ঢাকা, বুধবার 12 November 2014 ২৮ কার্তিক ১৪২১, ১৮ মহররম ১৪৩৬ হিজরী
Online Edition

সমুদ্র সম্পদ

সুবীর দত্ত:

॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥ ভারতবর্ষের EEZ -এ সুসংবদ্ধ সমীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্যে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (CSI) ১৯৮৩-৮৪ সালে গভীর সমুদ্রে কাজ করার উপযোগী গবেষণা জাহাজ সমুদ্রমন্থন এবং উপকূলবর্তী এলাকায় কাজ করার উপযোগী গবেষণামূলক “কোস্টাল লঞ্চ” ‘সমুদ্র কৌস্তুভ’ এবং ‘সমুদ্র শৌধিকামা’ সংগ্রহ কর। তার আগে বিচ্ছিন্নভাবে মোটরবোট, লঞ্চ এবং ভারতীয় নৌসনা (কৃষ্ণা, যমুনা, দর্শক) এবং পোর্ট ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (অনুসন্ধানী)-র সার্ভে জাহাজে কিছু যৌথ সমীক্ষা চালানো হয়। পাশাপাশি ন্যাশনাল ইন্সটিট্যুট অব অসিয়েনোগ্রাফি (NIO) প্রথমে ‘গবেষণী’ এবং পরে ‘সাগরকন্যা’ জাহাজে সমুদ্রবিজ্ঞানের নানা দিক নিয়ে সমীক্ষা চালান। যদিও এই সব সমীক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল প্রথমত, ভারতবর্ষের EEZ অন্তর্ভুক্ত সমুদ্রতলের পলনের একটি সুসংবদ্ধ মানচিত্র তৈরি করা- তবুও এর পাশাপাশি মহীসোপানের স্থাপক অবক্ষেপের এবং অন্যান্য দাতব পলির সমীক্ষাও চলেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ষাট এবং সত্তরের দশকে আন্দামন সাগর, বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ান ওসিয়েন এক্সপিডিসন’-এর জাহাজগুলি, ‘মার্কিন কোস্ট ও জিওডেটিক সার্ভে’ এবং ‘স্ক্রিপস ইনস্টিটিট্যুট অব ওসিয়েনোগ্রাফী” অভিযান চালায়। এই গবেষণামূলক সমীক্ষাগুলি মূলত EEZ এর বাইরের এলাকাতে ভূতাত্ত্বিক এবং ভূপদার্থিক সমীক্ষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আন্তর্জাতিক “ডিপ সি ড্রিলিং প্রোজেক্ট’ (DOD)-র অধীনে ভারত মহাসাগরের গভীর এলাকায় “বহুধাতবীয় নুড়ি”র সমীক্ষায় ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ ‘সাগরকন্যা”, “গবেষণী” এবং চার্টার করা বিদেশী জাহাজ “ফার্নেলা” এবং ‘স্ক্যান্ডি সার্ভেয়ার”।

বোম্বে হাই-এর তেল সন্ধানের সাফল্যের পর ভারতবর্ষের বিভিন্ন উপকূলের অপতট এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে। কাবেরী এবং কৃষ্ণা গোদাবরী অববাহিকায় মাঝারি আকারের তৈলভান্ডার পাওয়া গিয়েছে। সম্ভাবনাময় পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনও এলাকায় এখন পর্যন্ত খুব বেশি পরিমাণ তেল পাওয়া যায়নি। তবে ক্যাম্বে, মহানদী, লাক্ষাদ্বীপ, বঙ্গ এবং আন্দামান নিকোবর অববাহিকাগুলিতে তেল পাবার সম্ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। DSDP ছেদনে জানা যায় সিন্ধু গিরিখাত এলাকা হাইড্রোকারবণ তৈরি হবার উপযোগী। যদিও বর্তমানে অপতটের সমীক্ষা ২০০ মিটার গভীরতায় সীমাবদ্ধ, অচিরেই তৈলসন্ধানে সমুদ্রের আরও গভীরে যেতে হবে।

ভারতবর্ষের উপকূলের বালুতে ভারী ধাবত পলি বা কালো বালির  মোনাজাইট, জারকন, রুটিল, ইলমেনাইট ইত্যাদি) কথা অনেকদিন থেকেই জানা ছিল এবং  কোনও কোনও অঞ্চলে  যেমন কেরালার চাভারা ও উড়িষ্যার ছত্তরপুর) উৎপাদনও চালু রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের অপতট অঞ্চলে এর বিস্তৃতির চেহারাটা জানা ছিল না। প্রাথমিক সমীক্ষায় যে সব এলাকাগুলি উল্লেখযোগ্য বলে মনে করা হয়েছে সেগুলি হল উড়িষ্যার গঞ্জাম ও কটক জেলা (বালিবাহিসাতভায়া- পুরী- সোনাপুরাপেটা - গোপালপুর); অন্ধ্রপ্রদেশের বারুভা- ভাবনপাভু- ভিশাখাপত্তনম- বিমলিপত্তনম; তামিলনাড়–র তিন্নাভেলি- রামনাদ, তানজোর রাজ্য। পশ্চিম তিন্নাভেলি- রামনাদ- তানজোর রাজ্য। পশ্চিম উপকূলে কেরালার চাভারা-ভারকালা-পারাভুর-ত্রিবান্দ্রম’ মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি। বস্তুত কুইলনের উত্তরে নিন্দাকারাই থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত কেরালার বিস্তৃত এলাকা স্থাপক অবক্ষেপের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য। কেরালার চাভারা এবং তামিলনাড়ুর মানাভালকুরুচির বালুতটে প্রচুর পরিমাণে খনিজ বালু মেলে।সমুদ্রতলে বালি, সিল্ট বা ক্লের নিচে লুকিয়ে থাকা কোনও প্রাচীনকালের (Relict) বালির স্তর বা ‘পুরা-স্থাপক’ (Paleo-placer) হতে পারে এই ধরনের খনিজের আধার।

ভারতের সমুদ্রগর্ভে একমাত্র ফসফেট লুড়ি পাওয়া গিয়েছে উত্তরআন্দামানের পূর্ব উপকূলের কাছে। ১৮৯৮ সালে রয়েল ইন্ডিয়ান মেরিন সার্ভে জাহাজ ‘ইনভেস্টিগেটর’-এর অভিযানে। বর্তমানে EEZ এর বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া তথ্য থেকে যে অঞ্চলগুলিকে ফসফেট সমৃদ্ধ বলে মনে হয় সেগুলি হল কালিকটের কাছে মালাবার উপকূলের অপতটে, লাক্ষাদ্বীপের অপতটে এবং বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে। হাল আমলের সমীক্ষায় বোম্বে থেকে কুইলনের বিস্তীর্ণ অপতট এলাকার সোপান এবং ঢাল এবং কেরালা উপকূলের কিছু অঞ্চলকে সম্ভাবনাময় বলা হয়েছে। লাক্ষাদ্বীপের কাছে বেরিয়াম নুড়িরও সম্ভাবনা রয়েছে। লাক্ষ্মাদ্বীপের কাভাররাট্টি এবং কালপেনী হ্রদে (Lagoon) প্রচুর পরিমাণে ক্যালকেরিয়াস বালু রযেছে। আন্দামান সাগরে ‘সমুদ্রতল-ছড়ানো’ এবং সক্রিয় টেকটনিকস-এর প্রমাণাদি পাবার পর সমুদ্রের গভীরে ধাতব খনিজের সম্ভাবনার কথা ভাবা হচ্ছে।

ভারতমহাসাগরের প্রথম লৌহ-ম্যাঙ্গানিজ নুড়ি পাওয়া যায় ঐতিহাসিক ‘চ্যালেঞ্জার’ অভিযানে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণে। ভারতমহাসাগরের প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বহুধাতবীয় নুড়ি পাওয়া যায়। পূর্বদিকের অংশে ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং মধ্য ভারতীয় পর্বতশিরায় সবচেয়ে কম। ম্যাঙ্গানিজের পরেই রয়েছে নিকেল ও কোবাল্ট। পশ্চিম দিকের অঞ্চলে কোবাল্টের পরিমাণ বেশি। ভারতমহাসাগরের “মধ্য ভারতীয় অববাহিকা”র পশ্চিমে চাগোস-লাক্ষাদ্বীপ রীজ এবং পূর্বদিকে নাইনটি ইস্ট রীজ। এই অববাহিকার নুড়ি নিকেল এবং তামায় সমৃদ্ধ এবং ভারত মহাসাগরের এই এলাকাতে এবং ক্রোজেট ও হোয়ারটন অববাহিকাতেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নুড়ি পাওয়া যায়। ‘বুমেরাং গ্রাব’ নামক নমুনা সংগ্রহের যন্ত্র এবং গভীর সমুদ্রের ক্যামেরা ব্যবহার করে ভারতমহাসাগরের এইসব অঞ্চলে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। যদিও বর্তমান প্রযুক্তিগত মানে গভীর সমুদ্র এই সব ধাতব খনিজের উৎপাদন এখনই সম্ভব নয় তবুও এগুলি ভারতবর্ষের ভা-ারে অমূল্য সম্পদ।

ভারতবর্ষের জোয়ার-ভাটার শক্তির পরিমাণ আনুমানিক ৭৬০০ মেগাওয়াট। সারা পৃথিবীর উপকূল ধরলে প্রতি কিলোমিটার অঞ্চলের গড় শক্তি যেখানে ০.৬৫ মেগাওয়াট, ভারতে সেখানে ১.২৭ মেগাওয়াট। তাই ভারতে এই শক্তির কেন্দ্র গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া ভারতের উপকূল বরাবর রয়েছে অসংখ্য লেক ও সমুদ্রজাত হ্রদ। কচ্ছ উপত্যকায় ৯০০ মেগাওয়াট শক্তিসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কা-লাতে ৬০০ মেগাওয়াট শক্তির কেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম উপকূলে ক্যাম্বে এবং পূর্ব উপকূলে গঙ্গার মুখেই সুন্দরবনের ব-দ্বীপ অঞ্চলেও খুব সম্ভাবনাময় বলা হচ্ছে। অপরদিকে ত্রিবান্দ্রমে একটি তরঙ্গশক্তির কেন্দ্র অচিরেই খোলা হবে।

শূন্যে দশ কিলোমিটার উঁচুতে একটি বেলুন থেকে বালতি ঝুলিয়ে স্থলভাগের ছড়িয়ে থাকা পাথর বা পলি সংগ্রহ করে খনিজ সম্পদের সমীক্ষা চালালে যে অবস্থা দাঁড়াবে, সমুদ্র সমীক্ষায় আমাদের অবস্থা অনেকটা সেরকম। বিশাল এই সমুদ্রের নিচের অচেনা, অদেখা জগৎ থেকে গ্রাব, কোর, ড্রেজ ইত্যাদি ব্যবহার করে বা ছেদন করে আমরা কতখানিই বা তথ্য সংগ্রহ করতে পারি? যে সমুদ্রে এককালে মানুষ শুধু মাছ ধরাতেই ব্যস্ত ছিল আজ তার গভীরে সে অন্বেষণ চালাচ্ছে জ্বালানি তেল, ম্যাঙ্গানিজ নুড়ি এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদের সন্ধানে। তা সত্ত্বেও সমুদ্রের বেশিরভাগটাই অজানা। আমরা সবে আমাদের পা ডোবাতে শুরু করেছি। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ