ইমাম নাসায়ী যঈফ ও দুর্বল বলেছেন। (ইবনে মাজার উক্ত পৃষ্ঠায় বায়নাস সুতুর)। সুতরাং হাদীসটি দলীলযোগ্য নয়। আল্লামা ইবনে জাওযী তাহকীক গ্রন্থে বলেন, এ হাদীসটি ওয়াজিব প্রমাণ করে না। যেমন- ঐ হাদীস যে ব্যক্তি রসুন খায় সে যেন আমাদের সালাত পড়ার জায়গার নিকটেই না আসে উক্ত হুকুমটি ওয়াজিব প্রমাণ করে না। (নাসবুর রায়াহ ৪র্থ খ-, ২০৭)।
সুনানে আরবা’আ ও মুসসনাদে আহমদের একটি হাদীসে রয়েছে- হে মানবম-লী! প্রত্যেক পরিবারের উপর প্রতি বছরে একটি করে কুরবানী ও আতীরাহ নিশ্চয়ই আছে। এ হাদীস সম্পর্কে হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী (রাহ.) বলেন, এ হাদীসটিতেও কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার স্পষ্ট কোনো শব্দ নেই। তাছাড়া এ রেওয়ায়াতে কুরবানীর সাথে ‘আতীরা’রও উল্লেখ আছে, যা সর্বসম্মত মতে ওয়াজিব তো নয়ই, বরং অন্য হাদীস দ্বারা বাতিল বলে প্রমাণিত।
কোনো সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা কুরবানী ওয়াজিব প্রমাণিত না হলেও রাসূল (সা.) সর্বদা আমল দ্বারা কারো কারো মনে ওয়াজিব হওয়ার সন্দেহ হয়। তাই একজন লোক নবী করীম (সা.) সুন্নাতের আশেক পালনীয় কাজ কি? উত্তরে তিনি বলেন, রাসূল (সা.) কুরবানী দিতেন এবং মুসলমানরাও করতেন। এ উত্তরে প্রশ্নকারী দ্বিধামুক্ত না হওয়ায় তিনি আবার প্রশ্ন করেন, এটা ওয়াজিব কি-না? উত্তরে তিনিও আবার বললেন, তুমি বুঝতে পারছ না। আমি তো বলছি রাসূল (সা.) কুরবানী করতেন এবং তারপর সাধারণ মুসলমানরাও কুরবানী দিতো। তারপর থেকে এ সুন্নাত প্রচলিত। (আত-তিরমিযী ১ম খ-, ১৮২ পৃষ্ঠা ও ইবনে মাজাহ ২৩২ পৃষ্ঠা)।
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, আহলে ইলম বা কুরআন হাদীস জ্ঞানীদের আমাল এ ছিল যে, যে কুরবানী ওয়াজিব নয়; বরং নবী করীম (সা.) এর সুন্নাতের মধ্যে এটি একটি সুন্নাত। (আত-তিরমিযী ১ম খ-, ১৮২ পৃষ্ঠা)।
মুসনাদের আহমদ, আবু ইয়ালা, তাবারানী, দারাকুতনী ও হাকীম প্রভৃতিতে একটি যঈফ হাদীসে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেন, আমার উপর কুরবানী ফরয, কিন্তু তোমাদের উপর নয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খ-, ৪র্থ)।
কুরবানী সুন্নাত হওয়া সম্পর্কে সহীহ ও যঈফ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো যঈফ হাদীস দ্বারা পরোক্ষভাবে তা ওয়াজিব হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়ার কারণে উলামায়ে কিরামের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে যে, কুরবানী সুন্নাত না ওয়াজিব অর্থাৎ- শুধু করণীয় না অবশ্য পালনীয়? ইমাম আবু হানীফা (রাহ.) এর মতে প্রত্যেক স্বাধীন, ধনী ও ঘরে অবস্থানকারী মুসলমানের উপরে কুরবানী ওয়াজিব। (হিদায়া ৪র্থ খ-, ৪৪৩ পৃষ্ঠা)।
ইমাম শাফিঈ (রাহ.) বলেন, কুরবানী সুন্নাত। একে আমি পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না। (কিতাবুল উম্ম ২য় খ-, ১৮৭ পৃষ্ঠা)। ইমাম মালিক (রাহ.) বলেন, কুরবানী সুন্নাত; ওয়াজিব নয় এবং কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি একে বর্জন করে আমি তা পছন্দ করি না। (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক : ১৮৯ পৃষ্ঠা)।
তিনি ইমাম আবু হানীফার মতে, ঘরে অবস্থানকারীর শর্ত লাগাননি। ইমাম আহমদ (রাহ.) বলেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা বর্জন করা আপত্তিকর। হানীফীদের ইমাম আবু ইউসুফ, মালিকীদের ইমাম আসহাব এবং জমহুর ও অধিকাংশ আলিমের মতে তা সুন্নাতে মুআক্কাদা। (ফাতহুল বারী ১০ম খ-, ১ম) ইমাম ইবনে আযম (রাহ.) বলেন, কুরবানী সুন্নাত, ফরয নয়। কোনো সাহাবী থেকেও সহীহ সনদে প্রমাণিত নেই যে, কুরবানী ওয়াজিব। (মুহাল্লা ৭ম খ-, ৩৫৫-৩৫৮ পৃষ্ঠা।
উপরোক্ত বর্ণনার সারকথা হচ্ছে এই যে, কুরবানী বিশ্বনবী (সা.) এর আজীবন সুন্নাত এবং তাঁর ইন্তিকালের পর থেকে মুসলিম জাহানের সার্বজনীন আমল এবং ইসলামের এক মহান বৈশিষ্ট্য। তাই কোনো সামর্থ্যবান মুসলমানের পক্ষে কুরবানী ত্যাগ করা মোটেই উচিত নয়।
কুরবানীদাতাদের একটা কথা সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে, ঐ টাকা যেন সুদের টাকা না হয় এবং তাদের কুরবানী যেন লোক দেখানো অথবা দুনিয়ায় নাম পাওয়া অথবা আত্মঅহংকার প্রকাশ প্রভৃতির জন্য না হয়ে থাকে। কারণ কুরবানীর ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আর আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং না এগুলোর রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবেই তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যেন তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর, যেহেতু তিনি তোমাদের সঠিক পথ দান করেছেন। আর সংবাদ দাও সৎকর্মশীল লোকদের। (সূরা আল-হজ্জ : আয়াত-৩৭)।
মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানীর বিধান : আ’মাশ বলেন, আলি আলীকে (রা.) দুটি দুম্বা কুরবানী করতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি ব্যাপার? তিনি বললেন, রাসূল (সা.) তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে কুরবানী করার ওসিয়ত করে গেছেন। তাই তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে কুরবানী করার ওসিয়ত করে গেছেন। তাই আমি তাঁর পক্ষ থেকে এ কুরবানী আদায় করছি। (আবু দাউদ, মিশকাত ১২৮, বাইহাকী ৯ম খ- ২৮৮ পৃষ্ঠা) মুস্তাদরাকে হাকীমেও একটি সহীহ রেওয়ায়াত আছে যে, তিনি দুটি দুম্বা নবী (সা.) এর পক্ষ থেকে কুরবানী করেন এবং নিজের পক্ষ থেকে। উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া জায়েয। (মিরকাত ২য় খ-, ২৬৫)
এ ব্যাপারে আত-তিরমিযী হাদীস গ্রন্থের ভাষ্যকার আল্লামা মুবারকপুরী বলেন, কেবল মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়ার ব্যাপারে আমি একটি সহীহ মারফু হাদীস রাসূল (সা.) থেকে পাইনি। থাকলে সেটা আলী বর্ণিত (রা.) হাদীস, আর তাযঈফ। তাই কোনো ব্যক্তি যদি একটি কুরবানী কেবল মৃত লোকদের পক্ষ থেকে করে এবং তাতে জীবিত লোককে শরীক না করে তাহলে সাবধাণতা অবলম্বনমূলক হিসেবে গোটা কুরবানীটাই সদকাহ করা উচিত। যেমন- আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক গুনয়্যাতুল আলমায়ী গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি একটি কুরবানী নিজের এবং কিছু মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে দেয়া কিংবা নিজের এবং স্বীয় পরিবার ও কিছু মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দেয় তাহলে তার গোশত নিজে খেতে এবং পরিবারবর্গকে খাওয়াত কোনো আপত্তি নেই। আর এ কুরবানী গোটাই তাকে খয়রাত করতে হবে না। এ ব্যাপারে হানাফী ফকীহ আল্লামা মুহাম্মদ আমীন ইবনে আবিদীন বলেন, যদি কেউ মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে এ কুরবানী গোশত খাওয়া ও সদকার ব্যাপারে ঐরূপ করবে যেমন সে নিজের কুরবানীর ব্যাপারে করে। আর ওর নেকীটা মৃতব্যক্তির পাবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ২য় খ-, ৩৫৪, আওনুল মাবুদ ৩য় খ-, বদ্দুল মুহতার ৫ম খ-, ২৮৫)।
যখন কুরবানী শুরু হবে : ঈদের সালাতের আগে কুরবানী দেয়া যাবে না। যেমন- রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সালাতের আগে যবেহ করে সে নিজেরই জন্য তা যবেহ করে এবং যে ব্যক্তি সালাতের পর যবেহ করে সে তার কুরবানী পূর্ণ করে এবং মুসলমানদের রীতিনীতি সঠিকভাবে পালন করে। (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত ১২৬ ও ১২৮ পৃষ্ঠা)
বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন, একদা কুরবানীর দিনে রাসূল (সা.) আমাদের সামনে খুৎবাহ দিয়ে বললেন, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সালাত না পড়া পর্যন্ত কখনই যেন সে কুরবানী না করে। (মুসলিম ২য় খ-, ১৫৪ পৃষ্ঠা)। আত-তিরমিযী বর্ণনায় আছে- “সালাত না পড়া পর্যন্ত তোমাদের কেউই যেন কখনো যবেহ না করে।” (আত-তিরমিযী ১ম খ-, ১৮২ পৃষ্ঠা)।
জিলহজ্ব মাসের প্রথম ১০ দিন চুল ও নখ কাটা নিষিদ্ধ : উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি জিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখে এবং কুরবানী করার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন কুরবানী করা পর্যন্ত তার নখ ও চুল মোটেই না কাটে। অন্য বর্ণনায় আছে, জিলহজ্ব ১০ দিন যখন এসে পড়ে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে সে যেন তার নখ ও চুলে স্পর্শ না করে- (মুসলিম, মিশকাত ১২৭ পৃষ্ঠা, আত-তিরমিযী, নাসায়ী, আবু দাউদ, মুস্তাদরাকে হাকীম, কানযুল উম্মাল ৫ম খ-, ৪৫ পৃষ্ঠা। আবু দাউদ, মুসলিম ও নাসায়ীর বর্ণনায় আছে; যার কাছে কুরবানী জানোয়ার রয়েছে, অতঃপর সে যখন জিলহজ্ব চাঁদ দেখে তখন কুরবানী না করা পর্যন্ত সে যেন তার নখ ও চুল না কাটে। (নায়লুল আওতার ৪র্থ খ-, ৩৪৪ পৃষ্ঠা)।
কুরবানী যবেহের নিয়মাবলি : আনাস (রা.) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে শিংওলা দুটি ক্রটিমুক্ত দুম্বা কুরবানী করেন। আমি দেখলাম যে, তিনিও তাদের ঘাড়ে পা দিয়ে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলে যবেহ করলেন। আয়শা রাযি. এর বর্ণনায় আছে, তিনি তাঁকে বললেন, একটি ছুরি আনো এবং ওটাকে পাথরে ঘষে শান দাও। আমি তা করলাম। তারপর তিনি ছুরিটা ধরলেন এবং দুম্বাটা ধরে শুইয়ে ফেললেন। অতঃপর যবেহ করলেন। তারপ বললেন, বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন মুহাম্মাদিন ওয়ালী-মুহাম্মাদিও উম্মাতি মুহাম্মাদ। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত-১২৭ পৃষ্ঠা)।
নিজ হাতে কুরবানী করা উচিত : উপরোক্ত আনাস (রা.) বর্ণিত বুখারী ও মুসলিমের হাদীসসহ অগণিত হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কুরবানী করতেন এবং সাধ্যমতো অন্য কাউকে দিয়ে কুরবানী করাতেন না। সুতরাং তাঁর উম্মতের উচিত তাঁর আদর্শ যথাসাধ্য পালনের চেষ্টা করা এবং নিজ হাতে কুরবানী করা। আল্লামা মাযহার বলেন, প্রত্যেকেরই নিজ হাতে কুরবানী করা সুন্নাত। কারণ যবেহ করাটা একটি ইবাদত। আর নিজের ইবাদত নিজে করাই অতি উত্তম। যদিও এ ইবাদাত অন্যকেও দিয়ে করানো বৈধ। (মিরকাত ২য় খ-, ২৬০ পৃষ্ঠা)। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে যে, নিজ হাতে কুরবানী করার ফলে এবং কুরবানী করার সময় কুরবানীগাহে হাযির থাকার ফলে অনেক কাপুরুষ ও ভীরু ব্যক্তির কাপুরুষতা ও ভীরুতা কেটে গিয়ে তাদের মনে সাহসের সঞ্চার হয়েছে।
কুরবানীর পশুর কসাইয়ের পারিশ্রমিকের বিধান : আলী (রা.) বলেন, আমাকে রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন যে, কুরবানীর কোনো কিছু থেকেই যেন আমি কসাইকে মজুরি হিসেবে না দেই। তিনি আরো বলেন, তাই আমরা নিজেদের কাছ থেকে তা দিতাম। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত-২৩২ পৃ: ও বুলূগুল মারাম ১০২ পৃ:) “কুরবানীর গোশত চামড়া বা অন্য কিছুর দ্বারা কসাইয়ের মজুরি না দিয়ে আলাদাভাবে তার দাম দিতে হবে। কিন্তু হ্যাঁ তাকে যদি তুহফা হিসেবে কিছু গোশত খেতে দেয়া হয় তাহলে তাতে কোনো আপত্তি নেই।”
একই জন্তুর ভাগাভাগির কুরবানী ও আক্বীকা চলে কি? : পৃথিবীর কোনো সহীহ বা যঈফ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, রাসূল (সা.) কিংবা লক্ষাধিক সাহাবায়ে কিরাম অথবা তাবিয়ীনে ইমাম প্রমুখদের কেউই একটি গরু বা উটের সাতভাগের কয়েকভাগ কুরবানী এবং কয়েকভাগ বা একভাগ বা দু’ভাগ আক্বীকা দিয়েছেন। একটি উট বা গরু ৭ জনের পক্ষ থেকে আকীকাহ দেয়া যাবে কি-না। এ সম্পর্কে হাফেয ইবনুল কাইয়ূম লিখেছেন, একটি মাথা কেবলমাত্র একটি মাথারই পক্ষ থেকে যথেষ্ট।
ইমাম খাল্লান তদীয় জামীআ গ্রন্থে বলেন, আমাকে আব্দুল মালিক ইবনে আব্দুল হামীদ সংবাদ দিয়েছেন যে, একদা তিনি আবু আব্দুল্লাহকে (ইমাম আহমদকে) জিজ্ঞেস করেন, উট দিয়ে আকিকাহ হবে কী? তিনি বলেন, রাইস উট দিয়ে আকিকাহ করেছেন। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, সাতজনের পক্ষ থেকে একটি উট আকীকাহ হবে কি? তিনি বললেন, আমি ঐ ব্যাপারে কিছু শুনিনি। অর্থাৎ কোনো হাদীস পাইনি। অতঃপর হাফিয ইবনুল কাইয়ূম মন্তব্য করেছেন যে, কুরবানী এবং হাদিতে ভাগাভাগি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাত। কিন্তু আক্বীকাহর ব্যাপারে তিনি (সা.) ছেলের পক্ষ থেকে দুটি স্বতন্ত্র খুনের বিধান দিয়েছেন। যার বিকল্প একটি উট কিংবা গরু হতে পারে না। আক্বীকাতে একটি প্রাণের মুক্তিপণে একটি পূর্ণাঙ্গ খুবই শরীয়তের বিধান। অতএব এখানে যদি ভাগাভাগি সঠিক হয় তাহলে একটি নির্দিষ্ট শিশুর পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহের উদ্দেশ্যে নষ্ট হয়ে যায়। তাই একই জন্তুর ভাগাভাগিতে কুরবানী এবং আকীকাহ দুটি একসাথে জায়েয নয়। (তুহফাতুল মওদূদ বিআহকামিল মওলূদ ৪৭ পৃষ্ঠা)।
ইমাম আহমাদের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, একদা আমি আমার পিতাকে ঈদুল আযহার দিনে আক্বীকাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, ঐ দিনে একই সাথে কুরবানী এবং আক্বীকা করা যাবে কি-না? তিনি বললেন, হয়তো তা কুরবানী, কিংবা আক্বীকাহ। অর্থাৎ কুরবানী এবং আক্বীকাহ করা যাবে কি-না? তিনি বললেন, হয়তো তা কুরবানী কিংবা আক্বীকাহ। অর্থাৎ একটিই হবে। (ঐ-৫০ পৃষ্ঠা) তারই তাঁর মতেও একই জন্তুতে ভাগাভাগি করে কুরবানী ও আক্বীকা দুই হবে না। এ জন্য হাম্বলী এবং আহলে হাদীসের মতে একই জন্তুতে কুরবানী ও আকীকাহ বৈধ নয়। (আল-মুহাল্লা ৭ম খ-, ৫২৩ পৃষ্ঠা। তার তাঁর মতেও একই জন্তুতে ভাগাভাগি করে কুরবানী ও আক্বীকা দুই হবে না। এজন্য হাম্বলী এবং আহলে হাদীসদের মতে একই জন্তুতে কুরবানী ও আক্বীকাহ বৈধ নয়। কিন্তু হানাফী ফিকহ নাওয়াদিরুয যাহায়া তে ইমাম মুহাম্মদ বর্ণনা করেছেন যে, যদি কেউ কুরবানীর জন্তুতে আক্বীকার ভাগ দেয় তা জায়েয হবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রাহ.) রকমারী ভাগাভাগিকে মাকরূহ মনে করেন এবং তিনি বলেন যে, ঐ ভাগাভাগি যদি একই রকমের হয় তাহলে আমার কাছে তা অধিকতর পছন্দনীয়। (ফাতওয়া আলমগীর ৪র্থ, ৮৪ পৃষ্ঠা)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ